হাওরে ফসলহানি নিয়ে সরকারি তথ্যের সঙ্গে মাঠের অমিল
পানিতে ডুবে থাকা ধান কাটছেন কৃষক। ঢলের ঠান্ডা পানি ও প্রবল বাতাসে দীর্ঘ সময় পানিতে থাকা কঠিন হয়ে উঠলেও যতটা সম্ভব ফসল বাঁচানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। গতকাল রোববার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার মেদির হাওর থেকে তোলা। ছবি: সমকাল
জাহিদুর রহমান
প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬ | ১০:৩৮ | আপডেট: ০৪ মে ২০২৬ | ১২:২০
হাওরাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন জেলার কৃষক পার করছেন কঠিন সময়। অধিকাংশ হাওরই এখন পানিতে থইথই করছে; এর নিচে রয়েছে কৃষকের বছরের একমাত্র ফসল বোরো ধান। কোথাও কোথাও কৃষক কিছু ধান কাটতে পেরেছেন। কিন্তু অনেক ধান চারা গজিয়ে নষ্ট হচ্ছে কৃষকের খলায়।
ক্ষতি কমাতে কোনো কোনো জায়গায় কৃষক কাঁচা ধানই সেদ্ধ করছেন। ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ জেলার প্রায় সব হাওর-তীরবর্তী গ্রামের কৃষকের অভিজ্ঞতা কমবেশি প্রায় একই। তুলনামূলক কম ক্ষতি হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। সেখানে এখনও কৃষক ধান ঘরে তোলার আশা করছেন। আবার নেত্রকোনার সমতল ও গারো পাহাড়ি এলাকায় বিলের বাইরের জমির ধান এখনও কৃষকের অনুকূলে রয়েছে। তবে বিল ও হাওর এলাকায় ধানের ক্ষতি হয়েছে বলে তারা বলছেন। যদিও সুনামগঞ্জের তুলনায় ক্ষয়ক্ষতি নেত্রকোনায় কম। কারণ, এখানে হাওরাঞ্চল কম।
হাওর বিস্তৃত সাত জেলা নিয়ে। বিশাল তার সীমানা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর গতকাল রোববার জেলা অনুযায়ী ক্ষয়ক্ষতির একটি প্রাথমিক তথ্য দিয়েছে। তাতে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে সুনমাগঞ্জে। তবে সরকারি তথ্যে যে চিত্র পাওয়া যাচ্ছে, তার সঙ্গে কৃষকদের কথা ও অভিজ্ঞতার বিস্তর ফারাকও দেখা যাচ্ছে।
কৃষকের ভাষ্য, সরকারি হিসাবের তুলনায় ক্ষয়ক্ষতি জায়গাভেদে অনেক বেশি। তারা প্রশ্ন তুলেছেন, কৃষি বিভাগ কোন হিসেবে এখনও পানিতে ডুবে যাওয়া জমি পুনরুদ্ধারের আশা করছে তা নিয়ে। পানির নিচে চার-পাঁচ দিন ধরে থাকা ধান কতটা ওঠানো যাবে, পানি আদৌ কমবে কিনা, কাটতে পারলেও পানির নিচে থাকা কাঁচা-পাকা ধান মানুষের খাদ্য উপযোগী থাকবে কিনা– এসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলছেন তারা। ধান তো দূরের কথা, এ বছর গরুর খাবারের খড় জোগাড় করাই কষ্টকর হবে– এ শঙ্কা তাদের।
এদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের তথ্য ও কেন্দ্রের তথ্যের মধ্যের রয়েছে গরমিল। আবার বেসরকারি সংস্থার তথ্যের সঙ্গে সরকারি তথ্যের মিল নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্ষয়ক্ষতির হিসাবের ভিত্তিতে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা ও পুনর্বাসনের কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়। সরকারি হিসাবে গরমিল থাকলে জটিলতা দেখা দিতে পারে। সংশ্লিষ্ট অন্য মন্ত্রণালয় এবং বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে নির্ভুল চূড়ান্ত হিসাব তৈরি করা দরকার। এতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও সম্পদের বিবরণও থাকতে পারে।
ক্ষয়ক্ষতির চিত্র
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের তথ্য বলছে, বৃষ্টি আর ঢলে সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৪৬ হাজার ৭৩০ হেক্টরের বেশি ধানক্ষেত তলিয়ে ফসলের ক্ষতি হয়েছে। রোদ না থাকায় ধান তোলার পরও নষ্ট হচ্ছে। সব মিলিয়ে এবার মোট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে আট লাখ ৫৫ হাজার টনের মতো, যার মধ্যে ক্ষতি দাঁড়াতে পারে আনুমানিক এক কোটি তিন লাখ টন। গতকাল পর্যন্ত ধান কাটা হয়েছে ৭১ দশমিক ২৬ শতাংশ। পানিতে তলিয়ে গেছে ১০ দশমিক ২৭ শতাংশ ধানক্ষেত। ক্ষতির হার জেলাভেদে খুবই অসম। কোথাও মাত্র ২-৫ শতাংশ, আবার কোথাও তা ২০-৩০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সিলেট অঞ্চলের সঙ্গে ঢাকার তথ্যের গরমিল পাওয়া গেছে। সিলেট অঞ্চলের দেওয়া তথ্যমতে, বিভাগের চার জেলায় ৩০ হাজার ৬০৫ হেক্টর জমির ধান পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। এর মধ্যে সুনামগঞ্জ জেলায় ১৯ হাজার ৩২৬ হেক্টর, হবিগঞ্জে আট হাজার ৬৫৩, সিলেটে ৩২৭ এবং মোলভীবাজারে দুই হাজার ৫৯৯ হেক্টর জমি রয়েছে।
