ঢাকা রোববার, ২১ জুন ২০২৬

উদ্যোগ

ক্যাকটাসে দিনবদল

ক্যাকটাসে দিনবদল
×

সৌরভ হাবিব, রাজশাহী

প্রকাশ: ২০ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৩:১৩

রাজশাহীর কুমারপাড়ার মাসুক। বাণিজ্যিকভাবে চাষ করছেন ক্যাকটাস। বাড়ির ছাদে নীল জালে জড়ানো শেডে নানা জাতের ক্যাকটাস থরেথরে সাজানো। প্রায় দেড় হাজার সারি সারি টব রয়েছে শেডে। গাছ রয়েছে চার হাজারের মতো। এসব টবের কোনোটিতে চারাগাছ রোপণ, কোনোটিতে গ্রাফটিং করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় পরিসরে রয়েছে বীজের অঙ্কুরোদ্‌গম। প্রায় ১২ হাজার বীজের অঙ্কুরোদ্‌গম করা হচ্ছে এই শেডটিতে। শুধু দোতলার এই ছাদেই নয়, এক তলার ছাদের বর্ধিত অংশেও ইট, বালু ও সিমেন্ট দিয়ে টানা শেড তৈরি করা হয়েছে। সেখানেও ক্যাকটাসের বীজ থেকে চারাগাছ ও বড় ক্যাকটাস উৎপাদন করা হয়।

রাজশাহী মহানগরীর কুমারপাড়ার আবুল হাসান খানের ছেলে মাসুক। সাহেববাজার থেকে তালাইমারীর দিকে এলে যে কারও সহজেই চোখে পড়বে বাড়ির ছাদের বিশাল শেড। মাসুক রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ট্যাক্স কালেকশন বিভাগে কর্মরত। অফিস সময়ের বাইরে তার অধিকাংশ সময় কাটে এই ক্যাকটাস গাছের পরিচর্যা, পরিকল্পনা, বিপণন ও বাজারজাত করায়। তার এই উদ্যোগ শুধু ফণীমনসাই ফণা তুলেছে এমন না, এই ফণার ছায়া দিচ্ছে তার ব্যবসায়ও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ব্যবসা তিনি ছড়িয়ে দিয়েছেন সারাদেশে।

মাসুক আলম বলেন, তিনটি পর্যায়ে এই শেডে ক্যাকটাস চাষাবাদ করা হয়। প্রথম পর্যায়ে ছোট ছোট প্লাস্টিকের বক্সে বীজের অঙ্কুরোদ্‌গমন ঘটানো হয়। একটি বক্সে ১০০টি বীজের অঙ্কুরোদ্‌গম হলে সেখান থেকে কমপক্ষে ৫০টি চারাগাছ পাওয়া যায়। এরপর সেসব চারাগাছ অর্ধেক টবে পুনরায় রোপণ করা হয়, বাকি অর্ধেক করা হয় গ্রাফটিং বা কলম। তৃতীয় ধাপে গ্রাফটিং করার পর গাছ বড় হলে তুলে আলাদাভাবে আরেকটু বড় টবে লাগানো হয়। ক্যাকটাস গাছ পূর্ণাঙ্গ হতে তিন বছর সময় নেয়। কিন্তু গ্রাফটিংয়ে দেড় বছরেই পূর্ণাঙ্গ ক্যাকটাস পাওয়া যায়।

মাসুক আলমের দাবি, ক্যাকটাস বাংলাদেশের অনেকেই চাষাবাদ করেন। তবে বীজের অঙ্কুরোদ্‌গমসহ বড় পরিসরে তিনিই প্রথম শুরু করেন। বীজগুলো ভারত, থাইল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আনা হয়।

মাসুক আলম বলেন, বীজের অঙ্কুরোদ্‌গমের জন্য মাটি প্রস্তুত করা সবচেয়ে কঠিন। এই জন্য বেশ শ্রম দিতে হয়। আবার কাজগুলো এমন যে শ্রমিক দিয়েও করানো যায় না। নিজেকেই করতে হয়। মাটি প্রস্তুত হয়ে গেলে সপ্তাহে একবার পানি দিলেই চলে। পানি বেশি দিলে ক্যাকটাসের শিকড় পচে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ জন্য পর্যাপ্ত রোদ যাতে পায়, এমন জায়গায় ক্যাকটাস চাষাবাদ করতে হয়।

দরদাম :মসুরের ডালের চেয়েও ছোট প্রতি পিস ক্যাকটাস বীজের দাম ২০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত। কোনো কোনো ক্যাকটাসের একটি বীজের দাম তার চেয়েও বেশি। পৃথিবীতে সাড়ে তিন হাজার ক্যাকটাসের জাত থাকলেও মাসুকের কাছে দেড়শ' থেকে দুইশ' জাতের ক্যাকটাস রয়েছে। তবে তিনি সাধারণত কম দামের ক্যাকটাসগুলোই বাজারজাত করছেন। মাসুকের কাছে বিক্রি উপযোগী চার হাজার গাছ রয়েছে। তিনি মনে করেন, কেউ দুই লাখ টাকা বিনিয়োগ করলে ছয় মাসে তা সাত লাখ টাকায় বিক্রির উপযোগী হবে। অবকাঠামোগত খরচ ও শ্রম বাদ দিলে শুধু বীজের জন্যই তিনি গত এক বছরে দুই লাখ টাকা খরচ করেছেন। প্রথম দফায় ৬০ হাজার টাকার বীজ ক্রয় করে তার মধ্য থেকে কিছু গাছ বড় করে এক লাখ ২০ হাজার টাকায় বিক্রি করেছিলেন।

মাসুক আলম বলেন, আপাতত তিন বছর ক্যাকটাস বিক্রি করে যা আয় হবে, তার সবই ক্যাকটাস চাষাবাদে বিনিয়োগ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

ক্যাকটাস হাট :গত বছরের নভেম্বরে মহানগরীর কাজীহাটায় এক ক্যাকটাসপ্রেমীর বাড়িতে বসেছিল ক্যাকটাস হাট। রাজশাহীর ৮ থেকে ১০ জন ক্যাকটাসচাষিসহ অনেক ক্রেতা সেখানে উপস্থিত হন। গত বছর সাহেববাজারে সাতজন ক্রেতার উপস্থিতিতে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে গাছগুলো বিক্রি করা হয়েছে। এ বছরের নভেম্বরে ঢাকায় গেট টুগেদার করেছেন ক্যাকটাসপ্রেমীরা। ক্যাকটাস নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শত শত ফেসবুক গ্রুপ রয়েছে। মাসুক আলম বলেন, আমি নিজে ৯৭৫টি গ্রুপের সদস্য। এ ছাড়া আমার নিজের 'বাংলাদেশ ক্যাকটাস সাকুলেন্ট লাভারস' নামে একটি গ্রুপ আছে। যেখানে ৮২টি দেশের সদস্য রয়েছে। গ্রুপের মোট সদস্য সংখ্যা প্রায় সাত হাজার। যারা গাছ ভালোবাসেন, যারা সৌন্দর্যপ্রিয়, তারা সবাই ক্যাকটাস কেনেন।

আরও পড়ুন

×