ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সরকারি উদ্যোগ সফল হয়নি, বেসরকারিতে জমজমাট

সরকারি উদ্যোগ সফল হয়নি, বেসরকারিতে জমজমাট
×

 জাহিদুর রহমান

প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬ | ০৮:৪১ | আপডেট: ২০ মে ২০২৬ | ০৯:৩১

| প্রিন্ট সংস্করণ

ঈদুল আজহা সামনে রেখে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বড় শহরের ক্রেতার একটি বড় অংশ এখন কোরবানির পশু কিনতে ঝুঁকছে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে। কয়েক বছর আগেও কোরবানির পশু কেনা মানেই ছিল ভিড়, কাদা, যানজট আর দর কষাকষিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটানো। এখন অনলাইনেই কেনা যাচ্ছে পশু। মোবাইল ফোনের স্ক্রিনেই অনলাইনে দেখা যাচ্ছে গরু-ছাগলের ছবি, ভিডিও, ওজন, দাম, খামারের অবস্থান। ক্রেতারা আগাম বুকিং দিচ্ছেন, আর ঈদের আগের দিন কিংবা কোরবানির দিন পশু পৌঁছে যাবে বাসার ঠিকানায়।

তবে এই দ্রুত বিকাশমান ডিজিটাল বাজারে করোনা মহামারির সময় আলোচনায় আসা সরকারি ‘ডিজিটাল হাট’ এখন পুরোপুরি বন্ধ। ঢোকা যায় না সরকারি ওয়েবসাইটে। প্রচারণা কিংবা সমন্বিত অনলাইন বিক্রয় ব্যবস্থাও নেই। অন্যদিকে ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে ওঠা খামার, ফেসবুকভিত্তিক বিক্রয় পেজ, ওয়েবসাইট ও অ্যাপগুলো ক্রেতা-বিক্রেতার কাছে হয়ে উঠেছে নির্ভরতার জায়গা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনলাইন পশু বিক্রির বাজার বাংলাদেশে এখন আর পরীক্ষামূলক পর্যায়ে নেই। এটি ধীরে ধীরে একটি বড় বিকল্প বাজারে পরিণত হচ্ছে। কিন্তু সরকারি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, প্রযুক্তিগত অবহেলা ও ধারাবাহিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে একটি সম্ভাবনাময় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ভেঙে পড়েছে। ফলে পুরো বাজারটি এখন বেসরকারি খাতে চলে গেছে।

যেভাবে বন্ধ সরকারের একটি সফল উদ্যোগ
কোরবানির পশুর বাজার দেশের অন্যতম বড় মৌসুমি অর্থনৈতিক খাত। প্রাণিসম্পদ খাতসংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর এক কোটির বেশি পশু কোরবানি হয়। এই বাজারের আর্থিক আকার ৬০ থেকে ৭০ হাজার কোটি টাকার। যদিও অনলাইনে পশু কেনাবেচার সংখ্যা এখনও মোট বাজারের চেয়ে ছোট। তবে গত পাঁচ বছরে এ খাতের বিস্তার হয়েছে দ্রুত।

