ঢাকা সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

দ্বিতীয় দিনের মতো অবস্থান কর্মসূচিতে খুবি শিক্ষার্থীরা

দ্বিতীয় দিনের মতো অবস্থান কর্মসূচিতে খুবি শিক্ষার্থীরা
×

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের একাংশ -সমকাল

খুলনা ব্যুরো ও খুবি প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০২ জানুয়ারি ২০২০ | ০৮:২৮ | আপডেট: ০২ জানুয়ারি ২০২০ | ১৩:০৫

বেতন কমানো ও আবাসন সঙ্কট নিরসনসহ ৫ দফা দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ক্রমেই উপ্তত্ত হয়ে উঠছে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় (খুবি)। বুধবার দুপুর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান নেন শিক্ষার্থীরা। প্রচণ্ড শীতের মাঝে রাতভর সেখানে অবস্থান শেষে বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা থেকে প্রশাসনিক ভবন আংশিক অবরুদ্ধ করেন তারা। 

সন্ধ্যা ৭টার দিকে তালা খুলে দিলে অবরুদ্ধ দুইশ’র অধিক শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ ফায়েক উজ্জামানকে তার বাসভবনে পৌঁছে দেন। এসময় তিনি উপস্থিত শিক্ষক ও সহকর্মীদের সহমর্মিতার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানান ও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বোধদয় হবে এই আশা ব্যাক্ত করেন। তবে প্রশাসনের বক্তব্যে পুরোপুরি সন্তষ্ট না হওয়ায় আন্দোলন এখনো চলমান রয়েছে। 

বুধবার থেকে প্রশাসনিক ভবনের সামনে শিক্ষার্থীদের অবস্থান কর্মসূচি শুরু হয়। তাদের মূল দাবির মধ্যে রয়েছে বেতন ফি কমানো, আবাসন সঙ্কট নিরসন, পরীক্ষার খাতায় কোডিং পদ্ধতি চালু, মুক্তচিন্তা বিকাশে সহায়ক অধ্যাদেশের ব্যবস্থাকরণ।  

এদিকে শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে করণীয় নির্ধারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিনদের সমন্বয়ে গঠিত ৯ সদস্যের কমিটি বৃহস্পতিবার বিকাল পাঁচটায় সংবাদ সম্মেলনে তদন্তে অগ্রগতির বিষয়ে কথা বলেন। 

আন্দোলনরত এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০১২, ২০১৩ ও ২০১৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি সেমিস্টারের বেতন ৭৯০ টাকা ছিল। ২০১৫ সালে বেতন বৃদ্ধি করে ১ হাজার ৭৬৯ টাকা করা হয়। ২০১৭ সালে তা আরও বৃদ্ধি করে ৩ হাজার ৭৮৬ টাকা এবং ২০১৮ সালে আবার বাড়িয়ে ৩ হাজার ৯৩৮ টাকা করা হয়। তবে বেতন বাড়লেও সে অনুপাতে সুযোগ-সুবিধা বাড়েনি। 

এ বিষয়ে প্রশাসনের দাবি, অনেক পুরোনো কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় আমাদের বেতন-ফিস কিছুটা বেশি। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেটা কম। ইতোমধ্যে পর্যালোচনা করে পরিবহন, বিদ্যুৎসহ আরো কিছু খাতে খরচ কমানো ও শিক্ষার্থীদের জামানত না নেবার সুপারিশ করা হতে পারে। 

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বলেন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ১৯৯০ এর ৫ম খন্ড দাগ নাম্বার ৪৫, পৃষ্ঠা ৬৬১৫ এ উল্লেখ আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেক ছাত্র সংবিধি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশ দ্বারা নির্ধারিত স্থান ও শর্তাধীনে বসবাস করবে। অথচ মোট শিক্ষার্থীর মাত্র ৩১ দশমিক ৫৯ শতাংশ আবাসনের সুযোগ পায়। আবাসন সঙ্কট নিরসনে কতদিনের মধ্যে নতুন হল হবে তা লিখিত আকারে জানানোর পাশাপাশি নতুন হল নির্মাণের আগে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে হোস্টেল ব্যবস্থার দাবি জানান।

