ধান কেনার সরকারি শর্ত কৃষকের জন্য বাধা
জাহিদুর রহমান, ঢাকা ও পঙ্কজ দে, সুনামগঞ্জ
প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬ | ০৮:৪৪ | আপডেট: ০৫ মে ২০২৬ | ০৯:১৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
হাওরাঞ্চলে বোরো ধান ঘরে তোলার মুখে আকস্মিক ভারী বর্ষণ ও উজানের ঢলে তলিয়ে গেছে হাজার হাজার কৃষকের ফসল। যারা কোনোভাবে ধান কাটতে পেরেছেন, তারাও এখন নতুন সংকটে। নেই ভেজা ধান শুকানোর জায়গা, বাজারে ক্রেতার অভাব আর সরকারি গুদামে বিক্রির কঠিন শর্তে কৃষকের হাতে থাকা ধানও হয়ে উঠেছে বোঝা। বিভিন্ন হাওর এলাকায় এখন মণপ্রতি ধানের দাম নেমে এসেছে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায়।
কৃষকরা বলছেন, টানা বৃষ্টি ও মেঘলা আকাশের কারণে ধান শুকানো সম্ভব হচ্ছে না। খলা বা শুকানোর উঁচু স্থান তলিয়ে গেছে। ফলে কাটা ধানেই অঙ্কুর গজাচ্ছে, যা বাজারে বিক্রির অযোগ্য হয়ে পড়ছে। অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে এই ভেজা ধান নামমাত্র দামে বিক্রি করছেন।
এ পরিস্থিতিতে সরকার ধান সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু করলেও কৃষকরা সাড়া দিতে পারছেন না। সরকারি গুদামে ধান বিক্রির জন্য নির্দিষ্ট মান ও আর্দ্রতার শর্ত পূরণ করতে হয়। তবে বৃষ্টির কারণে অধিকাংশ কৃষকের ধানেই আর্দ্রতা বেশি থাকায় তা গ্রহণযোগ্য হচ্ছে না।
প্রান্তিক চাষিরা বলছেন, শুধু মানের শর্তই নয়; প্রক্রিয়াগত জটিলতাও বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধান বিক্রির জন্য ব্যাংক হিসাব খোলা, তালিকায় নাম ওঠানো, গুদামে ধান পৌঁছে দেওয়াসহ নানা প্রক্রিয়া তাদের জন্য বাড়তি ভোগান্তি তৈরি করছে। ফলে অনেকেই সরকারি ক্রয় কার্যক্রম থেকে বাইরে থাকছেন।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, একজন কৃষক সর্বোচ্চ ৭৫ মণ পর্যন্ত ধান বিক্রি করতে পারবেন এবং পুরো অর্থ দেওয়া হবে ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে। তবে মাঠ পর্যায়ের কৃষকরা বলছেন, বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় এই ব্যবস্থাগুলো তাদের জন্য কার্যকর হচ্ছে না।
এ পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে স্থানীয় ফড়িয়া ও দাদন ব্যবসায়ীরা। তারা খলায় গিয়ে কৃষকদের কাছ থেকে ভেজা বা অঙ্কুরিত ধানের অজুহাতে মণপ্রতি ৬০০ থেকে ৮০০ টাকায় ধান কিনে নিচ্ছেন। অনেক কৃষক আগেই দাদন নেওয়ায় বাধ্য হয়ে কম দামে ধান বিক্রি করছেন।
নামমাত্র দামে ধান বিক্রি
দেশের মোট চাল উৎপাদনের প্রায় ৫৫ শতাংশ আসে বোরো ধান থেকে। ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত বোরো মৌসুম। কিন্তু চলতি মৌসুমে বন্যা, টানা বৃষ্টি ও বাজার সংকট মিলিয়ে সেই প্রধান ফসলই এখন কৃষকের জন্য হয়ে উঠেছে লোকসানের বোঝা।
সংকট মোকাবিলায় সরকার হাওরাঞ্চলের ছয় জেলা সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জে ১২ দিন আগে, অর্থাৎ গত রোববার থেকে ধান সংগ্রহ শুরু করেছে। প্রতি কেজি ৩৬ টাকা, অর্থাৎ মণপ্রতি ১ হাজার ৪৪০ টাকা দরে ধান কেনার ঘোষণা রয়েছে। তবে মাঠ পর্যায়ে এর প্রভাব প্রায় নেই বললেই চলে।
