ঢাকা শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

লাকিংমের মরদেহ গ্রামে নিতেও ভয়, সমাধিস্থ রামুতে

লাকিংমের মরদেহ গ্রামে নিতেও ভয়, সমাধিস্থ রামুতে
×

সোমবার কক্সবাজার কক্সবাজার সদর হাসপাতালের হিমঘরে মেয়ের লাশ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন লাকিংমে চাকমার মা। ছবি: সমকাল

কক্সবাজার অফিস

প্রকাশ: ০৪ জানুয়ারি ২০২১ | ০৯:০৫ | আপডেট: ০৪ জানুয়ারি ২০২১ | ০৯:১২

অপহরণের দীর্ঘ এক বছর পর প্রিয় কন্যা লাকিংমে চাকমার (১৫) দেখা পেলেন লালা অং চাকমা। তবে জীবিত নয়, নিথর দেহ। কক্সবাজার সদর হাসপাতালের হিমঘরে ২৬ দিন ধরে পড়েছিল কিশোরী লাকিংমে চাকমার মরদেহ। লাকিংমের বাবা ও অভিযুক্ত ব্যক্তির দ্বন্দ্বের কারণে শেষকৃত্য করা যায়নি মেয়েটির। 

আদালতের নির্দেশে সোমবার মরদেহ নিতে হাসপাতালে আসেন লাকিংমের বাবা লালা অং চাকমা ও স্বজনরা। কিন্তু হাসপাতাল মর্গের ২৪ হাজার টাকা বিল দিতে না পারায় মেয়ের মরদেহ পাচ্ছিলেন না। এ অবস্থায় দুপুরে হাসপাতালের মর্গের বিল ২৪ হাজার টাকা পরিশোধ করে মামলার তদন্ত সংস্থা র‌্যাব। এরপর বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে লাকিংমের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। মরদেহ গ্রহণ করেন লাকিং মের চাচাতো ভাই ক্যচিং মং চাকমা।

বিকেলেই মেয়ের মরদেহ টেকনাফের শিলখালী গ্রামের বাড়িতে নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দুর্বৃত্তদের ভয়ে গ্রামে মরদেহ নেওয়ার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে রামুতেই সমাধিস্থ করা হয় লাকিংমে চাকমাকে।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম কক্সবাজার জেলা শাখার সহ-সভাপতি ক্য জ অং বলেন, 'বাড়িতে নিরাপত্তা নেই, তাই রামুর কেন্দ্রীয় বৌদ্ধ মহাশ্মশানে (নাইক্ষ্যংছড়ি সড়কে) লাকিং মে চাকমার মরদেহ সমাহিত করা হয়। এ সময় বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মী, বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অধিবাসীসহ লাকিংমের পরিবারের লোকজন উপস্থিত ছিলেন।'

টেকনাফ উপজেলার সমুদ্র উপকূলীয় ইউনিয়ন বাহারছড়ার দক্ষিণ শিলখালী এলাকার চাকমা পল্লীতে বসতি লালা অং চাকমার। সমুদ্রে মাছ ধরে ও পাহাড়ে জুমচাষ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তার পাঁচ সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয় লাকিংমে চাকমা।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. শাহীন আবদুর রহমান বলেন, 'বাবার কাছেই হস্তান্তর করা হয়েছে কিশোরী লাকিংমে চাকমার মরদেহ।'

র‌্যাব-১৫ এর অধিনায়ক উইং কমান্ডার আজিম আহম্মেদ সমকালকে বলেন, 'নিহত লাকিংমের বাবা খুবই দরিদ্র। মর্গের বিল ২৪ হাজার টাকার জন্য মেয়ের মরদেহ নিতে পারছিলেন না। খবর পেয়ে আমরা মর্গের বিল পরিশোধ করেছি।'

লালা অং চাকমা বলেন, তার মেয়ে লাকিংমেকে অপহরণের পর জোর করে বিয়ে এবং পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। তারা প্রিয় সন্তানের (লাকিংমে) মরদেহ গ্রামে নিয়ে শেষকৃত্য করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দুর্বৃত্তদের হামলার আশঙ্কায় রামুতে শেষকৃত্য হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, লাকিংমে স্থানীয় শাপলাপুর উচ্চবিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ত। ২০২০ সালের ৫ জানুয়ারি তাকে স্থানীয় যুবক আতাউল্লাহর নেতৃত্বে কয়েকজন অপহরণ করে। ঘটনার পর থানায় গেলেও পুলিশ সহায়তা করেনি। পুলিশ মামলা নিতে রাজি না হওয়ায় ১৭ জানুয়ারি কক্সবাজারের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন তিনি। তারপর কেটে যায় প্রায় ১১ মাস। এ সময় মেয়েকে হন্যে হয়ে খুঁজেছেন তিনি। অবশেষে গত ৯ ডিসেম্বর মেয়ে লাকিংমে চাকমার খোঁজ পান। তবে জীবিত নয়, কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে পড়ে ছিল তার প্রিয় কন্যার নিথর দেহ। 

