ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নিরাপদ খাদ্যের স্বপ্নসারথি

নিরাপদ খাদ্যের স্বপ্নসারথি
×

গাজীপুরের শ্রীপুরে ৬৫ বিঘা জমির ওপর গড়ে তোলা অর্গানিক কৃষি খামার (ছবি-সমকাল)

 জাহিদুর রহমান, গাজীপুর থেকে ফিরে

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:৩৫ | আপডেট: ২১ আগস্ট ২০২৬ | ১২:৩০

| প্রিন্ট সংস্করণ

দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠ, খাল-বিল আর ছায়াঘেরা শান্ত প্রকৃতির কোলে ১৯৩৮ সালে জন্ম জোয়ারদার নওশের আলীর। ঝিনাইদহে শৈশবেই তাঁর পরিচয় হয় প্রকৃতির সঙ্গে। দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময়ই মা-বাবাকে হারান তিনি। এরপর পৈতৃক সম্পত্তিও হারাতে হয় স্বজনদের দ্বন্দ্ব ও আইনি জটিলতায়।

নিজের জমিতে অন্যের গরু চরানো সেই শিশুই একসময় হয়ে ওঠেন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। কিন্তু শৈশবে যে মাঠে তিনি রাখাল বালক হিসেবে অন্যের গরু চরিয়েছেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেই মাঠের কাছেই ফিরেছেন ভিন্ন পরিচয়ে। তিনি গড়ে তুলেছেন ‘তিলোত্তমা অর্গানিক কৃষি খামার’। নিজের হারানো শৈশবের ফসলের মাঠকে ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে স্বপ্নের শুরু। বয়স ৮৮ পেরোলেও সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন কৃষিখামারে গিয়ে কাজ তদারক করেন। গাজীপুরের শ্রীপুরে প্রায় ৬৫ বিঘা জমির ওপর গড়ে তোলা তাঁর তিলোত্তমা অর্গানিক কৃষি খামার এখন শুধু একটি কৃষি উদ্যোগ নয়, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের বড় উদাহরণ।

দাদির একটি ছড়া মনে দাগ কাটে
মা-বাবা হারানোর পর আশ্রয় হয় বৈমাত্রেয় দাদি আফিরন নেছার বাড়িতে। সেখানে রাখাল বালক হিসেবে অন্যের গরু চরাতে হয়েছে তাঁকে। তবে গরু চরানোর ফাঁকেই চলত পড়াশোনা। দাদির মুখে শোনা একটি ছড়া তাঁর মনে গভীর দাগ কাটে—‘দুধে পুষ্টি বৃদ্ধি; ঘিয়ে বৃদ্ধি বল; মাংসে মাংস বৃদ্ধি; শাকে বৃদ্ধি মল।’ গবাদিপশু পালন, নিরাপদ সবজি উৎপাদন ও কৃষির সঙ্গে মানুষের খাদ্য ও স্বাস্থ্যের সম্পর্কের বিষয়টি তখন থেকেই তাঁর মনে জায়গা করে নেয়।

১৯৫৬ সালে স্থানীয় বিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন নওশের আলী। ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হিসাববিজ্ঞানে অনার্স করেন। পরে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। দীর্ঘ চাকরিজীবনের পর ১৯৮৯ সালে যুগ্ম সচিবের পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে ব্যবসায় নামেন এবং নিজস্ব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। কিন্তু শৈশবে হারিয়ে যাওয়া সেই ফসলের মাঠের স্মৃতি তাঁকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। নিজের জমিতে অন্যের গরু চরানোর কষ্টও ভুলতে পারেননি। হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার আকাঙ্ক্ষা থেকেই শুরু হয় কৃষির নতুন স্বপ্ন।

১৯৮৪ সালের দিকে গাজীপুরের শ্রীপুরের বাহাদুরপুর গ্রামে একখণ্ড জমি কিনে কৃষির সঙ্গে নতুন করে পথচলা শুরু করেন নওশের। পরে সেখানে জমি বাড়ানোর সুযোগ না হওয়ায় ২০১০ সালে শ্রীপুরের শৈলাট গ্রামে শুরু করেন তিলোত্তমা অর্গানিক কৃষি খামারের কার্যক্রম। বর্তমানে খামারটির আয়তন ৬৫ বিঘার বেশি।

২০১৬ সাল থেকে খামারে প্রকৃতিনির্ভর পদ্ধতিতে বিভিন্ন মৌসুমি ফল ও ফসল উৎপাদন করা হচ্ছে। নিজেদের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্যের চাহিদা পূরণেও ভূমিকা রাখছে খামারটি। ২০২৫ সাল থেকে শ্রীপুর উপজেলা কৃষি অফিসের তত্ত্বাবধানে উত্তম কৃষি চর্চা বা গ্যাপ অনুসরণ করে ফল ও ফসল উৎপাদন, বিপণন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কার্যক্রমও চলছে।

