ঢাকা বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬

জামায়াতের নারী নেতৃত্বের দাবি শুভঙ্করের ফাঁকি: টিআইবি

জামায়াতের নারী নেতৃত্বের দাবি শুভঙ্করের ফাঁকি: টিআইবি
×
×

ফাইল ফটো

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬ | ১৮:৪১ | আপডেট: ০৩ নভেম্বর ২০২৬ | ১৯:৩৮

জামায়াত ইসলামের সাংগঠনিক কাঠামোতে বিদ্যমান নারী নেতৃত্বের শর্ত পূরণের দাবিকে ধোঁকাবাজি বলে আখ্যায়িত করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন–শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন নিয়ে দলটির সেক্রেটারি জেনারেলের বিবৃতিকে ‘ভুল ও সত্য লুকানোর চেষ্টা’ বলেও মনে করে সংস্থাটি। 

মঙ্গলবার গণমাধ্যমে পাঠানো টিআইবির এক বিবৃতিতে এসব কথা বলা হয়। 

বিবৃতিতে বলা হয়, আরপিও’র (গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২) নিয়ম শুধু দেখানোর জন্য মেনে নারীদের আলাদা কমিটি গঠন করে দলের সব স্তরে নারীর অংশগ্রহণ আছে বলে দাবি করা ধোঁকাবাজি বা ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’। বাস্তবতাকে অস্বীকার করে দলটির পক্ষ থেকে এই গবেষণার তথ্যকে ‘মিথ্যা’ বলে বিবৃতি দেওয়ায় অবাক হয়েছে টিআইবি। 

সংস্থাটির গবেষণায় বলা হয়েছে, আরপিও’র সংশ্লিষ্ট ধারা অনুযায়ী প্রতিটি দলের সব স্তরের কমিটিতে কমপক্ষে ৩৩ শতাংশ পদ নারী সদস্যদের জন্য রাখার লক্ষ্য ঠিক করতে হবে। পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে এ লক্ষ্য ধাপে ধাপে পূরণ করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে রাজনৈতিক দলগুলোর মূল বা কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারী সদস্যদের অবস্থান খতিয়ে দেখলে এই নিয়ম মানার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা যায়।

বিবৃতিতে বলা হয়, এখানে কেন্দ্রীয় কমিটি বলতে দলের মূল বা জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটি, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ বা কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদকে বোঝানো হয়েছে। জামায়াতের ওয়েবসাইটে দেওয়া ১৯ জনের মূল কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদে কোনো নারী সদস্য নেই। এটা আরপিও’র নিয়মের স্পষ্ট লঙ্ঘন। কারণ আইনে বলা আছে, দলের প্রতিটি কমিটিতে নারী সদস্য থাকতে হবে। জামায়াতের বিবৃতিতে দলের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদে ২১ জন, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরায় ১২২ জন এবং দলটির রুকন বা স্থায়ী সদস্যদের মধ্যে প্রায় ৪৩ শতাংশ নারী সদস্য থাকার দাবি করা হয়েছে। আরপিও’তে একটি দলে মোট কতজন নারী সদস্য থাকবেন, তা নিয়ে কোনো জোর দেওয়া হয়নি, বরং মূল কমিটিগুলোতে কতজন নারী সদস্য নেওয়া হবে, সেই বিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছে। তাই জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেলের এই ধরনের অপ্রাসঙ্গিক উদাহরণ দেওয়া সত্য আড়ালের চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়। দেশের অন্য সব রাজনৈতিক দলের সব স্তরে একটি করেই কমিটি থাকে এবং সেখানে কম-বেশি নারীদের দেখা যায়। কিন্তু জামায়াতে ইসলামীর নিয়মে শুধু নারীদের মধ্যে দলীয় কাজ চালানোর জন্য প্রতিটি স্তরে নারীদের আলাদা কমিটি করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিটি স্তরে পুরুষদের জন্য একটি কমিটি এবং নারী কর্মীদের জন্য আলাদা আরেকটি কমিটি আছে এবং একইভাবে নারী কর্মীদের আলাদা মজলিসে শূরা বা কর্মপরিষদ রাখা হয়েছে। তবে নারীদের জন্য আলাদা কোনো কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ রাখা হয়নি এবং দলের মূল কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদে কোনো নারী কর্মী নেওয়া হয়নি। জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ পদগুলোতে যেমন—আমীরে জামায়াত, নায়েবে আমীর, সেক্রেটারি জেনারেল, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ইত্যাদি পদে নারী কর্মীদের না রাখার একটি নিয়ম বা চর্চা দেখা যায়। শুধু নারীদের নিজেদের মধ্যে কাজ করার জন্য আলাদা কমিটি বানিয়ে দিলেই দলে নারীদের আসল অংশগ্রহণ বোঝায় না, বরং এর মাধ্যমে নারীদের একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আটকে দেওয়া হয়েছে এবং নারীদের এই আলাদা কমিটিগুলোকে দলে নারীর অংশগ্রহণ হিসেবে দাবি করা এক ধরনের ফাঁকিবাজি। 

অন্যদিকে এই গবেষণায় আরও বলা হয়েছে যে, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের কোনো আসনেই জামায়াতে ইসলামী থেকে কোনো নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। দলটির গঠনতন্ত্রের বিভিন্ন ধারায় যেমন—ইসলামের মূল বিশ্বাস ও চেতনার ওপর ভিত্তি করে সমাজ তৈরি এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে পরম ক্ষমতার মালিক না মানা, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আল্লাহর নিয়ম ছাড়া অন্য সব নিয়ম ও পথ বর্জন করা, ইসলামী বিশ্বাসের বাইরের কোনো প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পর্ক না রাখা, দলের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচির সাথে একমত হওয়া সাপেক্ষে অমুসলিম নাগরিকদের সহযোগী সদস্যপদ দেওয়া, নিয়মে মুসলিম ও অমুসলিম নাগরিকদের জন্য সদস্যপদ পাওয়ার ক্ষেত্রে আলাদা শর্ত রাখা এবং নারী কর্মীদের জন্য আলাদা বিভাগ বা কমিটি ও আলাদা কাজ চালানো ইত্যাদি বিষয় সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদের (যেমন—সব ক্ষমতার মালিক জনগণ; রাষ্ট্র পরিচালনার মূল নীতিসমূহ যেমন—ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং ধর্ম বা লিঙ্গের কারণে বৈষম্য না করা) সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক বা অমিল।  টিআইবি মনে করে, দলের সেক্রেটারি জেনারেলের বিবৃতির মাধ্যমে তারা গবেষণার সত্যকে অস্বীকার করছে এবং অপ্রাসঙ্গিক তথ্য দিয়ে দলের ভেতরের আসল রাজনৈতিক রূপটি আড়াল করার চেষ্টা করছে। 

আরও পড়ুন

×