আবাসন সঙ্কটের বিষয়ে প্রশাসন বলছে, এই সমস্যা পুরোপুরি কখনই মোকাবিলা করা সম্ভব না। এ বছরের মার্চের মধ্যে বঙ্গমাতা হলে ৬০০ ছাত্রীর আবাসন ব্যবস্থা হবে। এছাড়া ছেলে ও মেয়েদের জন্য ১০ তালা করে ২টি হলের প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া হোস্টেল ব্যবস্থাটা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় প্রয়োজন ছিল। নিরাপত্তা ও পরিচালনাসহ বেশকিছু কারণে এটি এখন যৌক্তিক নয়। 

সাংস্কৃতিক কার্মকাণ্ডে সবসময় অনুমতি নেওয়াটা শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাঁধা দেওয়া বলে অভিযোগ করেন শিক্ষার্থীরা। এ প্রসঙ্গে কর্তৃপক্ষ বলেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ত্রিশটিরও অধিক সংগঠন সুন্দরভাবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতে ছাত্ররাজনীতি না আসে সেজন্য ধারাগুলো শিক্ষার্থীদের দাবির প্রেক্ষিতেই তৈরি হয়। এছাড়া ক্লাস চলাকালীন সময়ে শব্দের ব্যবহার না করার নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলে তা শিক্ষার্থীদের জন্য ক্ষতিকর হবে। 

পরীক্ষার খাতা দ্বিতীয় পরীক্ষক দ্বারা মূল্যায়ন এবং প্রয়োজন অনুসারে তৃতীয় পরীক্ষণের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি খাতায় কোডিং পদ্ধতি চালু করা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, বিনোদন ব্যবস্থা আয়োজন ও ম্যাগাজিন, বুলেটিন, পোস্টার প্রকাশনায় শিক্ষার্থীদের স্বাধীনতা ও সম্পৃক্ততা নিশ্চিতের দাবি জানান আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। 

পরীক্ষার পদ্ধতির বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ বলেছে, পরীক্ষার খাতা দ্বিতীয় পরীক্ষক দিয়ে মূল্যায়ন করা হলে সময়ের মধ্যে ফলাফল দেওয়া যাবে না। এতে একাডেমিক ক্যালেন্ডার মানা সম্ভব না। যার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশনজট সৃষ্টি হবে। কোডিং পদ্ধতিটা খুব বেশি যৌক্তিক না। পরীক্ষার খাতা দু’ভাগে দুইজন শিক্ষক দেখেন। এতে ৩০ মার্কের বেশি বা কম দেবার ক্ষমতা একজন শিক্ষকের নেই। বাকি মার্কগুলোও উপস্থিতি ও কয়েক ধাপে অ্যাসেসমেন্টের ওপর দেওয়া হয়। তাই এই দাবিটিও খুব বেশি যৌক্তিক নয়। তবে কোন শিক্ষার্থী খাতা চ্যালেঞ্জ করলে তা তৃতীয় পরীক্ষকের কাছে পাঠানোর নিয়ম রয়েছে। 

শিক্ষার্থীরা লাইব্রেরি সময়সীমা সকাল ৭টা থেকে ১০টা করে সপ্তাহে ৭ দিনই খোলা রাখার দাবি জানান। এছাড়া গল্প, উপন্যাস, জার্নাল, একাডেমিক গ্রন্থসহ সব ধরনের বই বৃদ্ধি করার দাবি জানিয়ে সার্বক্ষণিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতে ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসক রাখার পাশাপাশি মেডিকেলে প্রয়োজনীয় সকল সরঞ্জাম কেনার দাবি জানান। 

এ বিষয়ে প্রশাসন বলেছে, লাইব্রেরি থেকে প্রাপ্ত উপস্থিতির হিসাব থেকে দেখা যায় দুইশ’ জনের অধিক শিক্ষার্থীর একসঙ্গে বসার ব্যবস্থা থাকলেও তাদের একমাসে গড় উপস্থিতি মাত্র তেরো জন। এমন অবস্থায় লাইব্রেরি দীর্ঘ সময় খোলা রাখবার যৌক্তিকতা নেই। তবে প্রয়োজন হলে তা অবশ্যই করা হবে। এছাড়া বাকি বিষয়গুলোও পর্যায়ক্রমে আরো উন্নত করা হবে। 