খামারে ১৫ প্রজাতির প্রায় ৩৫০টি আমগাছ, পাঁচ প্রজাতির ২২০টি কাঁঠাল, চার প্রজাতির ১৩০টি লিচু, তিন প্রজাতির ৮০টি পেয়ারা, পাঁচ প্রজাতির ২৫০টি পেঁপে, পাঁচ প্রজাতির ২৫টি জাম্বুরা, পাঁচ প্রজাতির ৩০০টি লেবু, ২৫০টি মালটা ও কমলা, তিন প্রজাতির ১২০টি বরই, তিন প্রজাতির ৫৬টি রামবুটান এবং সাত প্রজাতির ৯৫টি অ্যাভোকাডো গাছ রয়েছে। এ ছাড়া আমলকি, সফেদা, কদবেল, শরিফা, আতা, পার্সিমন, কামরাঙা, ব্রেডফ্রুট, জগডুমুরসহ নানা ধরনের ফলের গাছ রয়েছে। আছে প্রায় দুই হাজার সুপারি গাছও।

সারা বছর নানা ফসল
তিলোত্তমায় সারা বছর বিভিন্ন ধরনের সবজি উৎপাদন করা হয়। খরিফ মৌসুমে লাউ, মিষ্টিকুমড়া, চালকুমড়া, বরবটি, ধুন্দুল, কাঁকরোল, চিচিঙ্গা, পটল, বিভিন্ন জাতের গাছ আলু, কচু, কাঁচা পেঁপে, সজিনা, ডাঁটা, ঢেঁড়স, লালশাক, পুঁইশাকসহ নানা সবজি উৎপাদিত হয়।

রবি মৌসুমে আলু, শিম, গাজর, মুলা, শালগম, লেটুস, ধনিয়াপাতা, পালংশাক, লালশাকসহ বিভিন্ন শীতকালীন সবজি চাষ করা হয়। পাশাপাশি পাটনাই, লাকাডাং, বারি হলুদ, বারি ও বাউ আদা, কালো আদা, পেঁয়াজ, রসুন ও বিভিন্ন জাতের মরিচও চাষ করা হয়।

মাছের চাহিদা পূরণে রয়েছে প্রায় ১৫ বিঘা আয়তনের পাঁচটি পুকুর। সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষের পাশাপাশি আমন ও বোরো মৌসুমে বিভিন্ন জাতের ধান উৎপাদন করা হয়। নিজস্ব সম্পদ থেকে জৈব সার উৎপাদনের জন্য গবাদিপশু পালন করা হয়। প্রায় এক হাজার মুরগিও খামারে উন্মুক্তভাবে পালন করা হচ্ছে।
খামারের ১২ জন স্থায়ী শ্রমিক-কর্মচারীর পাশাপাশি মৌসুমে প্রয়োজন অনুযায়ী শ্রমিক কাজ করেন। শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনমান উন্নয়নেও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

খামারের কৃষিকাজে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করছেন টাঙ্গাইলের মধুপুরের কৃষি উদ্যোক্তা ছানোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, নিরাপদ কৃষি কঠিন কোনো বিষয় নয়। ফসলের যখন যা প্রয়োজন, সঠিক মাত্রায় সেটি দিতে পারলেই নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন সম্ভব। তিলোত্তমা অর্গানিক ফার্ম উত্তম কৃষি চর্চা অনুসরণ করে ফসল উৎপাদন করছে। এতে উৎপাদন খরচও কমছে।

তিলোত্তমা অর্গানিক কৃষি খামার ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত মো. মিজানুর রহমান বলেন, অর্গানিক পদ্ধতিতে চাষের জন্য এখানে বড় একটি কম্পোস্ট হাউস করা হয়েছে। সার তৈরিতে সরিষার খৈল, ছাই, গরুর মল-মূত্র ও তিতা পাতার নির্যাস ব্যবহার করা হয়। খামারটি এমনভাবে গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে, যাতে বিভিন্ন প্রাণ ও উদ্ভিদ একই বাস্তুতন্ত্রের মধ্যে থাকতে পারে। খামারটি আমরা বনজঙ্গলের মতোই করেছি। আমরা চেষ্টা করছি, সব প্রাণ যাতে একসঙ্গে এখানে বসবাস করতে পারে।