অন্যদিকে পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থা গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছে, চলতি বোরো মৌসুমে ৭৫ হাজার হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। শিলাবৃষ্টিতে আরও প্রায় ৮০০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইং থেকে বলা হয়েছে, সুনামগঞ্জে ১৪ হাজার ৩৭১ হেক্টর, নেত্রকোনায় ১১ হাজার ৫২২ হেক্টর, কিশোরগঞ্জে ৯ হাজার ৪৫, হবিগঞ্জে আট হাজার ৭৫০, সিলেটে ৫১০, মৌলভীবাজারে দুই হাজার ১৬০ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৩৭২ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
যদিও হাওরে কৃষকদের নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের লোকজন বলছেন, কৃষি বিভাগের দেওয়া হিসাবের চেয়ে ধানের ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি। হাওরের নিচু অংশে এখনও যে পরিমাণ পানি রয়ে গেছে, তাতে ধান কাটার কোনো উপায় নেই। এসব জমিতে থাকা ধানের যে হিসাব কৃষি বিভাগ দিচ্ছে, সবই ক্ষতির সঙ্গে যুক্ত হবে।
পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা বলেন, ‘কৃষি বিভাগ যে হিসাব দেখিয়েছে, তাতে হাওরে এক লাখ ৩০ হাজার ৮১২ হেক্টর জমির ধান এখনও কাটা হয়নি। এই জমি তো সব পানির নিচে। এখন আর গভীর হাওরে কোনো ধান কাটার মতো অবস্থা নেই। আমরা মনে করছি, কমপক্ষে ৭৫ হাজার হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, প্রাথমিক হিসাবের চেয়ে ক্ষতির পরিমাণ বাড়বে। তারা মাঠ পর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণে নির্দেশনা দিয়েছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন ইউংয়ের অতিরিক্ত পরিচালক ড. মো. জামাল উদ্দিন বলেন, মাঠ থেকে তথ্য আসা শুরু হয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রাথমিকভাবে ক্ষতির তথ্য তৈরি করেছি। তবে পুরো ক্ষতির তথ্য চূড়ান্ত করতে আরও সময় লাগবে।
এদিকে সরকারিভাবে এখন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সহায়তা কার্যক্রম শুরু হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্ষয়ক্ষতির হিসাবের ভিত্তিতে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা ও পুনর্বাসনের কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়। সরকারি হিসাবে গরমিল থাকলে জটিলতা দেখা দিতে পারে। সংশ্লিষ্ট অন্য মন্ত্রণালয় এবং বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে নির্ভুল চূড়ান্ত হিসাব তৈরি করা দরকার। এতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও সম্পদের বিবরণও থাকতে পারে।
সহায়তা কার্যক্রম শুরু হয়নি এখনও
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (ত্রাণ কর্মসূচি অধিশাখা, জরুরি সাড়াদান ও সমন্বয় অধিশাখা) সেখ ফরিদ আহমেদ বলেন, আমরা ওই সাত জেলার (বন্যাকবলিত) জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে কথা বলেছি। প্রধানমন্ত্রী সংসদেও বলেছেন তাদের সাহায্য-সহযোগিতার ব্যাপারে। আগামী তিন মাস তাদের মানবিক সহায়তা বা খাদ্য সহায়তা যেখানে যা প্রয়োজন, সেটা দেওয়ার জন্য।
