ভাসানী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। ফাইল ছবি
টাঙ্গাইল প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬ | ২৩:২৪
টাঙ্গাইলে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগে শিক্ষক নিয়োগকে কেন্দ্র করে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। যাচাই-বাছাইয়ে অযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত একজন প্রার্থীকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ এবং প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত করার ঘটনায় আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। অনিয়মের বিষয়ে গত ১৮ মে রফিকুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ১২ আগস্ট প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির আলোকে ফার্মেসি বিভাগের প্ল্যানিং কমিটি আবেদনপত্র যাচাই-বাছাই করে। যাচাই শেষে ৩৪ জন আবেদনকারীর মধ্যে ২৬ জনকে যোগ্য এবং আটজনকে অযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অযোগ্য ঘোষিতদের মধ্যে ছিলেন অন্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সাফিয়া আফরিন নামের এক প্রার্থী। প্রয়োজনীয় অনাপত্তিপত্র (এনওসি) ও শর্তযুক্ত কাগজপত্র সংযুক্ত না থাকায় তাদের আবেদনপত্র অসম্পূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়। অভিযোগ রয়েছে, শর্ত না মেনে অযোগ্য ঘোষিতদের মধ্য থেকে সাদিয়া আফরিনকে নিয়োগ পরীক্ষায় বসার জন্য বিবেচিত করা হয়।
এ বিষয়ে তৎকালীন বিভাগীয় চেয়ারম্যান ও প্ল্যানিং কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, সাফিয়া আফরিনসহ আটজনের আবেদন অসম্পূর্ণ ছিল। এ কারণে তাদের কাউকেই ক্লিয়ারেন্স দেওয়া হয়নি। আমাদের কাছে পাঠানো কাগজে তাদের এনওসি ছিল না। তাই মূল কাগজের সঙ্গে এই ছাড়পত্র ছিল কি না, এটি যাচাইয়ের জন্য রেজিস্ট্রার অফিসে পাঠাই। পরে রেজিস্ট্রার অফিস থেকে আমাদের কিছুই জানানো হয়নি। পরে সাফিয়া যে ছাড়পত্র দেখিয়েছেন, সেটি বৈধ ছিল না। একই ত্রুটির কারণে অন্য সাতজন প্রার্থীর আবেদন বাতিল হলেও সাফিয়া আফরিনকে নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়। পরে তিনি প্রাথমিকভাবে নির্বাচিতও হন বলে আমরা জানতে পেরেছি।
প্ল্যানিং কমিটি কোনো লিখিত বা মৌখিক সুপারিশ করেনি জানিয়ে তিনি আরও বলেন, যদি পরে কোনো কাগজপত্র জমা হয়ে থাকে, তাহলে নিয়ম অনুযায়ী বিষয়টি প্ল্যানিং কমিটিকে অবহিত করা উচিত ছিল। প্ল্যানিং কমিটির সভাপতি হওয়া সত্ত্বেও সাফিয়া আফরিনের কথিত এনওসির কোনো কপি আমাকে দেখানো হয়নি।
প্ল্যানিং কমিটির সদস্য এবং ফার্মেসি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, রেজিস্ট্রার অফিস থেকে যে ৯ সেট আবেদনপত্র আমাদের কাছে পাঠানো হয়েছিল, সেগুলোর মধ্যে আলোচিত প্রার্থীর আবেদনপত্রে এনওসি সংযুক্ত ছিল না। তবে মূল কপির সঙ্গে এনওসি ছিল কি না, তা আমরা এখনও জানি না। এ বিষয়ে রেজিস্ট্রার অফিসের কাছে একাধিকবার জানতে চাওয়া হলেও কোনো তথ্য বা কপি আমাদের দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, ক্লোজিং নোটে উল্লেখ করা হয়েছিল, যদি মূল কপির সঙ্গে এনওসি সংযুক্ত থাকে, তাহলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
ড. সাইফুল বলেন, যদি আবেদনের সময় এনওসি জমা দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে ভাইভার একদিন আগে নতুন করে এনওসি দেওয়ার প্রয়োজন হলো কেন ? আর যদি নতুন করে এনওসি জমা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে বাকি সাতজনকে কেন একই সুযোগ দেওয়া হয়নি ?
প্ল্যানিং কমিটির আরেক সদস্য সহযোগী অধ্যাপক ইশরাত জাহান ইরা বলেন, নিয়োগ দেওয়ার এখতিয়ার প্ল্যানিং কমিটির নয়। আমাদের দায়িত্ব ছিল কে শর্ত পূরণ করেছেন আর কে করেননি, তা যাচাই করা। কাকে নিয়োগ দেওয়া হবে, সেটি সিলেকশন বোর্ডের বিষয়। তবে আটজন অযোগ্য প্রার্থীর মধ্যে একজনকে কেন বিশেষভাবে সুযোগ দেওয়া হলো, সেটি অবশ্যই প্রশ্নের জন্ম দেয়। এ ছাড়া ২০২৪ সালের এনওসি ২০২৫ সালে জমা দিলে সেটি বৈধ হওয়ার কথা নয়।
প্ল্যানিং কমিটির আরেক সদস্য ও বর্তমান বিভাগীয় চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. আশরাফ আলী বলেন, রিজেন্ট বোর্ড না হওয়া পর্যন্ত আমি কোনো মন্তব্য করতে রাজি নই।
সব অভিযোগ অস্বীকার করে প্রার্থী সাফিয়া আফরিন বলেন, গত ১২ আগস্ট ২০২৫ তারিখে প্রকাশিত ফার্মেসি বিভাগের প্রভাষক পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির বিপরীতে সব শর্ত পূরণ করে আমি আবেদন করি। এ ছাড়া গত ১১ মে অনুষ্ঠিত নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করি। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রেজেন্টেশন ও ভাইভায় অংশ নেই। ভাইভা বোর্ডে আমার পারফরম্যান্সে বোর্ড সদস্যরা সন্তুষ্ট ছিলেন। আমি আবেদনের সঙ্গে এনওসি সংযুক্ত করেই আবেদন করেছি এবং মূল আবেদনপত্রের সঙ্গে এনওসির মূল কপিও জমা দিয়েছি। আমি ৬ জানুয়ারি তৎকালীন বিভাগীয় চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমানকে জানাই যে, আমার মূল আবেদনপত্রের সঙ্গে এনওসি সংযুক্ত রয়েছে।
সাফিয়া আফরিন আরও বলেন, ‘আমার এনওসির ইস্যু তারিখ কিছুটা আগের ছিল। কর্মরত প্রতিষ্ঠান স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জন্য একবারই এনওসি ইস্যু করে। পরে প্রয়োজন হলে কপি পুনরায় ইস্যু করা যায়। সে কারণে নিয়োগ পরীক্ষার আগেরদিন, ১০ মে ২০২৬ তারিখে আমি এনওসির একটি কপি পুনরায় সংগ্রহ করি। ভাইভা বোর্ডে এনওসি প্রদর্শনের অনুরোধ করা হলে আমি সেটি দেখাই।
এ বিষয়ে তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আনোয়ারুল আজিম আখন্দ বলেন, প্রবেশপত্র বিতরণের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক শাখার দায়িত্ব। এ বিষয়ে আমি অবগত ছিলাম না।
রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ ওয়াহিদ বলেন, আমি সে সময় ছুটিতে থাকায় বিষয়টি আমার নজরে আসেনি। আমাদের কাছে এ বিষয়ে কেউ কোনো অভিযোগ করেনি। ইউজিসিতে লিখিত অভিযোগের বিষয়েও আমি জানি না।
