চারা, খুঁটি ও গোবর নিয়ে নানা অভিযোগ
জাহিদুর রহমান
প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:৪৭
সরকারের ২৫ লাখ গাছ রোপণ কর্মসূচিতে কোথাও বিতরণ প্রক্রিয়া এবং কোথাও নিম্নমানের চারা, খুঁটি ও গোবর দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অনেক জায়গায় সংশ্লিষ্টরা খুঁটি ও গোবর না নেওয়ায় তা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার অফিসের সামনে পড়ে ছিল। এতে সরকারের বড় অঙ্কের টাকা অপচয় হয়েছে।
কৃষি প্রণোদনা সহায়তা কর্মসূচির আওতায় সারাদেশে ৩০ জুন গাছ রোপণ শেষ হয়। প্রজাতিভেদে প্রতিটি চারার দাম নির্ধারণ করা হয় ৩০ থেকে ১৬০ টাকা। প্রতিটি চারার সঙ্গে একটি বাঁশের খুঁটির জন্য বরাদ্দ ছিল ৫০ টাকা। প্রতিটি চারার জন্য ৩০ কেজি শুকনো গোবর কিনতে কেজিপ্রতি চার টাকা হিসাবে ১২০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কর্মসূচির আওতায় ১৬ লাখ ২৮ হাজার চারা কৃষি প্রণোদনার মাধ্যমে বিতরণ করা হয়। মোট খরচ হয় ৫৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এর বাইরে বাকি চারা কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রকল্প থেকে দেওয়া হয়।
এই গাছ রোপণ নিয়ে মাঠ পর্যায় থেকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নানা অভিযোগ এসেছে। তারা তাৎক্ষণিক কিছু ব্যবস্থা নিয়েছেন। অন্তত পাঁচজন কর্মকর্তাকে বদলি করেছেন। একাধিক তদন্ত কমিটিও করেছেন।
বেষ্টনীর বদলে নিম্নমানের খুঁটি
রাস্তার পাশে বা খোলা জায়গায় গাছের চারা লাগালে সাধারণত বাতাসে পড়ে যায়, গরু-ছাগলে নষ্ট করে। তাই আগের কর্মসূচিগুলোতে সুরক্ষার জন্য চারা রোপণের পর চারপাশে বাঁশের বা অন্য কোনো বেষ্টনী দেওয়া হতো। এবারের কর্মসূচিতে বেষ্টনী না দিয়ে একটি করে বাঁশের খুঁটি দেওয়া হয়, যাতে তার সঙ্গে বেঁধে রাখলে চারা বাতাসে বা অন্য কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
ভোলার একজন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বেড়া না দিলে এসব গাছ বাঁচানো কঠিন। অনেক কৃষক শুধু চারা নিয়েছেন; খুঁটি ও গোবর নেননি। এসব উপকরণ তারা কৃষি অফিসের সামনে ফেলে যান।
বেশ কয়েক জেলায় অনিয়ম
চুয়াডাঙ্গা সদর, আলমডাঙ্গা, দামুড়হুদা ও জীবননগরে ২৫ হাজার চারা বিতরণ করা হয়। উপকারভোগীদের অভিযোগ, সরবরাহ করা অনেক খুঁটি ছিল অপরিপক্ব। চারা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা। আমড়া, জাম ও বেলের প্রতিটি চারার সরকারি দর ৩০ টাকা, জলপাই ৪০ টাকা, খেজুর ৩০ টাকা এবং আম ও তাল ৬০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে সরকারি হর্টিকালচার সেন্টার ও বিএডিসিতে এসব চারার দাম আরও কম।
আলমডাঙ্গা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাসুদ হোসেন পলাশ নিম্নমানের চারা পাওয়ার কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, সরকারি হর্টিকালচার থেকে উপপরিচালকের কার্যালয়ের মাধ্যমে উপজেলা কৃষি অফিসে চারা সরবরাহ করা হয়েছিল। এর মধ্যে প্রায় ৮০০টি নিম্নমানের চারা ফেরত দেওয়া হয়েছে।
জীবননগরে কৃষকদের মধ্যে চারা দেওয়া হলেও বাঁশের খুঁটি দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন উপকারভোগী। দামুড়হুদার কুড়ালগাছি ইউনিয়নের ধান্যঘরা-দুর্গাপুর এলাকার ইউপি সদস্য শাহ মোহাম্মদ ফরহাদ হোসেন বলেন, কৃষকদের নিয়ে উপজেলা কৃষি অফিসে গিয়ে চারা ও খুঁটির মান দেখে তারা সেগুলো নিতে চাননি। পরে তিনি একা চারাগুলো নিয়ে গ্রামের রাস্তার পাশে রোপণ করেন। এরই মধ্যে অনেক চারা মরে গেছে।
চুয়াডাঙ্গায় নিম্নমানের চারা ও বাঁশের খুঁটি সরবরাহের ঘটনায় অভিযোগের আঙুল উঠেছে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মাসুদুর রহমান সরকারের দিকে। গাছ, খুঁটি ও গোবর কেনার সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন।
চুয়াডাঙ্গার জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার বলেন, কর্মসূচির টাকা যথাযথভাবে খরচ হয়েছে কিনা এবং উপকরণের মান ঠিক ছিল কিনা, তা যাচাই করতে কৃষি বিভাগ ও জেলা প্রশাসনের তরফে দুটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। যেসব এলাকায় নিম্নমানের চারা ও বাঁশের খুঁটি ব্যবহার করা হয়েছিল, সেসব এলাকায় নতুন করে চারা ও খুঁটি দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
