পুষ্প
এলাচ নয়, কুলঞ্জন
ঢাকার পরীবাগে সম্প্রতি ফুটেছে কুলঞ্জনের ফুল লেখক
মৃত্যুঞ্জয় রায়
প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:২৮ | আপডেট: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:৩৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
গত বছর শরতের এক সকালে খুলনার একটি গ্রামে ঔষধি গাছের বাগানে হাঁটছিলাম। বাগানমালিক দেশের নানা জায়গা থেকে শতাধিক প্রজাতির ঔষধি গাছ সংগ্রহ করে লাগিয়েছেন। তাঁর কোনো সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নেই। বিক্রি করে টাকা আসে, তা-ও না। তবু গাছ আনছেন আর লাগাচ্ছেন। একটা গাছ দেখিয়ে বেশ বুক ফুলিয়ে বললেন, এলাচ গাছ বাগানে ছিল না, বছর দুই আগে এনে লাগিয়েছি। এখন সে গাছে ফুল ফুটছে। জিজ্ঞেস করলাম, এলাচ কি ধরেছে? মাথা নাড়লেন। বললেন, ‘না, ফুল ফোটে, কিন্তু এলাচ তো দেখি না। কী করলে সে গাছে এলাচ ধরবে?’
গাছটি দেখে এলাচ গাছ বলে মনে হলো না। এক টুকরো পাতা ছিঁড়ে ঘ্রাণ শুঁকে দেখলাম, পাতা মৃদু এলাচগন্ধি। বললেন, ফুলেও এলাচের ঘ্রাণ পেয়েছেন তিনি। তাহলে তো সেটি এলাচ গাছ না হওয়ার কারণ নেই! বছর সাতেক আগেও আমি এলাচ গাছের সন্ধানে বগুড়ায় মসলা গবেষণা কেন্দ্রের গবেষণা মাঠে গিয়ে এলাচ গাছের খোঁজ করেছিলাম। দুটি প্রজাতির এলাচ গাছ সেখানে লাগানো ছিল। একটি প্রজাতির গাছে এলাচ ধরেছিল; ছড়ায় গাছের গোড়ায় মাটির ওপরে। সেখানকার গবেষকরা জানিয়েছিলেন, ওটা বুনো এলাচ বা কালো এলাচ। আসল যে তীব্র ঘ্রাণের বড় বা সবুজ এলাচ, তা উৎপাদন করা যায়নি।
এলাচ গাছ বলে যে গাছ অনেকে লাগান, সেটি নার্সারির লোকদের বলা। সেজন্যই মনে হয় ভুলটা হয়ে যায়। গাছটি দেখে তখন আমার মনে হয়েছিল, সেটি আদৌ এলাচ; না কুলঞ্জন?
এলাচের সঙ্গে কুলঞ্জনের মূল পার্থক্য হলো, তার পাতা ও পুষ্পবিন্যাসে। গাছও কিছুটা তফাত আছে। এলাচের গাছ কুলঞ্জনের চেয়ে লম্বা, বাঁচে কয়েক বছর, পাতাও কুলঞ্জনের চেয়ে বড় ও চওড়া। অন্যদিকে কুলঞ্জন গাছ দেখতে অনেকটা নলখাগড়া গাছের মতো, পাতা তুলনামূলক চিকন ও লম্বা, ঝোপালো, পাতা ডললে এলাচের স্বল্প ঘ্রাণ পাওয়া যায়। কিন্তু মূল এলাচ গাছের পাতায় এলাচের ঘ্রাণ পাওয়া যায় না।
এলাচের পুষ্পবিন্যাস পার্শ্বীয়, ছড়া বা প্যানিকল পুষ্পবিন্যাস উৎপন্ন করে, যা লতানোভাবে বা মাটির গোড়ার কাছ থেকে সরাসরি প্রধান পাতাযুক্ত কাণ্ড থেকে পৃথকভাবে জন্মায়। অন্যদিকে কুলঞ্জনের পুষ্পমঞ্জরি বের হয় আগায় একটি লম্বা ডাটিতে। কুলঞ্জনের পাতাযুক্ত কাণ্ডের শেষ প্রান্তে ফুলের গুচ্ছ থাকে, ফুলগুলো অদ্ভুত আকৃতির। পাপড়িগুলো দেখে মনে হয় কোনো শিল্পী বোধহয় সাদা ক্যানভাসে সূক্ষ্মভাবে কিছু লাল বা বেগুনি আঁচড় বা রেখা টেনে রেখেছে।
এ বছর শ্রাবণে ঢাকার পরীবাগে একটি বাড়ির সামনে দেখা হলো একঝোপ কুলঞ্জন গাছের সঙ্গে। এবার আর শুধু গাছ-পাতা না, একটি পুষ্পমঞ্জরিতে কয়েকটা ফোটা ফুলও পেলাম। ফুলের গন্ধ শুঁকে মৃদু এলাচের ঘ্রাণ পেলাম। পাতা আর ফুলের এ গন্ধই হয়তো এ দেশের উদ্ভিদপ্রেমিকদের বিভ্রান্ত করেছে!
দুটি গাছই জিঞ্জিবারেসী গোত্রের, এলাচের উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Elettaria cardamomum, আর Alpinia calcarata হলো কুলঞ্জনের উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম। আদা, হলুদ, শঠিও এ গোত্রের গাছ। এলাচ দামি মসলার গাছ। অন্যদিকে কুলঞ্জন দামি ঔষধি গাছ। এ দেশে সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রামে বন্যভাবে অনেক স্থানে জন্মে। কুলঞ্জনকে বাংলায় সুগন্ধমূল, বুনো এলাচ, কুলঞ্জ ও মধুনিক্কন নামেও ডাকা হয়। ইংরেজি নাম স্ন্যাপ জিঞ্জার। কুলঞ্জন গাছের কন্দ বা মোথা মূলত আয়ুর্বেদ ও ভেষজ চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়।
ভারত, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশে এ গাছের চাষ করা হয়, সে অর্থে এটি সেসব দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৃষি সম্পদ। এ দেশেও এ গাছটির ঔষধি গুণাগুণ, ব্যবহার ও চাষ পদ্ধতি নিয়ে বিস্তর গবেষণা করা যেতে পারে। একদিন এটি আদার মতো হয়তো গুরুত্বপূর্ণ ভেষজ ফসল হয়ে উঠতে পারে।
লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