বিশেষ করে করোনা মহামারির সময় মানুষের চলাচল সীমিত হয়ে পড়লে অনলাইনে পশু বিক্রি জনপ্রিয়তা পায়। ২০২০ সালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি), তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ, ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের যৌথ উদ্যোগে চালু হয় ‘ডিজিটাল হাট’। সরকারি এই প্ল্যাটফর্মে দেশের বিভিন্ন খামারি নিজেদের পশুর ছবি, ভিডিও ও তথ্য আপলোড করতেন। ক্রেতারা সেখান থেকে পশু পছন্দ করে যোগাযোগ করতেন। সে বছর থেকে ডিজিটাল হাট স্থায়ী করারও উদ্যোগের কথা জানানো হয়। অর্থাৎ সারা বছরই সেখানে পশু বিক্রি হবে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে সরকারি ডিজিটাল হাটে প্রায় ২৭ হাজার পশু বিক্রি হয়েছিল। পরের বছর সেটি বেড়ে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৮৭ হাজারে, যা ছিল এ প্ল্যাটফর্মের সর্বোচ্চ সাফল্য। এরপর ধীরে ধীরে বিক্রি কমতে শুরু করে। ২০২২ সালে বিক্রি হয় ৭০ হাজার ৫৭০টি, ২০২৩ সালে ৫৬ হাজার ৮২১টি আর সর্বশেষ ২০২৪ সালে ডিজিটাল হাটে ৫০ হাজার ৯৩৩টি পশু বিক্রি হয়। তবে ওই বছর সারা দেশের বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে ৫ লাখ ৫ হাজার ৪৯৪টি পশু বিক্রি হয়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাবে কোরবানির বাজারে অনলাইন বিক্রির পরিমাণ ১২ শতাংশের মতো। 
গত বছর থেকেই কার্যত বন্ধ হয়ে যায় সরকারি ডিজিটাল হাট। এবারও কোরবানির বাজার সামনে রেখে সরকারিভাবে অনলাইন হাট চালুর উদ্যোগ দেখা যায়নি। ডিজিটাল হাটের ওয়েবসাইটে ঢোকার চেষ্টা করেও সেটি চালু পাওয়া যায়নি। 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আইসিটি বিভাগের এটুআই প্রকল্পের অধীনে ‘একশপ’ প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ডিজিটাল হাট পরিচালিত হতো। তবে একশপ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ডিজিটাল হাটও অকার্যকর হয়ে পড়ে।

নোয়াখালীর সুবর্ণচরের চরবাটা ইউনিয়নের খামারি জোবায়ের হোসেন বলেন, করোনার সময় সরকারি ডিজিটাল হাটে গরুর তথ্য দিয়েছিলাম। তখন তিনটি গরু বিক্রি হয়েছিল। পরে দেখি সাইটে আর ঢোকাই যায় না। এখন নিজের ফেসবুক পেজ খুলে গরু বিক্রি করছি।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, একসময় অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত ৩৫৯টি অনলাইন পশুর হাট ছিল। এখন সেগুলোর অধিকাংশই অকার্যকর। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পেজেও এখন অনলাইন পশুর হাটবিষয়ক কোনো কার্যকর তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।

অধিদপ্তরের ইনফরমেশন ও আইটি কর্মকর্তা মো. শামীম হোসেন বলেন, অনলাইন পশুর হাট অবশ্যই সম্ভাবনাময় একটি ক্ষেত্র। আমরা প্রতি বছর সক্রিয় প্ল্যাটফর্মের তালিকা প্রকাশ করি। তবে মূল সরকারি সাইটটি এটুআই দেখভাল করত। কেন সেটি বন্ধ হয়েছে, তা তারা ভালো বলতে পারবে।

এ ব্যাপারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, করোনার পর মানুষ সরাসরি হাটে গিয়েই পশু কিনতে পছন্দ করছেন। এ ছাড়া সরকার বিভিন্ন হাটে ক্যাশলেস লেনদেনের সুযোগ তৈরি করায় মানুষ সরাসরি হাটে যাচ্ছেন।

বেসরকারি ও খামারি পর্যায়ে জমজমাট অনলাইন হাট
সরকারি উদ্যোগের বিপরীতে এখন বেসরকারি পর্যায়ের অনলাইন হাট ও খামারগুলোর কার্যক্রম বেশ জমজমাট। বিভিন্ন খামার, ওয়েবসাইট ও সামাজিক মাধ্যমভিত্তিক প্ল্যাটফর্মে আগাম বুকিং, লাইভ ভিডিও, খামার পরিদর্শন, অনলাইন পেমেন্ট, হোম ডেলিভারি থেকে শুরু করে কোরবানির পর মাংস প্রসেসিং পর্যন্ত নানা ধরনের সেবা দেওয়া হচ্ছে।

