ক্যাম্প পরিদর্শনে মিয়ানমার প্রতিনিধিরা
নাগরিক অধিকার পেলেই ফিরতে চান রোহিঙ্গারা
কুতুপালং সম্প্রসারণ-৪ ক্যাম্পে মিয়ানমারের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে রোহিঙ্গা নেতাদের বৈঠক -সমকাল
কক্সবাজার অফিস ও টেকনাফ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৮ ডিসেম্বর ২০১৯ | ০৮:৪৯
নিজ দেশে ফিরে যেতে রোহিঙ্গাদের রাজি করাতে মিয়ানমারের প্রতিনিধি দল বুধবার আবারও কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছে। তবে প্রত্যাবাসন নিয়ে ফল সেই আগের মতোই। মিয়ানমার প্রতিনিধি দল রোহিঙ্গাদের ফিরে যেতে আহ্বান জানিয়েছে। রোহিঙ্গারা জানিয়েছে, রাখাইনে তাদের বাড়িঘরে যেতে দেওয়া হলে এবং রোহিঙ্গা হিসেবে নাগরিক অধিকার দেওয়া হলেই তারা মিয়ানমারে ফিরে যেতে রাজি।
মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক সংস্থা ও অর্থনৈতিক বিভাগের মহাপরিচালক চান আয়ের নেতৃত্বে ৯ সদস্যের প্রতিনিধি দলটি কুতুপালং সম্প্রসারণ-৪ ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলেছে। ক্যাম্পে সিআইসি অফিসে ৪৫ রোহিঙ্গার সঙ্গে ছয় নারীও ছিলেন। এ সময়ে আসিয়ানভুক্ত দেশের সাত সদস্যের একটি প্রতিনিধি দলও সেখানে উপস্থিত ছিল।
সংশ্নিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মিয়ানমারের প্রতিনিধি দলটি রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে তাদের প্রত্যাবাসনে রাজি হতে নানাভাবে আশ্বস্ত করে। এ সময়ে রোহিঙ্গারা বলে, মিয়ানমারে পরিস্থিতি এখনও শান্ত হয়নি। সেখানে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তারা জানতে চায়। জবাবে মিয়ানমার প্রতিনিধি দলের সদস্যরা তাদের আশ্বস্ত করেন, রোহিঙ্গারা ফিরে গেলে তাদের কিছুদিন অস্থায়ী ক্যাম্পে রাখা হবে। এরপর বাড়িঘরে ফিরে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে। প্রতিনিধি দলটি রোহিঙ্গাদের ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড বা এনভিসি নেওয়ার অনুরোধ জানান।
রোহিঙ্গা নেতারা জানিয়েছেন, আইসিজেতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার বিচার শুরু হলেও রাখাইনে গণহত্যা এখনও বন্ধ হয়নি। প্রাণ বাঁচাতে বাকি রোহিঙ্গারাও রাখাইন থেকে পালিয়ে যাচ্ছে। সেখানে ফিরে গেলে রোহিঙ্গারা আবার গণহত্যা-নির্যাতনের শিকার হবে।
মিয়ানমার প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সংলাপে উপস্থিত ছিলেন কুতুপালং ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নেতা মাস্টার সিরাজ। তিনি বলেন, 'মিয়ানমার প্রতিনিধি দলকে আমরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছি, কোনোভাবেই এনভিসি রোহিঙ্গারা গ্রহণ করবে না। রোহিঙ্গা স্বীকৃতি দিয়ে নাগরিক অধিকার দেওয়া হলে আমরা মিয়ানমারে ফিরে যেতে রাজি।'
অন্য এক রোহিঙ্গা নেতা ডা. জুবায়ের আহমদ বলেছেন, 'মিয়ানমার প্রতিনিধি দলটি সেই আগের কথা এবারও বলেছে। আমাদের ফিরে যেতে বলছে, কিন্তু নাগরিক অধিকারসহ বাড়িঘর ফেরত দেবে কি-না কোনো আশ্বাস দিচ্ছে না।'
তিনি বলেন, 'আমরা বলেছি রাখাইনে গিয়ে কোনো অস্থায়ী ক্যাম্পে থাকতে রোহিঙ্গারা রাজি নয়।'
ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (অতিরিক্ত) শামসুদ্দৌজা নয়ন বলেন, ‘রোহিঙ্গা ও মিয়ানমার প্রতিনিধি দলের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা হয়েছে। এ সময় রোহিঙ্গারা নাগরিকত্ত্ব, নিরাপত্তার নিশ্চিয়তাসহ তাদের দাবি তুলে ধরেন।'
মিয়ানমারের প্রতিনিধি দলটি সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কক্সবাজার বিমানবন্দরে পৌঁছায়। সেখান থেকে সরাসরি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে রওনা দেয় তারা। দুপুর দেড়টার দিকে কুতুপালং সম্প্রসারণ-৪ ক্যাম্পে গিয়ে রোহিঙ্গা নেতাদের সঙ্গে কথা বলেন। বিকেল ৫টা পর্যন্ত এই সংলাপ অব্যাহত থাকে।
মিয়ানমার প্রতিনিধি দলের নেতা সে দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক সংস্থা ও অর্থনৈতিক বিভাগের মহাপরিচালক চান আয়েকে সংলাপের অগ্রগতি সম্পর্কে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন। জবাবে তিনি বলেন, 'মিয়ানমারে ফিরে গেলে তাদের পূর্ণ নিরাপত্তা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছি।' 'রোহিঙ্গা' শব্দ উচ্চারণ না করে তিনি বলেন, রাখাইনে শুধু মুসলিমরা বাস্তুচ্যুত হয়নি। অন্যান্য ধর্মের মানুষও গৃহহীন হয়েছে। সেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপগুলোর বিরুদ্ধে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযান চলছে। এ অবস্থায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে কিছুটা সময় লাগছে।
বৃহম্পতিবারও রোহিঙ্গাদের সঙ্গে সংলাপ হবে বলে সংশ্নিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
