কৃষকের ক্ষতির পেছনে বিএডিসির বীজও
জাহিদুর রহমান
প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬ | ০৯:০১ | আপডেট: ১৫ মে ২০২৬ | ১০:৩০
| প্রিন্ট সংস্করণ
এক ক্ষেতে দুই রকমের ধান। কোনোটি পাকা, কোনোটি কাঁচা। কোনো গাছে শীষই বের হয়নি। ফলে অন্য বছরের তুলনায় ধান কাটতে বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয় কৃষককে। এর মধ্যে অতিবৃষ্টি ও উজানের পানি ঢুকে পড়ে হাওরে। ডুবে যায় ধানক্ষেত। এই দুইয়ে মিলে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে কৃষক।
গত সপ্তাহে এ প্রতিবেদক সরেজমিন কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ ও ইটনা, সমকালের স্থানীয় প্রতিনিধিরা সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা ও মধ্যনগর ঘুরে কৃষি কর্মকর্তা, বীজ পরিবেশক ও কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পান। ধানের বীজ সরবরাহ করেছিল বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)।
এ তথ্যের সূত্র ধরে খোঁজখবর নিয়ে জানা গেল, দেশের বিভিন্ন জেলায় বিএডিসির সরবরাহ করা ব্রি-৮৮ এর বীজের সঙ্গে ব্রি-৯২ জাতের ধানের মিশ্রণ ঘটেছে। আর এটা ঘটেছে চুয়াডাঙ্গায় বিএডিসির বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে।
বিএডিসির মহাব্যবস্থাপকের (বীজ) দপ্তরের গবেষণা সেলের যুগ্ম পরিচালক ড. মো. নাজমুল ইসলাম সমকালকে বলেন, ‘অভিযোগ পাওয়ার পর আমরাও মাঠ পর্যায়ে তদন্ত করেছি। আমরা বীজের মিশ্রণের উৎস খুঁজে পেয়েছি। মূলত চুয়াডাঙ্গা বিএডিসি বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে দুটি বীজের মিশ্রণ হয়েছে। এ ঘটনায় ওই কেন্দ্রের জড়িত সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলি করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেকেই শাস্তির আওতায় আসবেন।’
কৃষি কর্মকর্তারা জানান, ব্রি-৮৮ ধান পাকতে সময় লাগে ১৪০ থেকে ১৪৫ দিন। আর ব্রি-৯২ পাকতে সময় লাগে ১৫০ থেকে ১৫৬ দিন। হাওর অঞ্চলে কৃষক যাতে তুলনামূলক আগে ফসল তুলতে পারেন, সে জন্য ব্রি-৮৮ লাগানো হয়। কারণ সেখানে এক সপ্তাহ-দশ দিনের ব্যবধানে ফসলডুবির মতো বড় বিপর্যয় অতীতে ঘটেছে। এবারও এক সপ্তাহ সময় পেলে কৃষক নিরাপদে ধান ঘরে তুলতে পারত। কিন্তু ক্ষেতে একই সঙ্গে ব্রি-৮৮ ও ব্রি-৯২ জাতের ধান থাকায় কিছু ধান আগে পেকেছে। বাকি ধান পাকার অপেক্ষায় থেকে কৃষক সর্বস্বান্ত। একই প্যাকেটে দুই জাতের বীজ থাকায় এমন ঘটনা ঘটেছে।
বিএডিসির সূত্র জানায়, অন্তত ১০০ টন বা এক লাখ কেজি বীজে এমন মিশ্রণের ঘটনা ঘটেছে। তবে দীর্ঘ অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে মিশ্রণ না ঘটা ধানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পাকা ধান ঝরে পড়েছে, ডুবেছে কাঁচা ধান
হাওরের কৃষকরা জানেন, যে কোনো সময় পাহাড়ি ঢল নেমে আসতে পারে। কিন্তু এবার সব ধান একসঙ্গে না পাকায় তাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে। পাকা ধান কাটলে কাঁচা অংশ নষ্ট হতো। আবার কাঁচা ধান পাকার অপেক্ষা করতে গিয়ে পাকা ধান ঝরে গেছে।
