ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ঋণের উচ্চ সুদহার ব্যবসার জন্য বাধা: বাণিজ্য উপদেষ্টা 

ঋণের উচ্চ সুদহার ব্যবসার জন্য বাধা: বাণিজ্য উপদেষ্টা 
×

রাজধানীর গুলশানে এমসিসিআই কার্যালয়ে ‘বাংলাদেশ বিজনেস ক্লাইমেট ইনডেক্স (বিবিএক্স) ২০২৪-২৫’ প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ছবি: সমকাল

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৫ | ০৫:০৯ | আপডেট: ১৭ অক্টোবর ২০২৫ | ০৫:১০

ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার ব্যবসার জন্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে বলে মন্তব্য করেছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন। তিনি বলেন, আগামী বছর নাগাদ সুদহার কমে আসতে পারে।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর গুলশানে এমসিসিআই কার্যালয়ে ‘বাংলাদেশ বিজনেস ক্লাইমেট ইনডেক্স (বিবিএক্স) ২০২৪-২৫’ প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে বাণিজ্য উপদেষ্টা এসব কথা বলেন। 

ব্যবসায়ীদের শীর্ষস্থানীয় সংগঠন মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) ও বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের (পিইবি) যৌথ গবেষণায় এই ইনডেক্স তৈরি করা হয়েছে। ২০২১ সাল থেকে প্রতিবছর দেশের ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে এমসিসিআই ও পিইবি। অস্ট্রেলিয়া সরকারের ডিপার্টমেন্ট অব ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড ট্রেডের সহায়তায় এবছর টানা চতুর্থবারের মতো এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন বলেন, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার ব্যবসার জন্য বড় বাধা। উচ্চ সুদ হার পীড়াদায়ক। তবে এই পীড়া প্রয়োজনীয়। আশা করি, আগামী বছর নাগাদ সুদহার কমে আসবে। 

তিনি বলেন, গত সরকারের সময়ে তৈরি করা অপশাসন ভুলে যাওয়ার মতো নয়। বাংলাদেশ ব্যাংককে ধন্যবাদ সঠিক সময়ে কঠোর মুদ্রানীতি প্রণয়নের জন্য। এই মুদ্রানীতি পীড়াদায়ক হলেও এটির প্রয়োজন ছিল।

ব্যবসার পরিবেশ উন্নত না হওয়ার ব্যাপারে শেখ বশির বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যয় শুধু সরকারের কারণেই বাড়ে না, ব্যবসায়ীদের দক্ষতার অভাবেও বাড়ে। কারণ শুধু নিরীক্ষা সমস্যা নয়, নিরীক্ষার পদ্ধতি সমস্যা। এ বিষয়ে কাজ করতে হবে।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী অভিযোগ করে বলেছেন, এই সরকারের আমলে কেউ শিল্পে গ্যাস পায়নি। এ প্রসঙ্গে বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, এ সরকারের আমলে কেউ গ্যাস পায়নি। তার মানে কারও প্রতি অবিচার করা হয়নি। কারণ, গত সরকারের আমলে তো কেউ পেয়েছিল, কেউ পায়নি। কিন্তু ব্যবসায়ীরা আগের সরকারের সময় এ বিষয়ে কোনো কথা বলেননি। 

শেখ বশিরউদ্দিন বলেন, পৃথিবীর সব জায়গায় দুর্নীতি আছে। দুর্নীতি একেবারে বন্ধ করে ফেলা সম্ভব নয়। তবে দুর্নীতির পথকে কঠিন করে তোলা যেতে পারে। এ সময় তার তিনটি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কোনো প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির কোনো তথ্য পেলে তাকে জানালে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেবেন বলে জানান তিনি।

এর আগে বিসিআইর সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী বলেন, এখন ব্যবসায়ীদের রক্তক্ষরণ হচ্ছে। কিন্তু কেউ জানে না কেন হচ্ছে। ব্যবসা শুরু করতে গেলে জমি পাওয়া মুশকিল। জমির প্রাপ্যতা সহজ করা দরকার। অর্থায়নের ক্ষেত্রে জটিলতা রয়েছে। শিল্পে কেউই গ্যাস পাচ্ছে না। উৎসে কর দিতে দিতে ব্যবসায়ীরা দিশেহারা। এসব বিষয়ে নজর দিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, বেনাপোল-চট্টগ্রাম বন্দরের সমস্যা বাড়ছেই। অন্যদিকে চট্টগ্রাম বন্দরে মাশুল বেড়েছে। ঋণের সুদ ৯ থেকে ১৬ শতাংশে পৌঁছেছে। সুদহার কখন কমবে তার নিশ্চয়তা নেই। মূল্যস্ফীতিও বাড়ছে। এসব কারণে ব্যবসার খরচ বেড়ে যাচ্ছে। 

