স্যার ফজলে হাসান আবেদের চলে যাওয়ার ৩ বছর
'তাঁর আদর্শই আমাদের চালিকাশক্তি'
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৯ ডিসেম্বর ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ১৯ ডিসেম্বর ২০২২ | ১৩:৩৬
বঞ্চনামুক্ত সমাজ গড়ার যোদ্ধা স্যার ফজলে হাসান আবেদ। তিনি রেখে গেছেন একটি সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন। বিশ্বের সবচেয়ে বড় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা তিনি। তাঁর চলে যাওয়ার তিন বছর পূর্ণ হয়েছে। এই শূন্যতা কখনোই পূরণ হওয়ার নয় স্যার আবেদ চলে গেছেন ২০১৯ সালের ২০ ডিসেম্বর। এখনও যে কোনো সংকটেই বন্ধু-সহকর্মী, কাছের মানুষেরা অনুভব করেন তাঁর অনুপস্থিতি। 'চলুন দেখি আবেদ ভাই কী বলেন'- এ কথা বলে গঠনমূলক পরামর্শ কিংবা দিকনির্দেশনার জন্য তাঁর কাছে ছুটে যেতেন অনেকেই। তাঁদের মধ্যে উন্নয়নকর্মী যেমন আছেন, তেমনি আছেন সরকারি কর্মকর্তা ও নানা পেশার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি।
ব্র্যাক বাংলাদেশের চেয়ারপারসন ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেছেন, 'আবেদ ভাই ২০১৯ সালের জুলাইয়ে ব্র্যাক বাংলাদেশ বোর্ডের চেয়ারপারসন পদে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হওয়ার জন্য আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। প্রথমে বিস্মিত হয়ে পড়ি। পরে তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিলাম, এই পদে করণীয় সম্বন্ধে তাঁর কোনো বিস্তারিত পরামর্শ আছে কিনা। তিনি আসলে উত্তর দেননি। আমি নিজ থেকে পরে বুঝলাম, উনার মেসেজ অন্য ধরনের। উনি আস্থা রাখছেন যাদের ওপর দায়িত্ব দিয়ে যাচ্ছেন তারা সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ও সম্মিলিত বুদ্ধিতে করণীয় চিহ্নিত করবে। ওপার থেকে তাঁর স্মিত হাসি তাই ভরসা দিচ্ছে ও আহ্বান জানাচ্ছে- সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ ও শ্রম আঁকড়ে ধরে বহুদূর যাওয়া যায়, যেতে হবে।' হোসেন জিল্লুর রহমান আরও বলেন, স্যার ফজলে হাসান আবেদ এখন সশরীরে না থাকলেও তাঁর আদর্শ ও দর্শনই আমাদের চালিকাশক্তি। তিনি আমাদের সাহস ও অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছেন। পরিশ্রম, উদ্ভাবন, সাহস ও কর্মোদ্যোগ ছিল তাঁর মূল বিষয়। ব্র্যাক সেটি মেনেই এগিয়ে চলেছে।
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী স্মৃতিচারণ করে বলেন, 'আবেদ ভাই অত্যন্ত দূরদর্শী ছিলেন। যে কোনো সমস্যা সমাধানে তিনি গবেষণাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতেন। শেষ বিদায়ের আগে তিনি বলেছিলেন, শিক্ষায় অনেক চ্যালেঞ্জ আছে, হাল ছেড়ো না। মৃত্যুপথযাত্রী একজন ব্যক্তি মৃত্যুযন্ত্রণা নিয়ে কথা না বলে শিক্ষার উন্নয়নে কথা বলেছেন। এ থেকেই বোঝা যায়, তিনি শিক্ষাকে কতটা গুরুত্ব দিতেন।' রাশেদা কে চৌধুরী একটি উদাহরণ দিয়ে বলেন, 'আবেদ ভাই একবার গ্রামে গিয়েছিলেন। সেখানে একদল কিশোরী তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিল, স্যার আপনি ছোট শিশুদের শিক্ষা নিয়ে কাজ করেন; কিন্তু আমাদের জন্য কী কিছু করবেন না? এর পর ফিরে এসে তিনি কিশোরী ক্লাব খুলেছিলেন। এখন তাঁদের অনেকেই স্থানীয় পর্যায়ের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, এমনকি নির্বাচিত প্রতিনিধি হয়েছেন। উনি বিশ্বাস করতেন কর্মসংস্থানের আগে শিক্ষাটা প্রয়োজন। যদি শিক্ষা ও কর্মসংস্থান একসঙ্গে হয় তাহলে নারীর ক্ষমতায়ন অবশ্যম্ভাবী।'
স্যার ফজলে হাসান আবেদের স্মৃতি তুলে ধরে তাঁর জামাতা, বর্তমানে ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ বলেন, 'তিনি ভীষণ ব্যস্ততার মধ্যেও পরিবারকে সবসময় গুরুত্ব দিয়েছেন। আর সেটা শুধু নিজের একক পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, পরিবারের দূরবর্তী সদস্যরাও একই মনোযোগ পেত। অত্যন্ত ধৈর্যশীল শ্রোতা ছিলেন। স্যার ফজলে হাসান আবেদের উন্নয়ন দর্শন 'যার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি, তার কাছে আগে পৌঁছতে হবে'- এ আদর্শ অনুসরণ করেই ব্র্যাক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
ব্র্যাক গতকাল সোমবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, ১৯৭২ সালে সুনামগঞ্জের প্রত্যন্ত এলাকা শাল্লায় ফিরে আসা শরণার্থীদের ত্রাণ ও পুনর্বাসনে ব্র্যাক প্রতিষ্ঠা করেন স্যার ফজলে হাসান আবেদ। তাঁর স্বপ্ন ও দর্শনের পথ ধরে বিকশিত ব্র্যাক আজ শিখর ছুঁয়েছে।
ফজলে হাসান আবেদ বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে ১৯৮০ সালে ম্যাগসেসে পুরস্কার, বিশ্ব খাদ্য পুরস্কার, স্পেনিশ অর্ডার অব সিভিল মেরিট, অফিসার ইন দ্য অর্ডার অব অরেঞ্জ-নাসাউ, লিও টলস্টয় ইন্টারন্যাশনাল গোল্ড মেডেল ইত্যাদি পুরস্কার পেয়েছেন। দারিদ্র্য বিমোচনে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১০ সালে যুক্তরাজ্যের নাইট উপাধিতে ভূষিত হন। এ ছাড়া ওই বছর নেদারল্যান্ডসের নাইটহুড 'অফিসার ইন দ্য অর্ডার অব অরেঞ্জ-নাসাউ' খেতাবে ভূষিত হন তিনি। ২০১৯ সালে শিক্ষা উন্নয়নে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ পুরস্কার ইদান প্রাইজ অর্জন করেন।
- বিষয় :
- স্যার ফজলে হাসান আবেদ