এদিকে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে দেখছে বর্তমান প্রশাসন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন সিনিয়র শিক্ষক দাবি করেন, কয়েকজন শিক্ষকের প্ররোচনায় কিছু শিক্ষার্থী এই আন্দোলন করছে। সমাবর্তনের আগে এসব শিক্ষক পরিস্থিতি উপ্তত্ত করতে চেয়েছিলেন। সেটি সম্ভব না হওয়ায় এখন তারা শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করছেন।

তবে প্রশাসনের এ ধরনের বক্তব্য প্রত্যাখান করেছে শিক্ষার্থীরা। তারা বলেন, যৌক্তিক দাবি নিয়ে তারা এই আন্দোলন করছেন। 

শিক্ষার্থীরা জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতি না থাকায় এসব বিষয় নিয়ে জোরালো প্রতিবাদ করার সুযোগ নেই। প্রতিবাদ করলে পরে প্রশাসনের হয়রানির শিকার হতে হয়। কিন্তু তা সত্বেও গতবছরের ১৩ নভেম্বর এসব সমস্যা তুলে ধরে ছাত্র বিষয়ক পরিচালকের মাধ্যমে উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেন শিক্ষার্থীরা। এরপর ২১ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের সকল সমস্যা সমাধানের আশ্বাস প্রদান করে। পরবর্তীতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রত্যাশিত সাড়া না পাওয়ায় তারা অবস্থান কর্মসূচির আহ্বান করেন।

পরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য প্রকাশ করেছে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়েল জনসংযোগ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক এস এম আতিয়ার রহমানের স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা ১ জানুয়ারি সকাল ১১টা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ভবনের সামনে গেইটের বাইরে অবস্থান করে নানা ধরনের শ্লোগান দিতে থাকে। দুপুর সোয় ২টার দিকে শিক্ষার্থীদের সামনে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ সর্ম্পকে জানাতে হাজির হন সকল অনুষদের ডিন, রেজিস্ট্রার ও ছাত্র বিষয়ক পরিচালক। কিন্তু অবস্থানরত শিক্ষার্থীরা ডিনদের কোনো কথাই শুনতে চায়নি। কিছু সংখ্যক শিক্ষার্থী বুধবার ডিনদের সঙ্গে যে আচরণ করে তা সম্পূর্ণ অনভিপ্রেত, অশোভন ও অত্যন্ত দুঃখজনক এবং সঙ্গে সঙ্গে তা উদ্বেগের। 

এছাড়া কর্তৃপক্ষ আরও উদ্বিগ্ন এই কারণে যে, কিছু সংখ্যক শিক্ষার্থীর এই আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক সরাসরি ইন্ধন দিচ্ছেন এবং নানাভাবে তাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন। এমনকি তাদের মধ্যে কয়েকজন বুধবার দুপুরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সামনে সরাসরি হাজির হয়ে বক্তব্যও রাখেন, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে নজিরবিহীন।  

ওই বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ‘কর্তৃপক্ষ মনে করে অন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা যথেষ্ট সচেতন ও বিচারবুদ্ধি সম্পন্ন। তারা তাদের দাবির যৌক্তিকতা বিষয়ে নিশ্চয়ই পর্যলোচনা করবে এবং তারা অন্যের পাতা ফাঁদে পা দেবে না বলে কর্তৃপক্ষ আশা করে।’

সার্বিক বিষয় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ ফায়েক উজ্জামান বলেন, ইতোমধ্যে অন্য সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতন-ফি তালিকা সংগ্রহের কাজ চলছে। যদি অত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি অস্বাভাবিক বেশি হয়ে থাকে তা কমানো হবে। 

তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার জন্য গঠিত কমিটি যেসব সুপারিশ করবে তা দ্রুততম সময়ে বাস্তবায়ন করা হবে।

আরও পড়ুন

×