ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মাঠের চিত্র

বাড়তি দাম দিলে ডিলার ও খুচরা দোকানে মিলছে সার

আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে সার মজুত করছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা

বাড়তি দাম দিলে ডিলার ও খুচরা দোকানে মিলছে সার
×

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:১৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

চলতি আমন মৌসুমে বিভিন্ন জেলায় সরকারি দরে রাসায়নিক সার না পাওয়ার অভিযোগ করছেন কৃষকরা। কোথাও সরবরাহ সংকটের অজুহাতে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে নির্ধারিত দরের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি হচ্ছে। আবার কোথাও চাহিদার চেয়ে বরাদ্দ কম থাকায় সার সংকট তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে কয়েক জেলায় অভিযান চালিয়ে জরিমানা ও সার জব্দ করেছে প্রশাসন।

রাজশাহীর কৃষকরা বলছেন, তারা সারের জন্য ডিলারদের গুদামে ঘুরে ঘুরেও সার পাচ্ছেন না। অনেক গুদাম বন্ধ রাখা হয়েছে; যা পাচ্ছেন তা প্রয়োজনের চেয়ে কম। এজন্য ডিলারদের কাছ থেকে সার পেতে পদে পদে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। এজন্য অনেক কৃষকই আমন ধান রোপণের পরও জমিতে সার দিতে পারেননি। তবে খুচরা দোকানে বাড়তি দামে মিলছে সার।

কৃষকরা জানান, ১৩৫০ টাকার ইউরিয়া সার খুচরা দোকানে ২ হাজার ৬০০ টাকা, ১ হাজার টাকার পটাশ সার ১৩০০ টাকা, ১৩৫০ টাকার  টিএসপি সার ৩ হাজার টাকা, ১০৫০ টাকার ডিএপি সার ১৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা বস্তা দরে খুচরা বিক্রি করছে। ফসল রক্ষায় কৃষকরা বাধ্য হয়ে বাড়তি দামে সার কিনছেন। 
পবা উপজেলার দারুসা বাজারে গতকাল সোমবার সকালে দেখা যায়, সারের দোকানে শতাধিক মানুষের ভিড়। এলাকার কৃষক জয়নাল আবেদীন বলেন, ডিএপি আর টিএসপি সার পাওয়া যাচ্ছে না। খুচরা দোকানে বেশি দামে পাওয়া যাচ্ছে। কৃষক আব্দুর রহমান বলেন, বাইরে দ্বিগুণ দাম। তবে ধানের দাম ১২০০ টাকা মণের বেশি পাওয়া যায় না। ব্যবসায়ীরা এই সংকট সৃষ্টি করেছেন। আমরা কৃষকরা পড়েছি বিপদে। 

গাইবান্ধার কৃষকরা বলছেন, ৫০ কেজির এক বস্তা টিএসপি সারের সরকারি দর ১ হাজার ৩৫০ টাকা হলেও তা ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ১ হাজার ৫০ টাকা নির্ধারিত দামের ডিএপি বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকায়। অন্যান্য সারও এলাকাভেদে বাড়তি দামে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।

গাইবান্ধা সদর উপজেলার কুপতলা ইউনিয়নের কৃষক শামীম মিয়া বলেন, ইউনিয়নে ডিলারের সাইনবোর্ড থাকলেও অল্প কিছু সার বিক্রি করা হয়। পরে সদর উপজেলা ও বড় বাজারের খুচরা দোকান থেকে বেশি দামে সার কিনতে হয়। 
এসব দোকান থেকে অনেক সময় বিক্রয় রসিদ দেওয়া হয় না।