কুষ্টিয়ার ছয় উপজেলায় ২৭ হাজার ৯৫০টি গাছ রোপণের জন্য কৃষি বিভাগের মাধ্যমে প্রায় ৮২ লাখ আট হাজার ৫০০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।
ক্লিন কুষ্টিয়া ও গ্রিন কুষ্টিয়ার পরিচালক জাকির হোসেন সরকার বলেন, কৃষি বিভাগ থেকে তাদের সংগঠনকে দুই দফায় প্রায় ৬০০ চারা দেওয়া হয়েছে। তবে এসব চারা রোপণের যাবতীয় খরচ সংগঠনের পক্ষ থেকে বহন করা হয়েছে। কৃষি বিভাগ থেকে চারা রোপণের জন্য সার বা সুরক্ষা উপকরণ তারা পাননি।
কর্মসূচির সভাপতি কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক মো. তৌহিদ বিন হাসান বলেন, সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়নের দায়িত্ব কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে দেওয়া হয়েছিল। এতে কোনো ত্রুটি বা বিচ্যুতি থাকলে তা তদন্ত করে দেখা হবে।
নওগাঁর রাণীনগরেও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির চারার মান নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে। উপজেলার ২৪টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৫০ জন করে শিক্ষার্থীর মধ্যে কাঁঠাল, বেল, নিম ও জামগাছের চারা বিতরণ করা হয়। শিক্ষার্থী ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানদের অভিযোগ, কিছু নিম ও জামগাছের চারা এক থেকে দেড় ফুটের বেশি নয়। এসব চারা রোপণ করার পর মারা যাচ্ছে।
রাণীনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোস্তাকিমা খাতুন বলেন, জেলা কৃষি বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী নার্সারি থেকে চারা কেনা হয়েছে। একই নার্সারি থেকে বেশি সংখ্যক কেনার কারণে কিছু চারা ছোট-বড় হয়েছে। এ ছাড়া সিরাজগঞ্জ, সাতক্ষীরা, পাবনা, যশোর, বরগুনাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে একই রকম অভিযোগ পাওয়া গেছে।
গোবর নিয়ে শুরুতেই ছিল জটিলতা
কর্মসূচির শুরু থেকে গোবর নিয়ে সমস্যায় পড়েন কৃষি কর্মকর্তারা। সরকারি আদেশে প্রতি চারার জন্য ৩০ কেজি শুকনো গোবর দেওয়ার কথা বলা হয়। অর্থাৎ একজন কৃষক পাঁচটি চারা পেলে এর জন্য ১৫০ কেজি শুকনো গোবর বরাদ্দ ছিল। শুধু গোবরের জন্যই ওই কৃষকের বিপরীতে বরাদ্দ ছিল ৬০০ টাকা।
বিভিন্ন উপজেলার কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অধিকাংশ এলাকায় নির্ধারিত সময়ে এত বিপুল পরিমাণ গোবর সংগ্রহ করা যায়নি। প্রতি কেজি গোবরের জন্য চার টাকা ধরা হলেও সব খরচ যোগ করলে খরচ অনেক বেড়ে যায়। মাঠের বাস্তবতা বিবেচনায় না নিয়ে দাম নির্ধারণ করায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়। অনেক জেলায় নিম্নমানের গোবর সরবরাহের অভিযোগ ওঠে।
কর্মসূচির শেষ দিন গত ৩০ জুন সরকারি আদেশ সংশোধন করে নতুন নির্দেশনা জারি করে কৃষি মন্ত্রণালয়। এতে প্রতি চারার জন্য ৩০ কেজির বদলে পাঁচ কেজি গোবর দেওয়ার কথা বলা হয়। প্রতি কেজি চার টাকা হিসাবে পাঁচটি চারার জন্য ১০০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। বাকি ৫০০ টাকা জমা দিতে বলা হয় সরকারি কোষাগারে। শেষ দিনে এই পরিবর্তন মাঠ পর্যায়ে নতুন জটিলতা তৈরি করে।
যেসব উপজেলায় আগের নির্দেশনা অনুযায়ী কার্যক্রম শেষ হয়েছিল, সেসব এলাকার কর্মকর্তাদের হিসাব সমন্বয় নিয়ে জটিলতায় পড়তে হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নোয়াখালীর এক উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেন, হঠাৎ নিয়ম সংশোধন করায় অনেক কর্মকর্তাকে নিরীক্ষা আপত্তির মুখে পড়তে হতে পারে।
জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম বলেন, গাছ বিতরণ নিয়ে যেখানে অভিযোগ পাওয়া গেছে, সেখানেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অভিযোগের ভিত্তিতে কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
(প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন চুয়াডাঙ্গা সংবাদদাতা মিরাজুল ইসলাম মিরাজ)
- বিষয় :
- কৃষি