হাওরে কৃষকের নিরানন্দ ঈদ
পৌঁছেনি অর্থ ও খাদ্য সহায়তা তালিকা নিয়েও অসন্তোষ
জাহিদুর রহমান
প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬ | ০৮:১৫ | আপডেট: ০৪ জুন ২০২৬ | ০৮:৫৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
বোরো ফসলই ছিল একমাত্র আশা! সেই ফসল ঘরে তুলে করবেন ঋণ পরিশোধ, মেটাবেন ছেলেমেয়ের পড়াশোনার ব্যয়সহ পুরো সংসার খরচ, ঈদে কেনার কথা নতুন কাপড়, কোরবানির পশু– এমন স্বপ্ন ছিল হাওরাঞ্চলের লাখো কৃষকের। তবে এপ্রিলের শেষ সপ্তাহের টানা বৃষ্টিতে ভেঙেছে সেই স্বপ্ন। অনেক কৃষক শেষমুহূর্তে ধান কাটার চেষ্টা করেও পারেননি। কেউ কেটে রাখা ধান শুকাতে না পেরে হারিয়েছেন, কেউ পানির নিচে তলিয়ে যেতে দেখেছেন ফসল। শুধু ধান নয়, এবার হাজারো কৃষক পরিবারের জীবন থেকে মিলিয়ে গেছে ঈদের আনন্দ।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৬ এপ্রিল থেকে ৪ মে পর্যন্ত ৯ দিনের টানা বৃষ্টি এবং পাহাড়ি ঢলে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ২ লাখ ৩৬ হাজার ৮১১ জন ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও বর্গাচাষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
তবে কৃষক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও কৃষি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ সরকারি হিসাবের চেয়ে আরও বেশি হতে পারে। কারণ, বহু কৃষক ধান কাটলেও তা ঘরে তুলতে পারেননি, শুকাতে না পারা কিংবা পানিতে পচে যাওয়ায় বাজারজাত করতে পারেননি।
কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের জয়কা ইউনিয়নের রামনগর গ্রামের কৃষক মাহফুজুর রহমান প্রতিবছর ধান বিক্রির টাকায় ঈদের বাজার করেন। এবারও তিনি ভেবেছিলেন, ধান বিক্রি করে মাদ্রাসাপড়ুয়া ছেলের জন্য একটি পাঞ্জাবি ও নিজের জন্য একটি লুঙ্গি কিনবেন। তবে সেই আশা পূরণ হয়নি। তিনি বলেন, ধান ভেজা ছিল। কেউ কিনতে চায়নি। ছেলের জন্য নতুন কাপড় কিনতে পারিনি। কোরবানি দেওয়ার কথাও ভাবতে পারিনি।
ফসলহানির পর ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের জন্য দ্রুত অর্থ ও খাদ্য সহায়তার ঘোষণা দেয় সরকার। কিন্তু ঈদের আগে কোনো কৃষক সহায়তা পাননি। ঈদের পর কিছু কিছু এলাকায় বিতরণ শুরু হলেও বহু কৃষক এখনও অপেক্ষা করছেন।
কিশোরগঞ্জ জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. বদরুদ্দোজা জানান, প্রাথমিকভাবে ৫২ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা মাসে সাড়ে সাত হাজার টাকা, মাঝারি ক্ষতিগ্রস্তরা পাঁচ হাজার টাকা এবং আংশিক ক্ষতিগ্রস্তরা আড়াই হাজার টাকা করে তিন মাস সহায়তা পাবেন। পাশাপাশি প্রত্যেককে প্রতি মাসে ২০ কেজি খাদ্যশস্য দেওয়া হবে।
সুনামগঞ্জে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা করা হয়েছিল ১ লাখ ২৯ হাজার ৫৫৯ জনের। পরে অনুমোদন দেওয়া হয় ৬৪ হাজার ৩৮৪ জনের নাম। তাদের প্রত্যেককে তিন মাস ধরে মাসে ৩ হাজার টাকা ও ১৫ কেজি করে চাল দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
ফসলহানির ক্ষতির সঙ্গে এখন নতুন করে যোগ হয়েছে সহায়তার তালিকা নিয়ে বিতর্ক। সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনার বিভিন্ন এলাকা থেকে অভিযোগ উঠেছে, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষককে বাদ দিয়ে জনপ্রতিনিধির স্বজন, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তির ঘনিষ্ঠজন এবং অকৃষিজীবীর নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সুনামগঞ্জের মধ্যনগরের কৃষক নরকুল ইসলাম বলেন, যারা টাঙ্গুয়ার হাওরে চাষ করেছে, তাদের অনেকের নাম নেই। আবার যাদের জমি নেই, তারাও অনুদান পাইতেছে।
সুনামগঞ্জ হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন, বর্গাচাষিরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অথচ তাদের অনেকের নাম তালিকায় নেই। আবার যারা চাষই করেননি, তারাও তালিকাভুক্ত হয়েছেন।
কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম, ইটনা, মিঠামইন ও করিমগঞ্জ এলাকায়ও তালিকা নিয়ে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। গত মঙ্গলবার অষ্টগ্রামে সহায়তা বিতরণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত কয়েকজন কৃষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তালিকায় স্বজনপ্রীতি হয়েছে। কোনো কোনো ওয়ার্ডে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক বাদ পড়েছেন। আবার একই পরিবারের বাবা-ছেলের নামও তালিকাভুক্ত হয়েছে।
তাদের অভিযোগ, এমন ব্যক্তির নাম তালিকায় এসেছে, যারা দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা বা সিলেটে ব্যবসা করেন কিংবা অন্য পেশায় যুক্ত। অনেকেই কৃষিকাজের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নন। তবু তারা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক হিসেবে সরকারি সহায়তার তালিকায় ঠাঁই পেয়েছেন।
স্থানীয়রা বলছেন, প্রতিটি সেচ প্রকল্পের স্কিমভিত্তিক কৃষকের বিস্তারিত তথ্য আগে থেকেই সংরক্ষিত থাকে। কোন কৃষক কত জমি আবাদ করেন, কে বর্গাচাষি, কে প্রকৃত চাষি– এসব তথ্য ব্যবহার না করেই তড়িঘড়ি করে তালিকা করায় এই জটিলতা তৈরি হয়েছে।
অষ্টগ্রাম সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ ফাইয়াজ হাসান বাবু বলেন, প্রতিটি সেচ প্রকল্পের ব্যবস্থাপকের কাছে প্রকৃত কৃষকের নির্ভুল তালিকা রয়েছে। সেই তালিকা অনুসরণ করলে অভিযোগের সুযোগ থাকত না।
অষ্টগ্রামে সহায়তা বিতরণ অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান বলেন, কৃষক ছাড়া অন্য কেউ যদি জালিয়াতি করে তালিকায় ঢুকে থাকে, তাহলে যিনি তাঁকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন, তাঁর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।
সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার কৃষকদের অভিযোগ, মৃত ব্যক্তি, সরকারি চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী এবং দীর্ঘদিন ঢাকায় বসবাসকারী ব্যক্তির নামও তালিকায় রয়েছে। সুনামগঞ্জের শাল্লায় অভিযোগ উঠেছে, কয়েকজন জনপ্রতিনিধি নিজেদের পরিবারের একাধিক সদস্যকে তালিকাভুক্ত করেছেন। কোথাও একই পরিবারের সাত থেকে আটজন সদস্যের নামও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। অন্যদিকে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের অনেকে তালিকার বাইরে রয়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক সুপারিশ, ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমেও কিছু নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
গত মঙ্গলবার সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার ভীমখালী ইউনিয়নের কৃষকরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগে বলা হয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত অনেক কৃষককে বাদ দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত নন এমন ব্যক্তিদের অনুদানের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর আগে রোববার জামালগঞ্জ উপজেলার মল্লিকপুর বাজারে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন।
সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. মতিউর রহমান খান বলেন, তালিকা নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। অযোগ্য ব্যক্তির নাম পাওয়া গেলে তদন্ত করে বাদ দেওয়া হবে। শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পিয়াস চন্দ্র দাস বলেন, মৃত ব্যক্তি বা অযোগ্য কারও নাম পাওয়া গেলে ফের যাচাই-বাছাই করা হবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সিলেট অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, উপজেলা পর্যায়ে যাচাই-বাছাইয়ের দায়িত্ব ছিল। কোথাও অনিয়ম হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি করতে হবে।
অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (এএলআরডি) নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বর্গাচাষিরা। তাই তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সহায়তা দিতে হবে। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রণয়নে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত না করা গেলে সরকারি সহায়তার উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে।