সুনামগঞ্জের ধর্মপাশার মেউহারি গ্রামের কৃষক ননীগোপাল চন্দ্র সরকার বলেন, ‘আমরা ভাবছিলাম, আর দুই-তিন দিন অপেক্ষা করি। তার পর সব একসঙ্গ কাটব। কিন্তু সেই সুযোগ আর পাই নাই। এক রাতে পানি এসে সব তলিয়ে দিল।’
উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ধর্মপাশা ও মধ্যনগরে এবার প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে ব্রি-৮৮ ধানের আবাদ হয়েছিল। এর মধ্যে অন্তত পাঁচ হাজার হেক্টর জমিতে ব্রি ধান-৯২ এর মিশ্রণ পাওয়া গেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি।
কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার মদন গ্রামের কৃষক হাবিবুর রহমান ১৩ কানি জমিতে ব্রি ধান-৮৮ আবাদ করেছিলেন। এখন তাঁর জমির বড় অংশ পানির নিচে। তিনি বলেন, ‘ধান শুরুতে চিনা যায় না। পরে দেখি কয়েক জাতের ধান। কুনুডা পাইক্যা গেছে, কুনুডায় দুধ, কুনুডা কাঁচা। পাকা ধান কাটতে শ্রমিক আনছিলাম। ওরা কইছে, এই ধান কাটতে পারব না। কারণ সব ধান এক রকম না।’
হাবিবুর রহমানের হিসাব অনুযায়ী, তাঁর কমপক্ষে ৪০০ মণ ধান হওয়ার কথা ছিল। এখন ১০০ মণও পাবেন কিনা, সন্দিহান।
হাওরের জন্য ব্রি-৮৮ ধান
ব্রি-৮৮ বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) উদ্ভাবিত একটি উচ্চফলনশীল ও স্বল্পমেয়াদি বোরো ধানের জাত। এটি মূলত ব্রি ধান-২৮ এর আধুনিক বিকল্প হিসেবে পরিচিত। ব্রি-৮৮কে কৃষি বিভাগ ও বিএডিসি স্বল্পমেয়াদি ও উচ্চফলনশীল বোরো জাত হিসেবে প্রচার করেছিল। বলা হয়েছিল, এটি স্বল্প সময়ে পাকে, ফলনও দেয় বেশি। বিশেষ করে হাওরের জন্য এই জাতকে উপযোগী হিসেবে তুলে ধরা হয়। কারণ, হাওরে কৃষকদের সবচেয়ে বড় ভয় আগাম বন্যা। কৃষি বিভাগ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, পাহাড়ি ঢল নামার আগেই কৃষক ব্রি-৮৮ ধানের ফসল ঘরে তুলতে পারবে। এ আশায় কৃষক বেশি দাম দিয়ে বিএডিসির প্যাকেটজাত ভিত্তি বীজ কিনেছিল। কৃষক বলছে, সরকারি বীজ বলে তারা নিশ্চিন্ত ছিল। কেউ ভাবতেও পারেনি, সেই বীজই তাদের জন্য কাল হবে।
কৃষক বলছে, বীজতলা তৈরি ও চারা রোপণের সময় সব স্বাভাবিক ছিল। চারাগুলোও একই রকম মনে হয়েছিল। কিন্তু ধানের শীষ বের হতে শুরু করার পর অস্বাভাবিকতা চোখে পড়ে।
সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার মেউহারি গ্রামের কৃষক মো. মঞ্জুরুল হক বলেন, ‘শুরুতে তো কিছু বুঝি নাই। পরে ধান বাইর হওয়ার পর দেখি একেক গাছ একেক রকম। একটার শীষ বড়, একটার ছোট। একটার ধান আগে পাইক্যা গেছে, আরেকটা তহনো কাঁচা। একই জমিতে যেন তিনটা আলাদা ধান লাগানো হইছে। একই গোছায় তিন রকম ধান।’
মঞ্জুরুল আরও বলেন, তিনি আশা করেছিলেন, অন্তত ১০০ মণ ধান পাবেন। শেষ পর্যন্ত ৪০ মণ ধানও ঘরে তুলতে পারেননি।
