সংকট
পানির অভাবে বিপন্ন জনপদ
জলাধারের ধারে কূপ খুঁড়ে সংগ্রহ করতে হয় খাওয়ার পানি। গারো পাহাড়ের পাদদেশের গ্রামগুলোর সর্বত্র পানির এমন সংকট -সমকাল
রাজীব নূর
প্রকাশ: ২৯ মে ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ২৯ মে ২০২২ | ১৫:২১
চাষের জমি বালুতে ঢাকা। রোদের তেজে চিকচিক করে সে বালু। সাধারণ চাষাবাদের সুযোগ নেই সেই বালুময় জমিতে। তাই চাষবাসের নতুন পথ খোঁজেন গারো পাহাড়ের পাদদেশের চাষিরা। বস্তায় মাটি আর সার দিয়ে শাকসবজি ফলানোর একটা উপায় বের করা গেলেও সুপেয় পানির সংকটের বৃত্ত থেকে এখনও বের হতে পারেননি তাঁরা।
নেত্রকোনার কলমাকান্দায় গিয়ে দেখা যায়, আদা, মরিচ, বেগুন, লাউ, শিম, চালকুমড়া, বরবটি, শসাসহ আরও কিছু শাকসবজি এই নিয়মে চাষের চেষ্টা চলছে। তবে প্রয়োজনীয় পানি না থাকায় ফসল ফলানোর বিকল্প পরিকল্পনাও কোনো কোনো সময় মাঠে মারা যাচ্ছে।
একজন বেণুকা ম্রং: পাহাড়ি ঢল থেকে শাকসবজি রক্ষায় ২০২০ সালে প্রথমবারের মতো কলমাকান্দার চন্দ্রডিঙ্গা গ্রামের বেণুকা ম্রং পরীক্ষামূলকভাবে বস্তায় চাষবাসের উদ্যোগ নেন। তুলনা করার জন্য একই সময়ে সরাসরি মাটিতেও সবজি চাষ করেন তিনি। ৫০টি সিমেন্টের খালি বস্তায় আট জাতের মরিচ এবং বারোমাসি সাদা ও কালো বেগুন চাষ করেন। সেই বছরের বর্ষায় তাঁর গ্রামের ওপর দিয়ে পাহাড়ি ঢলের পানি গড়িয়ে যায়। এতে বস্তায় লাগানো মরিচ ও বেগুনগাছের কোনো সমস্যা না হলেও মাটিতে লাগানো সবজির চারা মরে যায়। এরপর তিনি মাটিতে সবজি চাষ থেকে সরে আসেন। তবে পানি সংকটের কারণে বস্তা পদ্ধতির চাষাবাদেও পড়ছেন বেকায়দায়। এ বছর তিনি লাউ, ডাঁটাশাক, লালশাক, পালংশাক, সরিষা, বথুয়াশাক, বারোমাসি মরিচ এবং বেগুনের বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করছেন। নিজে চাষ করার পাশাপাশি আরও ১৭ জনের হাতে তুলে দেন রকমারি শাকসবজির বীজ।
চাষাবাদের বিকল্পের খোঁজে চন্দ্রডিঙ্গা গ্রামের এই কৃষকদের সহযোগিতা করছে বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইন্ডিজেনাস নলেজ (বারসিক)। বারসিকের নির্বাহী পরিচালক সুকান্ত সেন বলেন, 'আমাদের সংগঠন বালুতে উর্বরতা হারানো অঞ্চলে বিকল্প উপায়ে চাষাবাদের কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। সুপেয় পানি সংস্থানেরও চেষ্টা করছি আমরা। এগুলো এখনও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে।'
আরও গভীরে পানি সংকট: গারো ও খাসি পাহাড়ের বিস্তীর্ণ এলাকায় সুপেয় পানির সংকট তীব্রতর হচ্ছে আরও। একই বিপদে আছেন ওই দুটি পাহাড় থেকে নেমে আসা নদীবিধৌত হাওরাঞ্চলের মানুষও। নদী ও ছড়ার কাছাকাছি গ্রামগুলোর কোথাও কোথাও কুয়া খুঁড়ে পানি পাওয়া গেলেও জলাধার থেকে একটু দূরের লোকজনের কষ্টের সীমা নেই। খাবার পানি সংগ্রহের জন্য তাদের পাড়ি দিতে হয় এক থেকে দুই কিলোমিটার পথ। খাবার পানির অভাবে গারো পাহাড়ের পাদদেশের অনেক জনপদ নিশ্চিহ্ন হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
কলমাকান্দার লেঙ্গুরা ইউনিয়নের চেংগ্নি গ্রামের সোহেল মৃ বলেন, 'পানির অভাবে হয়তো একদিন আমাদের এলাকা ছেড়ে যেতে হবে।' টাঙ্গাইলের মধুপুরের চুনিয়া থেকে দেড় যুগ আগে চেংগ্নিতে জামাই হয়ে এসেছিলেন সোহেল। মাতৃতান্ত্রিক মান্দি (গারো) সমাজে বিয়ের পর সাধারণত ছেলেরা শাশুড়ির বাড়িতে চলে যায়। বাংলাদেশ সীমান্তের শেষ বাড়িটি সোহেলদের। অদূরেই গারো পাহাড়। ওই পাহাড় থেকে নেমে আসা ছড়াটি তাঁদের বাড়ির পাশ দিয়ে গেছে। একসময় গোসল, কাপড় কাচা ও খাওয়ার পানি সংগ্রহ করা হতো ছড়া থেকেই। মাছও মিলত বেশ। এখন ছড়া দিয়ে আসে নানা রাসায়নিক মিশ্রিত ঘোলা পানি।
কলমাকান্দার পাতলাবান গ্রামেও দেখা গেল অভিন্ন ছবি। মাত্র চার থেকে পাঁচ ফুট গভীর একটি গর্ত থেকে পানি তুলছিলেন এক নারী। তিনি জানান, অনেকগুলো এমন গর্ত খননের পর এটিতে খাওয়ার উপযোগী পানি মিলেছে। বেশিরভাগ গর্তেই দুর্গন্ধযুক্ত পানি আসে, আয়রন থাকে অনেক বেশি।
