পুষ্প
শোভাময়ী জল কলাবতী
রমনা উদ্যানে সম্প্রতি দেখা জল কলাবতী ফুল লেখক
মৃত্যুঞ্জয় রায়
প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৫৩ | আপডেট: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৫৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
তানভীরের একটা জলবাগান ছিল। সেখানে ছিল ৫০ থেকে ৬০ রকমের জলজ শোভাময়ী ফুলের গাছ। মানিকগঞ্জের হরিরামপুরের সুলতানপুর গ্রামের সেই বাগানটিতে দুই বছরেরও বেশি আগে একবার গিয়েছিলাম। সেখানেই প্রথম একটা ছোট্ট ডোবার মতো জলাধারে গ্রীষ্মের একদিনে দেখেছিলাম জল কলাবতী গাছ। ঝোপ করা গাছে ফুল ছিল অল্প। ফলই ছিল বেশি। কিছু কিছু ফলের বীজ পেকে শুকিয়ে ত্রিভঙ্গ সুতোর মতো মঞ্জরিতে ঝুলছিল।
এ বছর ৬ সেপ্টেম্বর ফেসবুকে একটা পোস্ট দেখে আবার সে গাছটির কথা মনে পড়ল। পোস্ট থেকেই জানা গেল তার নামটা। উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Thalia geniculata, ইংরেজি নাম Bent alligator-flag, Arrowroot, Water canna বা Fire-flag এবং গোত্র ম্যারান্টেসি। ম্যারান্টেসি গোত্রের উদ্ভিদকুলের মধ্যে এর বিস্তৃতি সবচেয়ে বেশি। এ গাছের আদিনিবাস আমেরিকায়। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল, মেক্সিকো, মধ্য আমেরিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চল ও দক্ষিণ আমেরিকায় এ গাছ প্রাকৃতিকভাবে জন্মে।
কলাবতী গাছের মতো পাতা, অথচ স্যাঁতসেঁতে স্থানে জন্মে, তাই এর এক নাম ওয়াটার ক্যানা। ইংরেজি নামের সঙ্গে মিল রেখে এর বাংলা নাম হতে পারে জল কলাবতী। এটি একটি বহুবর্ষজীবী চিরসবুজ জলজ গুল্ম প্রকৃতির উদ্ভিদ। উচ্চতা তিন মিটার পর্যন্ত হয়, এ দেশে দুই মিটারের মতো লম্বা হয়। পাতার কিনারা মসৃণ ও অখণ্ডিত, ২০-৭৫ সেন্টিমিটার লম্বা ও ৫-৩০ সেন্টিমিটার চওড়া। পাতাগুলো নিশানের মতো ও ঊর্ধ্বমুখী। তাই নামের শেষে ফ্ল্যাগ শব্দটি যুক্ত হয়েছে। পাতা চুনা-সবুজ, অগ্রভাগ তীক্ষ্ণ, আয়ত-ডিম্বাকার, মসৃণ, কলাপাতার মতো, পাতার ডাঁটি শক্ত ও লাল। পাতাগুলোর মাঝ থেকে সরু কঞ্চির মতো অশাখ দণ্ডের মাথায় ফুল ফোটে। ফুলের রং বেগুনি-সাদা। হাঁটুভাঙা ভঙ্গিতে আঁকাবাঁকা পুষ্পমঞ্জরিতে কয়েক দিন ধরে একটার পর একটা ফুল ফুটতে থাকে।
বৃতি রোমশ, পুষ্পদণ্ড বা র্যাকিস আঁকাবাঁকা। ফুল তিনটি ছোট ও অনিয়মিত আকারের পাপড়ি নিয়ে গঠিত, যা সাধারণত বেগুনি, গোলাপি বা সাদাটে রঙের হয়। কাণ্ড লালচে। আলংকারিক উদ্ভিদ হিসেবে জলভরা টবে বা পাত্রে, সুইমিং পুলের পাশে, পুকুর বা জলাশয়ের ধারে এ গাছ লাগানো হয়। একবার জন্মালে সে জায়গা থেকে উচ্ছেদ করা কঠিন হয়ে পড়ে। গাছের বৃদ্ধি মধ্যম থেকে দ্রুত। মাটির নিচে রাইজোম বা গুড়িকন্দ হয়, যা থেকে চারা হয়। বীজ থেকেও এর চারা তৈরি করা যায়। ফুল উভলিঙ্গী। বছরের যে কোনো সময় ফোটে, এমনকি দিনেরও যে কোনো সময় ফুটতে পারে।
কয়েক প্রজাতির হ্যাক মথের কীড়া এর পাতা খায়। প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো গাছের পাতা সংগ্রহ করে আফ্রিকায় ও দক্ষিণ আমেরিকায় ঘরে চাল ছাওয়া হয় ও বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী মোড়ানোর কাজে ব্যবহার করা হয়। এর পাতা দিয়ে মোড়ানো খাবারকে একটি বিশেষ সুবাস দেয়। সিয়েরা লিওনে খতনার ক্ষতে ব্যান্ডেজ হিসেবে এর পাতা ব্যবহার করা হয়। এর কাণ্ড চিরে পাটিপাতার মতো পাটি বা মাদুর বোনা যায়।
সাম্প্রতিক সময়ে আসা এ উদ্ভিদটি এ দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিশেষ করে ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বোটানিক্যাল গার্ডেনের ডেটাবেসে নবাগত এ উদ্ভিদের নাম আছে। তথ্য অনুযায়ী তালিয়া গণের দুটি স্বতন্ত্র প্রজাতি (থালিয়া জেনিকুলটা ও থালিয়া ডিলবাটা) নথিভুক্ত করা হয়েছে। উভয় প্রজাতিই ভূদৃশ্য তৈরি ও নোংরা পানি শোধনের জন্য ব্যবহৃত হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