এ বছর অনলাইনে দেশি গরুর লাইভ ওয়েট প্রতি কেজির দাম ৫২০ থেকে ৬১০ টাকা পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে শাহিওয়াল বা ফ্রিজিয়ান জাতের গরু বিক্রি হচ্ছে ৩৮০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজিতে। গত বছরের চেয়ে এবার প্রতি কেজিতে ৪০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে বলে জানিয়েছেন খামারিরা।

কোরবানির জন্য পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সেবা চালু করা প্রতিষ্ঠানের একটি বেঙ্গল মিট। ২০১৪ সাল থেকে তারা পশু বিক্রি, কোরবানি, মাংস প্রসেসিং ও হোম ডেলিভারি সেবা দিয়ে আসছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এবার তাদের কাছে প্রায় ৫০০ গরু ও ২০০ ছাগল ছিল। এরই মধ্যে প্রায় ৩৫০টি গরু এবং সব ছাগল বিক্রি হয়ে গেছে। 

বেঙ্গল মিটের মার্কেটিং প্রধান শেখ ইমরান আজিজ বলেন, আমাদের বেশির ভাগ গ্রাহক ঢাকাকেন্দ্রিক। তবে চট্টগ্রাম ও সিলেটের ক্রেতাও আছেন। অনলাইনে মানুষের আস্থা আগের তুলনায় বেড়েছে। এখন অনেকে শুধু পশু কেনেন না, কোরবানি থেকে শুরু করে মাংস প্রসেসিং পর্যন্ত পুরো সেবা নিতে চান। তিনি বলেন, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধির তত্ত্বাবধানে শরিয়াহ মেনে কোরবানি সম্পন্ন করে গ্রাহকের কাছে মাংস পৌঁছে দেওয়া হয়। অনেকে ভাগে কোরবানির সুবিধাও নিচ্ছেন।

অনলাইনভিত্তিক বিক্রির বড় একটি অংশ এখন ফেসবুক ও জনপ্রিয় অনলাইন মার্কেটপ্লেস ঘিরে গড়ে উঠেছে। বিক্রয় ডককমেও অনেক খামারি ও ব্যবসায়ী পশু বিক্রি করছেন।

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা রিয়াজ উদ্দিন নামের এক ক্রেতা জানান, গত বছর অনলাইনে বিজ্ঞাপন দেখে সাভারের বিরুলিয়ার একটি খামার থেকে গরু কিনেছিলেন। এবারও গরু কিনতে এসেছেন। হাটে গিয়ে ভিড়ের মধ্যে গরু দেখা কষ্টকর। খামারে গিয়ে বা অনলাইনে দেখে কিনলে ঝামেলা কম।

সাভারের গ্রিন ফার্ম হাউসের মালিক সাইদুল কুদ্দুস বলেন, আমরা এবার ৩০০ গরু তুলেছি। এর মধ্যে ২৮০টি বিক্রি হয়ে গেছে। অনলাইনে সরাসরি অর্ডার করলে আমরা বিনা খরচে গরু পৌঁছে দিই। 
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. শাহজামান খান বলেন, বিশেষ পরিস্থিতিতে ডিজিটাল বা অনলাইন হাটের চাহিদা বাড়লেও এখন সে পরিস্থিতি নেই। সরকারি অনলাইন উদ্যোগ আপাতত বন্ধ থাকলেও বেসরকারি অনলাইন হাট তদারক করা হচ্ছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের জেলা পর্যায়ের ফেসবুক পেজেও খামারিরা পশুর তথ্য দিতে পারছেন। অনলাইনে কেউ যেন প্রতারণার শিকার না হন, সেজন্য নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

তিনি বলেন, অনলাইনে পশু কিনলে ক্রেতাকে হাসিল দিতে হয় না। বুকিং দিয়ে সরাসরি খামার থেকে পশু নেওয়া যায়। আমরা অনলাইনের পাশাপাশি অন্য বাজারও সার্বক্ষণিক তদারক করছি। কাল বৃহস্পতিবার থেকে আমাদের মেডিকেল টিমের কার্যক্রম শুরু হবে। 

 

আরও পড়ুন

×