ঢাকা শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

গাজীপুরে ফ্যান কারখানায় আগুন, পুড়ে অঙ্গার ১০ শ্রমিক

গাজীপুরে ফ্যান কারখানায় আগুন, পুড়ে অঙ্গার ১০ শ্রমিক
×

ফ্যান কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের পর উদ্ধার তৎপরতায় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা- সংগৃহীত

ইজাজ আহ্‌মেদ মিলন, গাজীপুর

প্রকাশ: ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯ | ০৭:৪২ | আপডেট: ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১২:৪৪

ঢাকার কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়ায় গত বুধবার একটি প্লাস্টিক কারখানায় আগুন লেগে এ পর্যন্ত ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। ভয়াবহ ওই ঘটনার পাঁচ দিনের ব্যবধানে রোববার গাজীপুরে একটি ফ্যান কারখানায় আগুনে অঙ্গার হলো আরও ১০ জন। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে সদর উপজেলার বারিয়া ইউনিয়নের কেশোরিকা এলাকায় লাপারি ফ্যান কারখানায় এ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। খবর পেয়ে জয়দেবপুর ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট দুই ঘণ্টার চেষ্টায় সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পর ভেতর থেকে ১০ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। 

নিহতরা সবাই শ্রমিক। তাদের মধ্যে সাতজনের নাম জানা গেছে। তারা হলেন- পারভেজ ও ইউসুফ (ঠিকানা জানা যায়নি), কেশোরিকা গ্রামের বীর চন্দ্র দাসের ছেলে উত্তম চন্দ্র দাস, রংপুরের ফরিদুল ইসলাম, শ্রীপুরের রাশেদ, শামীম ও কালনী গ্রামের সাইফুল ইসলাম খানের ছেলে ফয়সাল খান। নিহত ফয়সাল কাজী আজিম উদ্দিন কলেজের ছাত্র ছিল। পড়াশোনার পাশাপাশি ওই কারখানায় চাকরি করত সে। সবার মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে রয়েছে। একই হাসপাতালে ভর্তি আছেন আহত দু'জন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গ্রামের ভেতর নির্জন এলাকায় তিনতলা ভবনের ছাদের ওপর বড় একটি টিনশেড ঘর। ওই টিনশেড ঘর থেকে নিচে নামার জন্য তৈরি সরু সিঁড়ি বরাবর ছোট্ট একটি দরজা। বাইরের আলো-বাতাস যাওয়ার কোনো উপায় নেই। জীর্ণ ওই ঘরটির ভেতরেই বসে ১৩ জন শ্রমিক বৈদ্যুতিক ফ্যান তৈরির কাজ করছিলেন। হঠাৎ করেই দরজার কাছে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে। শ্রমিকরা বাঁচার জন্য দৌড়ে দরজার বিপরীত দিকে গিয়ে অবস্থান নেন। কিন্তু তাতেও রক্ষা হয়নি। ততক্ষণে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে মুহূর্তে আগুন সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। টিনশেডের একটি কক্ষে কয়েকজন কর্মী আটকে পড়েন। পরে দমকল কর্মীরা এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন।

গাজীপুর ফায়ার সার্ভিসের ওয়্যারহাউস পরিদর্শক জাকারিয়া খান সাংবাদিকদের জানান, দরজার কাছে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হওয়ার পর শ্রমিকরা ভেতরে চলে যান। পরে চারদিকে আগুন ছড়িয়ে পড়লে তারা এদিক-সেদিক ছোটাছুটি করতে থাকেন। তাদের কেউ কেউ বাইরে বের হয়ে যেতে পারলেও ভেতরে অনেকে আটকা পড়েন। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পর তৃতীয় তলার কক্ষ থেকে ১০ শ্রমিকের লাশ উদ্ধার করা হয়। কারখানাটিতে ১৩ জন শ্রমিক কাজ করছিলেন বলে জানা গেছে। নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলেও জানান জাকারিয়া খান। কারখানার মালিকের নাম মো. জাহিদ বলে জানা গেলেও কর্তৃপক্ষের কাউকে ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি।

গাজীপুর ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক মামুনুর রশীদ জানান, সন্ধ্যা ৬টার দিকে আগুন লাগে। খবর পাওয়ার পর দুটি ইউনিট গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এরপর সেখানে ১০ জনের মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। প্রথম দিকে পুড়ে যাওয়া দেহগুলো দেখে শনাক্ত করার মতো অবস্থায় ছিল না বলে জানান তিনি। তিন তলাবিশিষ্ট টিনশেড এই কারখানায় আগুন লাগার কারণ তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস।

এদিকে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অগ্নিদগ্ধ দু'জনকে ভর্তি করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তারা হলেন- কারখানাটির শ্রমিক আনোয়ার হোসেন ও হাসান। হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার প্রণয়ভূষণ দাশ জানিয়েছেন, দগ্ধ দু'জনকে হাসপাতালে আনা হয়েছে। তাদের হাত-পা ও পিঠে সামান্য দগ্ধ হয়েছে। তবে তারা শঙ্কামুক্ত।

গাজীপুরের জেলা প্রশাসক এসএম তরিকুল ইসলাম ও পুলিশ সুপার শামসুন্নাহার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। পুলিশ সুপার শামসুন্নাহার সমকালকে বলেন, এসব কারখানা চালানোর নামে টাকাওয়ালা কিছু মানুষ সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে খেলছে। কর্তৃপক্ষের খামখেয়ালিপনার কারণেই ১০টি তাজা প্রাণ পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেল। তিনি বলেন, এমন পরিবেশে কখনও মানুষ কাজ করতে পারে না, এত বড় ঘরের জন্য ছোট্ট একটি দরজা রাখা হয়েছে। একাধিক দরজা থাকলে আজ হয়তো এই মানুষগুলো বেঁচে যেতেন। মালিকের বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি চলছে বলেও জানান তিনি।

রাত ৯টার দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসেন ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাজ্জাদ হোসেন বলেন, এই কারখানায় অগ্নিনির্বাপণের কোনো ব্যবস্থাই ছিল না। কী কারণে এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে সেটা অনুসন্ধানে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসক এসএম তরিকুল ইসলাম বলেন, ঘটনাটি তদন্তের জন্য অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট শাহীনুর ইসলামকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাদের ১০ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। দাফন-কাফনের জন্য নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা করে দেওয়ারও ঘোষণা দেন তিনি। এ ছাড়া শ্রম মন্ত্রণালয় থেকে আরও ৫০ হাজার করে টাকা দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

দায়ীদের শাস্তি দাবি শ্রমিক ফ্রন্টের: গাজীপুরের বারিয়ায় ফ্যান কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ ও এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের শাস্তির দাবি করেছে সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্ট। রোববার এক বিবৃতিতে সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সভাপতি রাজেকুজ্জামান রতন ও সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবিব বুলবুল এ দাবি জানান। তারা বলেন, কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে একের পর এক শ্রমিকের মৃত্যু ঘটছে। কেরানীগঞ্জের অগ্নিকাণ্ডের রেশ না কাটতেই গাজীপুরের অগ্নিকাণ্ড প্রমাণ করে, শ্রমিকদের জীবন কত নিরাপত্তাহীন। তারা নিহত শ্রমিকদের পরিবারকে আজীবন আয়ের সমান অর্থ এবং আহত শ্রমিকদের চিকিৎসা ও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানান।

আরও পড়ুন

×