নাটোরেও কৃষকদের বাড়তি দামে সার কিনতে হচ্ছে। সদর, নলডাঙ্গা, লালপুর ও বড়াইগ্রামের কৃষকদের দাবি, ইউরিয়া, ডিএপি ও এমওপি কিনতে বস্তাপ্রতি ১৫০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দিতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে একাধিক দোকানে ঘুরেও প্রয়োজনীয় সার মিলছে না।
নাটোর সদর উপজেলার চকফুলবাড়ি এলাকার কৃষক মনোয়ার হোসেন বলেন, টিএসপি প্রতি বস্তা ১ হাজার ৮০০ টাকা, ইউরিয়া ১ হাজার ৫০০, ডিএপি ১ হাজার ৭৫০ এবং এমওপি ১ হাজার ১৫০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। সময়মতো সার না পেলে ফসল নষ্ট হওয়ার শঙ্কায় বেশি দাম দিয়েই কিনতে হচ্ছে। তিনি বলেন, গুদামে সার থাকার পরও ডিলাররা চাহিদা অনুযায়ী দিচ্ছেন না। বাধ্য হয়ে খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে বাড়তি দামে সার কিনতে হচ্ছে।
নাটোরের সিংড়াতেও টিএসপি চাহিদার চেয়ে কম সরবরাহ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। 

এদিকে সাতক্ষীরার শ্যামনগরে চাহিদার চেয়ে বরাদ্দ কম পাওয়ার তথ্য দিয়েছে কৃষি বিভাগ। জুলাই ও আগস্টে উপজেলায় ইউরিয়ার চাহিদা ছিল ১ হাজার ৫৩৫ টন, বরাদ্দ মেলে ৯৬৬ টন। টিএসপির চাহিদা ৩৮০ টন, বরাদ্দ ছিল ২৭৮ টন। ডিএপির চাহিদা ৮৫৫ টন, বরাদ্দ ছিল ৩১৬ টন এবং এমওপির চাহিদা ৪৫৩ টন, বরাদ্দ মেলে ৩৫০ টন।
অর্থাৎ দুই মাসে ইউরিয়ায় ৫৬৯ টন, টিএসপিতে ১০২ টন, ডিএপিতে ৫৩৯ টন এবং এমওপিতে ১০৩ টন ঘাটতি রয়েছে। এ ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে নতুন বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. ওয়ালিউল ইসলাম।

এদিকে কুড়িগ্রামের উলিপুরে আগে সার সংকট থাকলেও বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। তবে সেখানে বিএডিসির ডিলারদের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কৃষকরা। তাদের অভিযোগ, অনেক বিএডিসি ডিলারের নির্দিষ্ট দোকান বা ঠিকানা নেই। ফলে তাদের বরাদ্দের সার বাজারে চলে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে সরকার নির্ধারিত দরের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি ও অতিরিক্ত সার মজুতের দায়ে এক ডিলারকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। গতকাল সদর উপজেলার ঝিলিম ইউনিয়নের হোসেনডাঙ্গা এলাকায় মেসার্স ইসলাম ট্রেডার্সে অভিযান চালিয়ে ২৫৯ বস্তা ইউরিয়া, ১০৬ বস্তা ডিএপি ও ৪৫ বস্তা টিএসপি পাওয়া যায়। বেশি দামে সার বিক্রির প্রমাণ পেয়ে দোকান মালিক মো. নুর ইসলামকে ওই জরিমানা করা হয়।

বগুড়ার নন্দীগ্রামেও সার বিক্রিতে অনিয়মের অভিযোগে চার ব্যবসায়ীকে ৫৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। গতকাল ওমরপুর ও হাটকড়ই বাজারে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে লাইসেন্স ছাড়া সার বিক্রি ও মূল্য তালিকা না রাখার মতো অনিয়ম ধরা পড়ে।
রংপুরের মিঠাপুকুরে রাতের আঁধারে পাচারের সময় ১০৫ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ করে পুলিশ। গতকাল জব্দ করা এসব সার উপজেলা চত্বরে সরকার নির্ধারিত বস্তাপ্রতি ১ হাজার ৩৫০ টাকা দামে কৃষকদের কাছে বিক্রি করা হয়। 
লালমনিরহাটের কালীগঞ্জে চলতি মাসের শুরুতে সরকারি নির্ধারিত দরে পর্যাপ্ত সার সরবরাহের দাবিতে সড়ক আটকিয়ে বিক্ষোভ করেছিলেন কৃষকরা। পরে প্রশাসনের আশ্বাসের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, জেলায় কিছুটা কৃত্রিম সংকট তৈরি হলেও বর্তমানে সরবরাহ স্বাভাবিক হয়েছে। 
(প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার ব্যুরো, জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধিরা)

আরও পড়ুন

×