ঢাকা সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

মালয়েশিয়ায় প্রবাসীদের সঙ্গে মতবিনিময়

আটক প্রবাসীদের মুক্ত করতে আলোচনা করব: প্রধানমন্ত্রী

আজ আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে বৈঠক

আটক প্রবাসীদের মুক্ত করতে আলোচনা করব: প্রধানমন্ত্রী
×

মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি-সমকাল

কামরুল হাসান, কুয়ালালামপুর থেকে

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬ | ০২:১৫

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘বহু দিন ধরে বাংলাদেশ থেকে মানুষ কাজ নিয়ে মালয়েশিয়ায় যেতে পারছে না। এই সমস্যা কাটাতে আমরা মালয়েশিয়ার সরকারের সঙ্গে কথা বলব। একই সঙ্গে অনেক প্রবাসী বিভিন্ন কারণে মালয়েশিয়ায় আটক আছেন; তারা দেশে ফিরতে পারছেন না। এসব মানুষ কীভাবে মুক্ত হবে, তা নিয়েও আলোচনা করব।’

গতকাল রোববার মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুর পৌঁছার পর হোটেলে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। এর আগে দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালে তাঁকে লাল গালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয়। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন সহধর্মিণী জোবাইদা রহমান। 

মতবিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘দেশ থেকে দক্ষ শ্রমিক মালয়েশিয়ায় চাই। বাংলাদেশ থেকে যারা আসবে, যে দেশেই হোক তাদের আমরা ট্রেনিং দিতে চাইছি। পরবর্তী সময়ে যারা আসবে তারা যাতে অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে না আসে।’ তিনি বলেন, প্রবাসী বাংলাদেশীরা একসঙ্গে দুটি দেশ গড়ার কাজ করছেন। প্রথমত, কষ্টার্জিত রেমিট্যান্স পাঠিয়ে বাংলাদেশের উন্নয়নে কাজ করছেন। দ্বিতীয়ত, যেই দেশে তারা থাকেন সেই দেশটিও গড়ার কাজ করছেন। 

প্রবাসী এবং মালয়েশিয়ার ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে আরও বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা যদি অন্য একটি দেশ গড়তে পারি তাহলে নিজের দেশ গড়তে পারব না কেন? এ ক্ষেত্রে সবাইকে এগিয়ে এসে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।’ তিনি তাঁর বক্তব্যে রাষ্ট্র পরিচালনায় বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম ও পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।

তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা জানি, মালয়েশিয়ায় সেমি-কন্ডাক্টর, আইটি সেক্টর খুব ভালো। আমরা চাই বাংলাদেশে তাদের আমন্ত্রণ জানাতে। মালয়েশিয়ার ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানাতে চাই। অনেক সেক্টর আছে যেখানে তারা বিনিয়োগ করতে পারেন।’

মতবিনিময়কালে মঞ্চে প্রধানমন্ত্রীর পাশে জোবাইদা রহমান ছিলেন। এ সময় মালয়েশিয়া বিএনপির সভাপতি প্রকৌশলী বাদলুর রহমান খান, সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেনসহ স্থানীয় নেতাকর্মী, প্রবাসী শিক্ষক-শিক্ষার্থী, প্রকৌশলী, শ্রমিকসহ মালয়েশিয়া হাইকমিশনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

কুয়ালালামপুরে লাল গালিচা সংবর্ধনা

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে গতকাল স্থানীয় সময় রাত ৮টা ৪৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। এ সময় তাঁকে লাল গালিচা সংবর্ধনার পাশাপাশি  গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। এ সময় দুই দেশের জাতীয় সংগীত বাজানো হয়। 
প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বাংলাদেশ বিমানের বিশেষ ফ্লাইট বিমানবন্দরের বুঙ্গা রায়া কমপ্লেক্সে এক্সক্লুসিভ ভিভিআইপি টার্মিনালে অবতরণ করে। সেখানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান মালয়েশিয়ার ধর্মমন্ত্রী জুলকিফলি হাসান এবং তাঁর সহধর্মিণী। ছোট শিশু মাইসা নুর আইশা ফুল দিয়ে জোবাইদা রহমানকে শুভেচ্ছা জানান।

এ সময় বাংলাদেশের হাইকমিশনার মনজুরুল করিম খান চৌধুরী ও ডেপুটি হাইকমিশনার সাহানারা মনিকা উপস্থিত ছিলেন।

এরপর বিমানবন্দর থেকে প্রধানমন্ত্রীকে বিশেষ মোটর শোভাযাত্রা সহকারে কুয়ালালামপুরের ‘শাংরি-লা’ হোটেলে নেওয়া হয়। সফরে প্রধানমন্ত্রী, তাঁর সহধর্মিণী ও সফরসঙ্গীরা এই হোটেলে থাকবেন। হোটেলে পৌঁছে প্রধানমন্ত্রী প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। 

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সফরসঙ্গীদের মধ্যে আছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, বৈদেশিক কর্মসংস্থান-বিষয়ক উপদেষ্টা মাহাদী আমিন, প্রতিরক্ষা-বিষয়ক উপদেষ্টা একেএম শামসুল ইসলাম প্রমুখ। এ ছাড়া আছেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবিএম আবদুস সাত্তার, পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন প্রমুখ।