কৃষি খাতের তথ্য বলছে, দেশে বোরো উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ২ দশমিক ১ কোটি টন, যা গত অর্থবছরে বেড়ে ২ দশমিক ১৩ কোটি টনে দাঁড়িয়েছে। চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ দশমিক ২৪ কোটি টন। বোরো আবাদি জমিও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০ দশমিক ৫০ লাখ হেক্টরে।
তবে উৎপাদন বাড়লেও কৃষকের আয় বাড়েনি। উল্টো ডিজেল, সেচ, সার-বীজ ও শ্রমিক খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর মধ্যেই সরকার ধান সংগ্রহ মূল্য আগের বছরের মতো রাখায় কৃষকের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। এবার সরকার পাঁচ লাখ টন ধান সংগ্রহ করবে, যা মোট উৎপাদনের তুলনায় সামান্য।
মাঠ পর্যায়ে পরিস্থিতি আরও কঠিন। বৃষ্টির কারণে শুকাতে না পারায় অধিকাংশ ধান ভেজা ও নিম্নমানের হয়ে পড়েছে। ফলে সরকারি গুদামে বিক্রির শর্ত পূরণ করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে বাজারেও নেই চাহিদা। মৌসুমের শুরুতে যেখানে মণপ্রতি ধানের দাম ছিল ৭৫০ থেকে এক হাজার ১০০ টাকা, সেখানে এখন অনেক এলাকায় তা নেমে এসেছে ৪০০ থেকে ৬০০ টাকায়, যা উৎপাদন খরচেরও অনেক নিচে।
নেত্রকোনার কলমাকান্দার কৃষক বিধান সরকার জানান, কয়েক দিন আগেও তিনি ৭৫০ টাকা মণে ধান বিক্রি করেছেন। এখন সেই দাম নেমেছে ৬০০ টাকায়। পর্যাপ্ত রোদ না থাকায় শুকাতে না পারায় দাম আরও কমছে।
সুনামগঞ্জের জলিলপুর গ্রামের কৃষানি রংমালা বিবির কথায় ফুটে ওঠে সংকটের গভীরতা। তিনি বলেন, প্রায় সব ধানই ভেজা, খলাতেই নষ্ট হচ্ছে, অনেক ধানে আবার চারাও গজিয়েছে। সরকারি ক্রয়ের বিষয়ে তেমন ধারণা না থাকায় ৭০০ টাকা মণ দরে খলা থেকেই বিক্রি করে দিতে হচ্ছে ধান।
কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের কৃষকের অনেকেই সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রমের বিষয়ে জানেন না। উপজেলার নিয়ামতপুরের কৃষক দয়াল মিয়া জানান, তিন একরের বেশি জমির বেশির ভাগ ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। যেটুকু আছে, সেটিও ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা মণ দরে বিক্রি করতে হচ্ছে। সরকারের ধান কেনার সুবিধা তাদের কাছে পৌঁছেনি বলেই অভিযোগ তাঁর। একই উপজেলার সাকুয়া গ্রামের কৃষক আক্কাস মিয়া ছয় একর জমিতে ধান আবাদ করেছিলেন। পানির কারণে বেশির ভাগ জমির ধান কাটা যায়নি, আর যে অংশ কাটা হয়েছে, তা বৃষ্টিতে ভিজে অঙ্কুরিত হচ্ছে। তিনি বলেন, সরকার যদি ডিলারের মাধ্যমে ধান কিনত, তাহলে হয়তো তারা বিক্রি করতে পারতেন।
কৃষকরা জানান, বৃষ্টির আগে যে অল্প কিছু শুকনা ধান কাটা হয়েছিল, তা আগেই পাইকারদের কাছে সর্বোচ্চ ৮০০ টাকা মণে বিক্রি হয়ে গেছে। এখন ভেজা ধান ৪০০-৫০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। এসব ধান ট্রাকে করে দেশের বিভিন্ন চালকলে চলে যাচ্ছে।