তিলোত্তমা অর্গানিক কৃষি খামারে উৎপাদিত পণ্য এখন ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন নিরাপদ খাদ্যের আউটলেটে বিক্রি হচ্ছে। হর্টেক্স ফাউন্ডেশন পরিচালিত কৃষকের বাজার, মোহাম্মদপুরের প্রাকৃতিক কৃষি, অঙ্কুর, হাউস অব হারমোনিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এসব পণ্য পাওয়া যায়। তিলোত্তমা অর্গানিক কৃষি খামারে উৎপাদিত পণ্য নিয়ে চলতি বছরের জানুয়ারিতে রাজধানীর লালমাটিয়ায় ‘সুপণ্য’ নামে প্রথম আউটলেট চালু হয়েছে। অ্যাগ্রোইকোলজিক্যাল পদ্ধতিতে উৎপাদিত নিরাপদ, পুষ্টিকর ও পরিবেশবান্ধব খাদ্য মানুষের কাছে সহজলভ্য করাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য। ভবিষ্যতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আরও আউটলেট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে তিলোত্তমার। লক্ষ্য একটাই—প্রকৃতিনির্ভর কৃষিতে উৎপাদিত নিরাপদ খাদ্য আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবু নোমান ফারুক আহম্মেদ তিলোত্তমা অর্গানিক ফার্ম পরিদর্শন করেছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশকে বাঁচাতে হলে অ্যাগ্রোইকোলজিক্যাল পদ্ধতিতে চাষের বিকল্প নেই। তা না হলে রাসায়নিকনির্ভর কৃষির কারণে আবাদি জমির উর্বরতা ধীরে ধীরে কমে যাবে।

তিনি বলেন, অ্যাগ্রোইকোলজিক্যাল ফার্মিং একটি বিজ্ঞানভিত্তিক কৃষিপদ্ধতি। এতে জমির জীব, জড় ও ভৌত উপাদানের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়াকে কাজে লাগিয়ে ফসল উৎপাদন করা হয়। এতে মাটির স্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য, উদ্ভিদ ও প্রাণীর প্রাকৃতিক সম্পর্ক এবং খাদ্যশৃঙ্খলা অক্ষুণ্ন রাখার সুযোগ থাকে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।

ফল বিশেষজ্ঞ ড. মো. মেহেদী মাসুদও সম্প্রতি খামারটি ঘুরে দেখেছেন। তাঁর মতে, এ ধরনের পদ্ধতিতে উৎপাদিত খাদ্যে পুষ্টি উপাদান ধরে রাখার সুযোগ বেশি। একই সঙ্গে উৎপাদন খরচ ও বর্জ্য কমানো এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব। অনিরাপদ ও অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের কারণে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। এ অবস্থায় তিলোত্তমার মতো উদ্যোগ খাদ্যাভ্যাসে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

‘নিরাপদ খাদ্য এখন আর বিলাসিতা নয়’
তিলোত্তমা অর্গানিক কৃষি খামারের কর্ণধার জোয়ারদার নওশের আলীর বিশ্বাস , জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মানুষের জন্য বড় কিছু করার সুযোগ হয়তো নেই। কিন্তু নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের মাধ্যমে মানুষের উপকারে সামান্য হলেও অবদান রাখা সম্ভব। সেই বিশ্বাস থেকেই তিলোত্তমার পথচলা। তাঁর স্বপ্ন, এই উদ্যোগ একদিন শুধু একটি খামার হয়ে থাকবে না- নিরাপদ খাদ্য ও প্রকৃতিনির্ভর কৃষিকে ঘিরে গড়ে উঠবে একটি বৃহত্তর সামাজিক আন্দোলন।

নওশের আলী বলেন, নিরাপদ খাবারের খোঁজ মানুষের জীবনে এখন আর বিলাসিতা নয়, প্রয়োজন। সেই প্রয়োজন থেকেই প্রথমে নিজের পরিবারের জন্য তিলোত্তমা অর্গানিক কৃষি খামার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এখন এটিকে তিনি একটি আন্দোলন হিসেবে দেখছেন।

তিনি বলেন, রাসায়নিক সার ও কীটনাশকনির্ভর কৃষির পরিবর্তে প্রকৃতিনির্ভর ও বিজ্ঞানভিত্তিক অ্যাগ্রোইকোলজিক্যাল কৃষিই ভবিষ্যতের পথ হতে পারে। তাঁর লক্ষ্য– নিরাপদ, পুষ্টিকর ও পরিবেশবান্ধব খাদ্য মানুষের হাতের নাগালে পৌঁছে দেওয়া।
 

আরও পড়ুন

×