এদিকে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম আজ সোমবার সকালে পুত্রাজায়ায় তাঁর কার্যালয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আনুষ্ঠানিকভাবে সংবর্ধনা জানাবেন। সেখানে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে প্রথমে একান্ত বৈঠক এবং এর পরপরই উভয় দেশের সরকারপ্রধানের নেতৃত্বে উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দলের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। দুই প্রধানমন্ত্রী পরে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার কথা। এই সফরে মালয়েশিয়ার সঙ্গে পর্যটন ও সংস্কৃতি-বিষয়ক সহযোগিতা নিয়েও দুটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হতে পারে।

জানা গেছে, দুই দেশের সরকারপ্রধানের নেতৃত্বে উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দলের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মালয়েশিয়ার বিভিন্ন সেক্টরে নতুন বাংলাদেশি কর্মী নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হবে। আলোচনার বিষয়বস্তু হবে বাণিজ্য, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, জ্বালানি সহযোগিতা, হালাল অর্থনীতি, সেমি-কন্ডাক্টর শিল্প এবং কৃষি, শিক্ষা ও জনযোগাযোগ। এসব ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে অধিকতর সহযোগিতা স্থাপন নিয়ে আলোচনা হবে।

পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম জানান, মালয়েশিয়ার বিভিন্ন সেক্টরে নতুন বাংলাদেশি কর্মী নেওয়া, আসিয়ানে বাংলাদেশের যোগদান, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে মালয়েশিয়ার সমর্থন চাওয়া হবে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকারপ্রধানের দায়িত্ব নেওয়ার পর মালয়েশিয়ায় প্রথম সফরে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আজ স্থানীয় সময় বিকেলে তিনি কুয়ালালামপুর থেকে চীনের বন্দরনগর দালিয়ানে যাবেন। ২৩ থেকে ২৬ জুন চীন সফর করবেন। ২৬ জুন বিকেলে প্রধানমন্ত্রী বেইজিং থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেবেন। 

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠনের পরপরই তারেক রহমানকে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম রাষ্ট্রীয় সফরের আমন্ত্রণ জানান। সেই আমন্ত্রণেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর এই আনুষ্ঠানিক সফর। দক্ষিণ এশিয়ায় চীন ও  ভারতের পর মালয়েশিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্য সহযোগী দেশ বাংলাদেশ।

সিন্ডিকেটমুক্ত শ্রমবাজার দাবি   

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মালয়েশিয়াপ্রবাসী বাংলাদেশিদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হলো বন্ধ ও সীমিত হয়ে থাকা শ্রমবাজারের জটিলতা দূর করা। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশের বিশাল চাহিদা থাকা সত্ত্বেও বিগত দিনগুলোতে নানা আইনি ও কূটনৈতিক জটিলতায় স্থবিরতা নেমে এসেছে। 

বাংলাদেশ-মালয়েশিয়ার ব্যবসায়ী মো. মামুন বিন আব্দুল মান্নান সমকালকে বলেন, ‘বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকার গঠনের পর প্রথম মালয়েশিয়া সফর করছেন। এটি কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা শ্রমবাজার সিন্ডিকেটমুক্ত হয়ে চালু হবে এবং প্রবাসীদের দুঃখ-দুর্দশা লাঘবে তিনি কিছু পদক্ষেপ নেবেন। বিশেষ করে দুই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য আরও সম্প্রসারণ করতে হবে।’

কয়েকজন প্রবাসী বলেন, সিন্ডিকেট ভেঙে বিমান টিকিটের মূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনতে হবে। প্রবাসীদের রক্ত পানি করা টাকা যেন কোনো মধ্যস্বত্বভোগী লুটে নিতে না পারে, সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর হস্তক্ষেপ চাই। প্রবাসীদের কেউ মারা গেলে সেটি তাদের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। কারণ মালয়েশিয়ায় কর্মরত অবস্থায় কোনো প্রবাসী মারা গেলে তাঁর মরদেহ দেশে পাঠানো নিয়ে পরিবারগুলোকে চরম ভোগান্তি ও আর্থিক অনটনে পড়তে হয়। প্রবাসী বাংলাদেশিদের দীর্ঘদিনের দাবি, কোনো প্রবাসী মারা গেলে সরকারি খরচে তাঁর লাশ যেন সর্বোচ্চ তিন দিনের মধ্যে বাংলাদেশে স্বজনদের কাছে পাঠানো হয়। 

মালয়েশিয়াপ্রবাসী ও সেখানকার যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির কর্মবিষয়ক সম্পাদক জাহাঙ্গীর হাওলাদার বলেন, মালয়েশিয়াপ্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে অর্থনীতির চাকা সচল রাখছেন। রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের এই বিশাল ত্যাগ ও অবদানের বিপরীতে প্রধানমন্ত্রীর এই সফর তাদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার এক নতুন সুযোগ সামনে এনে দিয়েছে। 

আরও পড়ুন

×