গাজীপুরে কারখানায় আগুন
পরিবারে শুধুই কান্না
ইজাজ আহ্মেদ মিলন, গাজীপুর
প্রকাশ: ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৪:৩৬ | আপডেট: ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৪:৪৮
'মা আমি আর চাকরি করুম না, অনেক কষ্টের কাজ। আজকে বেতন দিলেই চাকরি ছাইড়া দিমু। পড়াশোনায় আরও একটু বেশি সময় দেওয়া দরকার।' কলেজ থেকে বাড়ি ফিরে খেজুর পাতার পাটিতে বসে কথাগুলো বলেছিলেন ফয়সাল খান। দুপুরে তখন ভাত খাচ্ছিলেন মায়ের পাশে বসে। পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্রের এ কথাগুলোই মায়ের সঙ্গে বলা তার জীবনের শেষ কথা। ছেলের এই কথাগুলোই বারবার বলছেন আর গগনবিদারী বিলাপ করছেন মা ফাতেমা আক্তার। রোববার সন্ধ্যায় গাজীপুর সদরের বাড়িয়া ইউনিয়নের কেশোরিতা এলাকার লাক্সারি ফ্যান কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে আরও নয় হতভাগ্যের সঙ্গে পুড়ে অঙ্গার হয়ে যায় পার্শ্ববর্তী কালনী খানবাড়ি এলাকার সাইফুল ইসলাম খানের ছেলে ফয়সাল খান। গাজীপুর শহরের কাজী আজিম উদ্দিন কলেজে অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি। রোববারও ক্লাস করেছেন। সহপাঠীদের সঙ্গে মেতে উঠেছিলেন আড্ডায়। পড়াশোনার খরচ জোগানোর পাশাপাশি পরিবারকে সামান্য অর্থনৈতিক সাপোর্ট দেওয়ার জন্য ওই কারখানায় চাকরিও করতেন। রোববারই চাকরিটা ছেড়ে দেওয়ার কথা ছিল তার। গতকাল সোমবার দুপুরে নিহত ফয়সাল খানের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় শত শত বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজন ঘিরে আছেন পাগলপ্রায় মাকে। কেউ তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না। সবার চোখে ছলছল জল। বাবা সাইফুলও একটু পর পর জ্ঞান হারিয়ে ফেলছিলেন একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে।
ফয়সাল খানের মতো পরিণতির শিকার হয়েছেন ওই কারখানার আরও ৯ শ্রমিক। গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পড়ে থাকা অঙ্গারগুলোই কফিনবন্দি করে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে দাফন করার জন্য সোমবার সকাল থেকেই ভিড় করেন স্বজন। তাদের আহাজারিতে হাসপাতাল চত্বর ভারি হয়ে ওঠে। সকল আইনি প্রক্রিয়া শেষে দুপুরের দিকে হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক প্রণয় ভূষণ দাস ও জয়দেবপুর থানার ওসি জাবেদুল ইসলাম এক এক করে কফিনবন্দি লাশ স্বজনের কাছে হস্তান্তর করেন। প্রথমেই কেশোরিতা গ্রামের বীর চন্দ্র দাসের ছেলে উত্তম চন্দ্র দাসের লাশ নিয়ে যায় তার পরিবার। এরপর কলেজপড়ূয়া ফয়সাল খান, গাজীপুরের বাড়িয়ার নোয়াগাঁও এলাকার লাল মিয়ার ছেলে পারভেজ হোসেন, ময়মনসিংহের রাঘবপুর গ্রামের সেলিম মিয়ার ছেলে তরিকুল ইসলাম, দিনাজপুরের কাহারোল থানার বারপটিকা এলাকার আবদুল হামিদের ছেলে লিমন ইসলাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরের মনির মিয়ার ছেলে ইউসুফ আলী, গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার মারতা গ্রামের নজরুল ইসলামের ছেলে শামীম, একই গ্রামের কামাল হোসেনের ছেলে রাশেদ, রংপুরের কাচুবকুলতলা এলাকার তাজুল ইসলামের ছেলে ফরিদুল ইসলাম ও নরসিংদীর বেলাব থানার চরকাশিনাঘর এলাকার মাজু মিয়ার ছেলে সজল মিয়ার লাশ অ্যাম্বুলেন্সে করে যার যার গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যান স্বজনরা। লাশ শনাক্তের পরও হাসপাতাল মর্গের সামনে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের জন্য অস্থায়ী বুথ খোলা হয়। সিআইডির ক্রাইম সিন ও ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরি সদস্যরা ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করেছেন। এর আগে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা হয়। লাশ দাফন ও সৎকার করার জন্য কারখানার পক্ষ থেকে ২০ হাজার ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২৫ হাজার করে টাকা দেওয়া হয়েছে স্বজনের কাছে। শ্রম মন্ত্রণালয় থেকে নিহত প্রত্যেক পরিবারকে ৫০ হাজার করে টাকা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।
অগ্নিকাণ্ডে নিহত শ্রীপুর উপজেলার মারতা গ্রামের শামীমের বাবা নজরুল ইসলাম বলেন, 'আমার একটি মাত্র ছেলেই। এভাবে ফাঁকি দিয়ে চলে যাবে ভাবতেই পারছি না। বছর দেড়েক আগে শামীমকে বিয়ে করিয়েছি। সাত মাস বয়সী ওর এক কন্যাও আছে।' এ কথা বলেই মর্গের সামনে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন নজরুল। ফয়সাল খানের স্বজনরা অভিযোগ করে বলেন, কারখানা কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের দিয়ে জোর করে ওভার টাইম করানোর জন্য তিন তলা ভবনের ওপর টিন দিয়ে তৈরি করা কারখানার বাইরে তালাবদ্ধ করে রাখে। এ কারণে আগুন লাগার পরও তারা বের হতে পারেনি। গাজীপুর জেলা প্রশাসক এসএম তরিকুল ইসলাম জানান, ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের এ ঘটনা তদন্তে ম্যাজিস্ট্রেট অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শাহীনুল ইসলামকে প্রধান করে ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী দশ কর্ম দিবসে কমিটিকে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসও ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমটি গঠন করেছে।
লাক্সারি ফ্যান কারখানার মালিক পক্ষের খামখেয়ালিপনা ও দায়িত্বহীনতার কারণেই আজ ১০টি তাজা প্রাণ অঙ্গার হয়ে গেছে বলে জানিয়েছে এলাকাবাসী। তারা দাবি করেন, কারখানার মালিক জাহিদ হোসেনসহ সংশ্নিষ্ট সকলকে গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করা হোক। জয়দেবপুর থানার ওসি মো. জাবেদুল ইসলাম জানান, ফ্যান কারখানায় ১০ জনের প্রাণহানির ঘটনায় নিহত রাশেদুল ইসলামের বাবা কামাল হোসেন সোমবার রাতে ওই কারখানার মালিক জাহিদ হোসেনসহ ৫-৬ জনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেছেন। আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশ অভিযানেও নেমেছে। জেলা পুলিশ সুপার শামসুন্নাহার বলেন, 'যারা মানুষের জীবন নিয়ে খেলা করে, তাদের কোনো ভাবেই ছাড় দেওয়া যায় না। অবশ্যই তাদের গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করব।' রোববার সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে ওই কারখানার ছাদের ওপর তৈরি টিনশেড ঘর থেকে কুণ্ডুলি পাকিয়ে আগুন বের হতে থাকে। খবর পেয়ে দমকল কর্মীরা ঘটনাস্থলে এসে প্রায় দেড় ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নেভাতে সক্ষম হন। গাজীপুর ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক মামুনুর রশীদ জানান, আগুন নেভানোর পর ওই ঘরে গিয়ে দেখতে পান বিভিন্ন স্থানে অঙ্গার হয়ে যাওয়া ১০টি লাশ পড়ে আছে। পরে তাদের উদ্ধার করে মর্গে পাঠানো হয়। এ সময় আনোয়ার হোসেন ও হাসান আলী নামে দুই শ্রমিক অগ্নিদগ্ধ হন। পরে তাদের গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক প্রণয় ভূষণ দাস জানান, দগ্ধরা শঙ্কামুক্ত।