রংছাতি ইউনিয়নের এ গ্রামটির অবস্থান গারো পাহাড় থেকে নেমে আসা মহাদেও নদীর পাড়ে। নদীপাড়ের গ্রাম বলেই এমন ছোট ছোট গর্তে পানি মেলে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা গেছে, পানি পাওয়া গেলেও মাত্রাতিরিক্ত আয়রনের কারণে তা পানের উপযোগী নয়। কলমাকান্দার তিনটি পাহাড়ি ইউনিয়ন লেঙ্গুরা, খারনই ও রংছাতির ৩৫টি গ্রামের মানুষ শুধু পানির কষ্টে পড়ে এলাকা ছাড়ার অবস্থা হয়েছে। গ্রামগুলোর বাসিন্দারা সাধারণত পাহাড়ি ছড়া ও কুয়ার পানির ওপর নির্ভর করেন। কয়েক বছর ধরে বর্ষার পর তাপদাহ শুরু হলে সেগুলোও শুকিয়ে যেতে দেখা যায়।
কলমাকান্দার রংছাতি ইউনিয়নের চন্দ্রডিঙ্গা গ্রামের গ্রেগরি ম্রং ও জিলিথা মানখিন দম্পতির উঠানে গিয়ে মিলল একটা অগভীর নলকূপ। জিলিথা জানালেন, 'বেশিরভাগ সময়ই এতে আসে না পানি। পেলেও তা খাওয়ার উপযোগী হয় না। গ্রামের মেয়েরা কলসি কাঁখে দূর থেকে পানি সংগ্রহ করেন।' তিনি বলেন, 'গোসল করার জন্যও এক গ্রামের মানুষ অন্য গ্রামে ছোটেন।'
নেত্রকোনার দুর্গাপুর, কলমাকান্দা; ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট, ধোবাউড়া; শেরপুরের নকলা, নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতি, শ্রীবরদী এবং জামালপুরের বকশীগঞ্জের বিস্তীর্ণ এলাকায় দিনে দিনে পানির সংকট বাড়ছে। সংকট রয়েছে খাসি হিলসের পাদদেশে অবস্থিত হাওর এলাকা সুনামগঞ্জের তাহিরপুর ও বিশ্বম্ভরপুরেও। প্রতিবছর বর্ষায় পাহাড়ি ঢল মোকাবিলা করতে হয় গ্রামবাসীকে। ঢলের পানির সঙ্গে আসা বালু, পাথর ও নানা রাসায়নিকে ক্ষতি হচ্ছে শাকসবজি ও গাছপালার। বালুতে বাড়ছে হাওরের উচ্চতা, নিচে নেমে যাচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। পানির জন্য হাওরের সর্বত্র 'জলমোটর' নামের আন্ডারগ্রাউন্ড সাব-মারসিবল মেশিন বসানোর হিড়িক চলছে। গারো পাহাড়ের পাদদেশের লেঙ্গুরা ইউনিয়নের কোনো কোনো গ্রামে হাজার ফুটের বেশি গভীর নলকূপ বসাতে হবে বলে জানান ওই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ওবায়দুল হক ভূঁইয়া।
নেই কোনো উদ্যোগ: এ ব্যাপারে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় কিংবা বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের কোনো উদ্যোগ নেই বললেই চলে। হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের পরিচালক (কৃষি, পানি ও পরিবেশ) আলী মুহম্মদ ওমর ফারুক বলেন, 'দেশের অন্য সব অঞ্চলের মতো হাওরাঞ্চলেও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। এটি সমাধানের মতো কোনো প্রকল্প তাদের হাতে নেই। তবে সম্প্রতি পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে হাওরের ফসলডোবা, সুপেয় পানির দুষ্প্রাপ্যতা সম্পর্কে জানার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা কাজও শুরু করেছে।'
বিশেষজ্ঞ মত: যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের লক হ্যাভেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. খালেকুজ্জামান বলেন, 'মেঘনা অববাহিকার এক গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হাওর। এই অববাহিকার ভাটিতে ৪০ শতাংশ ভূমি বাংলাদেশে এবং উজানের ৬০ শতাংশজুড়ে ভারত। পানিপ্রবাহের ৫৬ শতাংশ ভারতে আর বাকি ৪৪ শতাংশ বাংলাদেশে। হাওর রক্ষায় আমাদের ভারতকে সঙ্গে নিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা করতে হবে।'
অধ্যাপক খালেকুজ্জামানের মতে, মেঘনা অববাহিকার উজান-ভাটির বাস্তবতা একটি অন্যটিকে প্রভাবিত করে। তাই হাওর এলাকার ভূগর্ভের পানির স্তর নেমে যাওয়া, অকাল বন্যা ইত্যাদি সংকটের সমাধান এবং যে কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনাও হতে হবে অববাহিকার সামগ্রিক ও বাস্তব সমীক্ষার ওপর ভিত্তি করে। তিনি বলেন, 'ভারতকে বোঝাতে হবে তারা যেন যত্রতত্র বাঁধ না দেয়, পানি সরিয়ে নিয়ে না যায় কিংবা উজানে কলকারখানার রাসায়নিক ও নদীদূষণ না করে।'
- বিষয় :
- সংকট
- গারো পাহাড়