এদিকে কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জে বন্যায় এখন পর্যন্ত প্রায় ১২ হাজার ৫০০ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অন্তত ৪৯ হাজার কৃষক। হাওরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় ধানের আড়ত হিসেবে পরিচিত সুনামগঞ্জের মধ্যনগরেও এখন ক্রেতা সংকট। আড়ত কল্যাণ সমিতির সভাপতি জহিরুল ইসলাম বলেন, মৌসুমের এই সময়ে প্রতিদিন ২০-২৫ হাজার মণ ধান কেনাবেচা হতো। এখন দিন শেষে ৪-৫শ মণও কেনা যাচ্ছে না। অনেক এলাকায় ধানই নেই, আর যা আছে তা ভেজা ও নিম্নমানের হওয়ায় মিলাররাও কিনতে আগ্রহী নন।
ধান ক্রয়ে শর্তের বেড়াজাল
হাওরাঞ্চলে বোরো ধান নিয়ে সংকটের মধ্যে এবার নতুন করে সামনে এসেছে সরকারি ধান ক্রয় প্রক্রিয়ার জটিলতা। কৃষকরা বলছেন, শর্ত ও প্রক্রিয়ার কারণে গুদামে ধান বিক্রি করা তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। ফলে তারা বাধ্য হচ্ছেন কম দামে মধ্যস্বত্বভোগীর কাছে ধান বিক্রি করতে।
কৃষকরা জানান, সরকারি গুদামে ধান দিতে গেলে নানা ধাপ পেরোতে হয়। আর্দ্রতা মাপা, মান যাচাই, ওজনের ঘাটতি পূরণ, ব্যাংকিং প্রক্রিয়া– সব মিলিয়ে এটি সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। অনেক সময় ধান নিয়ে গুদামে গিয়ে তা ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এতে করে পরিবহন খরচ দ্বিগুণ হয়।
হাওরের একাধিক কৃষক বলেন, সরকার শুধু নির্দিষ্ট মানের শুকনো ধান কিনছে। তবে টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় এবার অধিকাংশ ধানই ভেজা। খলায় রাখা ধানও শুকানো যাচ্ছে না, বরং অনেক ক্ষেত্রে অঙ্কুর গজাচ্ছে। ফলে কৃষকের হাতে বিক্রিযোগ্য শুকনো ধান নেই বললেই চলে।
কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের আবদুল্লাপুর ইউনিয়নের কৃষক ফুল মিয়া বলেন, পানিতে তলিয়ে যাওয়ার পর যেটুকু ধান তোলা গেছে, সেগুলোও ভেজা। সরকার শুকনো ধান ছাড়া কিনবে না। কিন্তু এ অবস্থায় শুকনো ধান কোথায় পাব? তিনি বলেন, গুদামে ধান নিয়ে গেলে আর্দ্রতা বেশি থাকলে ফেরত দেওয়া হয়। আবার শুকিয়ে নিতে হয়। ওজনে কম হলে বাড়তি ধান এনে পূরণ করতে হয়। সব খরচই কৃষকের। ইউনিয়ন পর্যায়ে ধান কেনা হলে কৃষকের ভোগান্তি কমত।
সরকারি নীতিমালায় ধান ও চাল সংগ্রহের জন্য মিলার ও কৃষকের জন্য ১৫ শর্ত রয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১৪ শতাংশ আর্দ্রতা, উজ্জ্বল রঙ ও মান বজায় রাখা বাধ্যতামূলক। তবে চলতি মৌসুমে হাওরের বাস্তবতায় এ মানদণ্ড পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সুনামগঞ্জে অনেক কৃষক বলছেন, জেলার প্রায় ৮০ শতাংশ ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। যেগুলো রয়েছে, সেগুলো বৃষ্টিতে হয়ে গেছে কালচে। এই ধান সরকারি গুদামে নেওয়া হবে কিনা, তা নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা।
সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে সরকারি ধান ক্রয় কার্যক্রম শুরু হলেও সাড়া মিলছে না। উদ্বোধনের দিন একজন কৃষকের কাছ থেকে দুই টন ধান কেনা হলেও গতকাল আর কোনো ধান সংগ্রহ করা হয়নি। খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, পর্যাপ্ত শুকনো ধান না থাকায় কৃষকরা গুদামে ধান আনতে পারছেন না।
জগন্নাথপুর উপজেলা খাদ্য কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এ মৌসুমে ২ হাজার ৪০৯ জন কৃষক আবেদন করলেও লটারির মাধ্যমে ৯৯১ জনকে ধান বিক্রির জন্য মনোনীত করা হয়। প্রত্যেকে সর্বোচ্চ দুই টন ধান বিক্রি করতে পারবেন। কিন্তু নির্বাচিত অনেক কৃষক শর্ত পূরণ করতে না পারায় ধান দিতে পারছেন না।
এদিকে মধ্যস্বত্বভোগী চক্র পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে। তারা হাওর এলাকায় গিয়ে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা মণ দরে ধান কিনে নিচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এই ধানই পরে সরকারি গুদামে ১ হাজার ৪৪০ টাকা মণে বিক্রি করা হবে।
সুনামগঞ্জের নলুয়ার হাওরে প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিল। জলাবদ্ধতায় অর্ধেক জমির ধান তোলা যায়নি। যেসব কৃষক কিছু ধান তুলেছেন, তারাও ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। অনেকেই দাদন শোধ করতে কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, শুধু মাইকিং করে ধান কেনার তথ্য দিলে হবে না। প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে এবং মাঠপর্যায়ে নজরদারি বাড়াতে হবে, যাতে প্রকৃত কৃষকরা সরাসরি ধান বিক্রি করতে পারেন।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম মনে করেন, এই পরিস্থিতিতে সরকার চাইলে ভেজা ধান কিনে অন্য এলাকায় শুকানোর ব্যবস্থা করতে পারে। এতে কৃষকের ক্ষতি কমবে এবং সরকারি সংগ্রহ কার্যক্রমও কার্যকর হবে।
খাদ্য বিভাগ বলছে, কৃষকের সুবিধার কথা বিবেচনায় গুদামেই ধান শুকানোর ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। তবু ১৪ শতাংশ আর্দ্রতার শর্ত বজায় রাখার ওপর জোর দিচ্ছেন কর্মকর্তারা, কারণ এর বাইরে ধান সংরক্ষণ করা কঠিন।
জানতে চাইলে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, ইউনিয়ন পর্যায়ে ধান ক্রয়ের বিষয়ে প্রচার বাড়ানো হবে। সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনতে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। খাদ্য প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী বলেন, কৃষক যাতে ন্যায্যমূল্য পান, সেটিই সরকারের লক্ষ্য। প্রয়োজনে সংগ্রহের পরিমাণও বাড়ানো হবে। কৃষকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সরাসরি টাকা পরিশোধ করা হবে। এখানে কোনো ধরনের মধ্যস্বত্বভোগী থাকবে না। কৃষক সরাসরি কেন্দ্রে এসে ধান দিতে পারবেন।
[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি মোস্তফা কামাল ও জগন্নাথপুর (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি তাজউদ্দিন আহমদ]