মেয়ের মরদেহ নিতে গিয়েও পড়েন বিপত্তিতে। অপহরণ, নাবালিকা বিয়ে এবং জোরপূর্বক ধর্মান্তরে বাধ্য করার অভিযোগে অভিযুক্ত আতাউল্লাহ এতে বাদ সাধেন। নিজেকে লাকিংমে চাকমার স্বামী দাবি করে লাশ নেওয়ার আবেদন করেন তিনি। ফলে আবেদন যায় আদালতে। এ অবস্থায় তদন্ত সাপেক্ষে মৃতের 'ধর্মীয় পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত' হয়ে র‌্যাবকে মরদেহ সৎকার করার নির্দেশ দেন কক্সবাজারের একটি আদালত। র‌্যাবের প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্ট জমা দেওয়ার পর আদালতের নির্দেশে লাকিংমে চাকমার মরদেহ বুঝে পান বাবা। 

লাকিংমের বাবা লালা অং চাকমা বলেন, তার মেয়েকে জোর করে বিয়ে করে পরে হত্যা করা হয়। মেয়ে হত্যার বিচার চান তিনি।

এদিকে স্বামী দাবিদার আতাউল্লাহ বলেন, অপহরণ নয়, স্বেচ্ছায় তারা বিয়ে করেছেন। বিয়ের আগে লাকিংমে ধর্মান্তরিত হন। তার (লাকিংমের) বর্তমান নাম হালিমাতুল সাদিয়া। গত বছরের ৯ ডিসেম্বর বিউটি পার্লারে যাওয়া নিয়ে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে রুমে গিয়ে বিষ পান করে সে। মারা যাওয়ার ১২ দিন আগে একটি মেয়ে সন্তানের জন্ম দিয়েছে 'তার স্ত্রী'।

তদন্ত কর্মকর্তা র‌্যাব-১৫ এর পরিদর্শক অঞ্জন চৌধুরী বলেন, 'প্রাথমিক তদন্তে আমরা নিশ্চিত হয়েছি লাকিং মে চাকমার বয়স ১৫ বছর। জাল জন্মসনদ ও অন্যান্য কাগজপত্র ব্যবহার করে তাকে ধর্মান্তরিত ও কাবিননামা করা হয়েছে বলে নিশ্চিত হয়েছি। অপ্রাপ্তবয়স্ক একজন কিশোরীকে বিয়ে ও ধর্মান্তরিত করা কোনোভাবে আইনসম্মত হতে পারে না। বিষয়টি আদালতকে জানানো হলে লাকিং মে চাকমার মরদেহ তার বাবার জিম্মায় দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এ ঘটনায় শিগগিরই আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।'

লাকিংমে 'অপহরণ ও হত্যা'র প্রতিবাদে কক্সবাজারে মানববন্ধন: লাকিংমে চাকমাকে অপহরণ ও হত্যার প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছে আদিবাসী ফোরামসহ কয়েকটি সংগঠন। কক্সবাজার পৌরসভার সামনে সোমবার সকাল সাড়ে ১১টায় এ মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করা হয়।

বক্তারা বলেছেন, 'লাকিংমে চাকমাকে অপহরণ করে বেআইনিভাবে ধর্মান্তর, বাল্যবিয়ে ও পরে হত্যা করা হয়েছে। হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানাই।'

সমাবেশে বক্তব্য রাখেন- নারী প্রগতি সংঘের পারভীন সুলতানা, বাংলাদেশ হিন্দু পরিষদের দীপক দাশ, জাসদ নেতা এ কে ফরিদ আহম্মদ, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের নারী বিষয় সম্পাদক মা টিন টিন, ফোরামের নেত্রী আলো চাকমা, অংথেন মারমা, থৈন অং (বুবু), আদিবাসী ছাত্র পরিষদ নেতা লাতু চাকমা, এনজিও কর্মী ডা. পরিমল কান্তি দাশ, মিঠুন দাশ প্রমুখ।

আরও পড়ুন

×