আনোয়ার-উল আলম বলেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া ব্যবসায়িক পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। ব্যবসায়ীদের মতামত না নিয়ে নীতি তৈরি করলে ব্যবসায়িক পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়।

আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসনের আহ্বান জানিয়ে ফরেন চেম্বারের সাবেক সভাপতি রূপালী চৌধুরী বলেন, ব্যবসা করতে যেসব সমস্যা মোকাবিলা করতে হয়, সেগুলোর সমাধান বের করতে হবে। কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে এইচএস কোডের সমস্যা এখনও সমাধান হয়নি। কাস্টমসের হয়রানি এখন বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবক্ষেত্রেই অটোমেশন জরুরি হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলে উদ্যোক্তাদের ইউটিলিটি চার্জ দিতে হচ্ছে। এটা খুবই অযৌক্তিক।

অনুষ্ঠানে বিবিএক্সের প্রতিবেদন তুলে ধরেন পিইবির চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ড. এম মাসরুর রিয়াজ। তিনি বলেন, দেশের ব্যবসায়িক পরিবেশে গত এক বছরে তেমন কোনো বড় উন্নতি হয়নি। বরং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, আর্থিক খাতের দুর্বলতা ও প্রশাসনিক জটিলতা অর্থনীতিকে চাপে ফেলেছে। দেশে ব্যবসা করতে গেলে বন্দরসহ প্রায় সব স্তরে হয়রানির শিকার হতে হয়। কিছু ক্ষেত্রে বিনিয়োগ হলেও সার্বিকভাবে দেশে গুণগত অর্থায়ন হচ্ছে না। বেসরকারি খাত সংস্কারে সরকারের মনোযোগ দেওয়া জরুরি। 

বিবিএক্সের সূচকে বলা হয়, ব্যবসায়িক অবকাঠামো, বিরোধ নিষ্পত্তি, প্রযুক্তি অভিযোজন ও শ্রম নীতিমালাসহ মোট ১১টি স্তম্ভের ওপর জরিপ চালিয়ে দেশে ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিস্থিতির এ স্কোর তৈরি করা হয়। মোট চার শ্রেণিতে বিভক্ত এ মান অনুযায়ী সার্বিক স্কোর ৪০ এর নিচে থাকলে ব্যবসার জন্য ‘কঠিন পরিবেশ’, ৪১ থেকে ৬০ এর মধ্যে থাকলে ‘গুরুতর প্রতিবন্ধকতা’, ৬১ থেকে ৮০ এর মধ্যে থাকলে ‘পরিস্থিতি উন্নয়নমূলক’ ও ৮১ থেকে ১০০ এর মধ্যে থাকলে ‘ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ’ বুঝানো হয়।

বিবিএক্সের সূচক অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দেশের বিবিএক্স স্কোর দাঁড়িয়েছে ৫৯ দশমিক ৬৯। গতবছর এ স্কোর ছিল ৫৮ দশমিক ৭৫। এক বছরে এ স্কোর শূন্য দশমিক ৯৪ পয়েন্ট বাড়লেও দেশের ব্যবসা পরিস্থিতির অবস্থা এখনো ‘গুরুতর প্রতিবন্ধকতা’ শ্রেণিতে রয়েছে। মূলত রাজনৈতিক অস্থিরতা, ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতির চাপ, উচ্চ সুদ হার ও বিনিয়োগের অনিশ্চয়তার কারণই বাংলাদেশের ব্যবসা পরিবেশের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

এতে বলা হয়, বাংলাদেশ ২০২২ সাল থেকে ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রা সংকট ও ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে এসব খাতে কিছুটা স্থিতিশীলতা এলেও দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি, রাজস্ব আয় ও বিনিয়োগে উন্নতি হয়নি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। ব্যাংক খাতের অস্বচ্ছতা, উচ্চ সুদ হার, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও শক্তি সংকট মিলিয়ে ব্যবসায় আস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে।

এমসিসিআইয়ের সভাপতি কামরান টি. রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় আরও বক্তব্য দেন অস্ট্রেলিয়া হাইকমিশনের ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কমিশনার বেন কারসন এবং জাপান এক্সটারনাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ কাজুইকি কাতাওকা প্রমুখ।

আরও পড়ুন

×