ধর্মপাশার ধারাম, সাংনিভাঙা, হাড়গুড়, খাজুইরাসহ বিভিন্ন হাওরের কৃষকরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। ধর্মপাশার টান মেউহারি গ্রামের কৃষক মো. জানু মিয়া জানান, বিশ্বাস করে বেশি টাকা দিয়ে ভিত্তি বীজ কিনেছিলেন। পরে দেখেন, কিছু ধান পেকেছে, কিছু ধান কাঁচা। আর কিছু আধাপাকা। তখনই তাঁর সন্দেহ হয়। পরে জানতে পারেন, যে ধান পাকেনি, সেটা ৯২ জাতের। ব্রি-৯২ পাকতে পাকতে ব্রি-৮৮ গাছ থেকে ঝরতে শুরু করেছে। এর মধ্যে পানি এসে পড়েছে।
ধর্মপাশার তরুণ কৃষক বাপ্পী বলেন, ‘একই বস্তায় তিন-চার রকম বীজ ছিল। এই বীজ কৃষকরে শেষ কইরা দিছে।’
অন্য অঞ্চলেও মিশ্রিত বীজ
রাজশাহীর পবা উপজেলার হরিপুর মাঠে একই চিত্র দেখা গেছে। চাষি মোর্শেদ আলীর চার বিঘা জমিতে তিন রকম ধান হয়েছে। একটি পেকে মাটিতে পড়ে গেছে, আরেকটি সদ্য পেকেছে, আরেকটির শীষ তখনও বের হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘গত বছর একই জমিতে এই ধান করে ভালো ফলন পেয়েছিলাম। আমার দেখাদেখি এবার আশপাশের কৃষকরাও ব্রি-৮৮ চাষ করেছিলেন। আমার সঙ্গে ওদেরও সর্বনাশ হইছে।’ আরেক কৃষক মাসুদ রানা বলেন, ‘৩৩ হাজার টাকা খরচ করছি। এখন কিছুই উঠবে না।’
মেহেরপুরের গাংনী উপজেলায় সরকারি প্রণোদনার আওতায় বিতরণ করা ধান বীজ নিয়ে একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার কৃষক আব্দুল আলীম বলেন, ‘একই জমিতে কিছু ধান পেকে গেছে, কিছু কাঁচা, কিছু শীষ শুকিয়ে গেছে। সব শেষ হয়ে গেল!’
কৃষি বিভাগের প্রদর্শনীর ক্ষেতেও বিপর্যয়
কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের খয়রত গ্রামের কৃষক ওমর সিদ্দিক ১৫ বিঘা জমিতে কৃষি বিভাগের প্রদর্শনী ক্ষেত করেছিলেন। এটি ছিল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ফ্লাড রিকনস্ট্রাকশন ইমার্জেন্সি অ্যাসিস্ট্যান্স প্রজেক্টের আওতায় পরিচালিত সিড ভিলেজ প্রদর্শনী। বীজও দেওয়া হয়েছিল সরকারি ব্যবস্থাপনায়। সেই জমিতে একই সমস্যা দেখা গেছে।
কৃষক ওমর সিদ্দিক বলেন, ‘প্রদর্শনী ক্ষেতের যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে সাধারণ কৃষকের কী হবে? ধান ঘরে তুলতে পারি নাই।’
মাঠ কর্মকর্তারাও হতবাক
কৃষি বিভাগের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারাও বলছেন, তারা এমন পরিস্থিতি আগে খুব কম দেখেছেন। কিশোরগঞ্জের মাঠ পর্যায়ের অন্তত ১৫ জন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শুধু কিশোরগঞ্জেই প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমিতে এ সমস্যা দেখা গেছে।
কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সাদিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা মাঠে গিয়ে দেখেছি, কিছু ধান পেকে গেছে, কিছু আধাপাকা, কিছু কাঁচা। মানে, বীজে বিভিন্ন জাতের মিশ্রণ ছিল। এ কারণে অনেক কৃষক ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়েছেন।’
[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন ধর্মপাশা (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি এনামুল হক]