তিনি বলেন, আমরা প্রাথমিকভাবে জেলা প্রশাসকদের কাছে যে বরাদ্দ ছিল, তার অতিরিক্ত কিছু বরাদ্দ দিয়েছি সিলেট ও ময়মনসিংহে। আর অন্যদের যেটা স্থানীয়ভাবে ছিল, সেটা দিয়েই তারা সহায়তা দিচ্ছে। একটা তথ্য বিবরণী ফরম তাদের কাছে পাঠিয়েছি। সেটা দিয়ে তারা কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তার তথ্য পাঠাবেন। এখন পর্যন্ত পেয়েছি নেত্রকোনা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে। সব জেলার তথ্য পেয়ে গেলে তখন একটা সিদ্ধান্ত নিতে পারব যে কীভাবে কী করা যায়।
হাওরের চারদিকে দুর্দশা
কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজারসহ বিভিন্ন জেলার কোথাও জমিতে এখনও পানি, কোথাও আবার কাটা ধান পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। বড় চাপ পড়েছে কৃষকের ঋণ, শ্রম ও ভবিষ্যৎ জীবিকার ওপর। সবচেয়ে নাজুক পরিস্থিতি কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে। ইটনা-অষ্টগ্রাম-করিমগঞ্জ এলাকায় অনেক জমির ধান কাটার আগেই তলিয়ে যায়। কৃষকরা বলছেন, যেটুকু ধান কাটা সম্ভব হয়েছে তাও শুকানোর সুযোগ নেই। রোদ না থাকায় ধানে চারা গজাচ্ছে, ফলে চালের গুণগত মান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আড়তে এসব ধান ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা মণে বিক্রি হলেও আগের মতো ৭০০ থেকে ৮০০ টাকার বাজার নেই। ফলে উৎপাদন খরচও উঠছে না।
করিমগঞ্জের গণেশপুর, গেরাজু ও কুনিয়ার হাওরে গিয়ে দেখা গেছে, শ্রমিক সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। আগের তুলনায় শ্রমিক মজুরি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। কৃষকরা বলছেন, যেখানে আগে ধান কাটায় দৈনিক ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা লাগত, এখন তা ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত লাগছে। তাও শ্রমিক মিলছে না। পানির কারণে ধান কাটা অনেক জায়গায় সম্ভব হয়নি।
অষ্টগ্রামে চোখের সামনে ফসল তলিয়ে যেতে দেখে জমিতেই হৃদরোগে মারা যান কৃষক আক্তার হোসেন। স্থানীয় প্রশাসন বলছে, তিনি ধান কাটার সময় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে জেলায় কয়েক হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাব।
মৌলভীবাজারের হাকালুকি হাওরেও একই চিত্র। টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বিস্তীর্ণ জমির ধান তলিয়ে গেছে। কৃষকরা বলছেন, পানি নামার আগেই অনেক ধান নষ্ট হয়ে গেছে। কোথাও কাটা ধান পানিতে ভিজে পচে যাচ্ছে, কোথাও আবার মাড়াইয়ের সুযোগ না থাকায় ধান স্তূপে পড়ে থেকে অঙ্কুরিত হচ্ছে। শ্রমিক সংকটের কারণে অনেক কৃষক সময়মতো ধান তুলতে পারেননি।
নেত্রকোনা ও মদনের হাওরাঞ্চলেও পরিস্থিতি গুরুতর। হাজার হাজার হেক্টর জমির ধান পানির নিচে চলে গেছে। অনেক কৃষক ঋণ করে চাষ করলেও এখন সেই ঋণ শোধ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। কাটা ধান শুকাতে না পারায় গজিয়ে যাচ্ছে, ফলে বাজারমূল্য প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। কৃষকরা বলছেন, একদিকে উৎপাদন খরচ বেড়েছে, অন্যদিকে বিক্রয়মূল্য কমে যাওয়ায় লোকসান নিশ্চিত। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, বিভিন্ন জেলায় কয়েক হাজার হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং হাজার হাজার কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তবে স্থানীয় কৃষকদের দাবি, বাস্তব ক্ষতির পরিমাণ সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি।
এদিকে হাওরাঞ্চলে বজ্রপাত ও দুর্যোগ পরিস্থিতিও নতুন চাপ তৈরি করেছে। কয়েকটি এলাকায় বজ্রপাতে ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কৃষক পরিবারগুলো আরও উদ্বেগে রয়েছে। আবহাওয়ার এমন অব্যাহত প্রতিকূলতায় ফসল ঘরে তোলা কঠিন হয়ে পড়েছে।
(প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট জেলার প্রতিনিধিরা)
- বিষয় :
- হাওর
