করোনা প্রতিরোধে চাই সম্মিলিত উদ্যোগ
×
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১০ মার্চ ২০২০ | ১৩:৪৩ | আপডেট: ১০ মার্চ ২০২০ | ১৩:৪৪
প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস প্রতিরোধে একগুচ্ছ পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। ধাপে ধাপে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, 'ন্যাশনাল প্রিপেয়ার্ডনেস অ্যান্ড রেসপন্স প্ল্যান ফর কভিড-১৯, বাংলাদেশ' নামে পরিকল্পনা এরই মধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জাতীয় কমিটির সভায় গৃহীত হয়েছে। এই পরিকল্পনার আওতায় করোনাভাইরাস মোকাবিলায় ১১টি কমিটি গঠন করা হবে। কয়েকটি কমিটি এরই মধ্যে গঠন করা হয়েছে, অন্যগুলো প্রক্রিয়াধীন।
কমিটিগুলো হচ্ছে- জাতীয় উপদেষ্টা কমিটি, ন্যাশনাল মাল্টিসেক্টরাল টাস্কফোর্স কমিটি, যোগাযোগ কমিটি, জাতীয় কারিগরি কমিটি, জাতীয় সমন্বয় কমিটি, জেলা মাল্টিসেক্টরাল সমন্বয় কমিটি, উপজেলা মাল্টিসেক্টরাল সমন্বয় কমিটি, ন্যাশনাল র্যাপিড রেসপন্স কমিটি, জেলা র্যাপিড রেসপন্স কমিটি, উপজেলা র্যাপিড রেসপন্স কমিটি এবং হাসপাতাল কভিড-১৯ ব্যবস্থাপনা কমিটি। এর মধ্যে জেলা পর্যায়ে ১১ সদস্যের, উপজেলা পর্যায়ে ১০ সদস্যের এবং জাতীয় পর্যায়ে ৩১ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। অন্য কমিটিগুলো গঠনের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।
কমিটি গঠনের এ ধরনের প্রক্রিয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের অভিমত, অধিক সংখ্যক কমিটি গঠন প্রতিরোধ কার্যক্রমে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। এ বিষয়ে সরকারকে আরও চিন্তাভাবনা করতে হবে। তবে অধিকতর প্রয়োজন- এমন কমিটিগুলো সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আগেভাগে গঠন করতে হবে। অন্যথায় পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। এ ভাইরাস মোকাবিলায় তারা সম্মিলিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব সমকালকে বলেন, অধিক সংখ্যক কমিটি গঠন প্রতিরোধ কার্যক্রমে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। এ বিষয়ে সরকারকে আরও চিন্তাভাবনা করতে হবে। তবে অতিপ্রয়োজনীয় কমিটিগুলো সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আগেভাগে গঠন করতে হবে। সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ ছাড়া সবকিছুই ব্যর্থ হতে পারে।
প্রায় একই বক্তব্য দিয়েছেন বিএসএমএমইউর সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম। তিনি সমকালকে বলেন, করোনার সংক্রমণ এখন মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়ে পড়ছে। তাই সবার আগে আক্রান্ত ব্যক্তিকে শনাক্তকরণে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে ওই ব্যক্তির সংস্পর্শে যারা এসেছিলেন, তাদেরও শনাক্ত করে কোয়ারেন্টাইনে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। এটি শুধু স্বাস্থ্য বিভাগের একার পক্ষে করা সম্ভব নয়। সরকারের সংশ্নিষ্ট সব বিভাগ থেকে শুরু করে সবার অংশগ্রহণ থাকতে হবে। মোটকথা, এই ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে সচেতনতামূলক কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। এ জন্য সম্মিলিত উদ্যোগের প্রয়োজন।
করোনাভাইরাস মোকাবিলায় এ পর্যন্ত সরকারিভাবে যে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে, তাতে এই ভাইরাসের সংক্রমণ কতটুকু প্রতিরোধ করা যাবে- তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সম্প্রতি ইতালিফেরত দু'জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে এবং তাদের একজনের সংস্পর্শে থাকা অন্য একজন আক্রান্ত হয়েছেন। গত সোমবার স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব আসাদুল ইসলাম জানিয়েছেন, আক্রান্ত এক ব্যক্তির সংস্পর্শে থাকা আরও ৪০ জনকে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। হাসপাতালের কোয়ারেন্টাইনে থাকা ইতালিফেরত একজনের সংস্পর্শে থাকায় গতকাল মঙ্গলবার মাদারীপুরে ২৯ জনকে জেলা সদর হাসপাতালে এবং মানিকগঞ্জে ৫৯ জনকে হোম কোয়ারেন্টাইন করে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া আরও কয়েকটি জেলায় বিদেশফেরত আরও কয়েকজনকে কোয়ারেন্টাইনে রাখার খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ৬০ দেশ থেকে আসা ব্যক্তিদের হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার নির্দেশনা জারি করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
করোনাভাইরাস আক্রান্ত তিন ব্যক্তি শনাক্ত হওয়ার পর জীবাণু প্রতিরোধে পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে দিয়েছে কালোবাজারি চক্র। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত সোমবার ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর কয়েকটি পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে দিয়ে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। এরপরও থেমে নেই কালোবাজারি চক্র। গতকাল মঙ্গলবার সারাদেশে ভ্রাম্যমাণ আদালত, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরসহ কয়েকটি সরকারি সংস্থা দেশব্যাপী অভিযানে নামে। মুনাফালোভী কয়েকজনকে জেল-জরিমানা করা হয়েছে।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, করোনাভাইরাস শনাক্তকরণ কিট, পার্সোনাল প্রটেকশন ইকুইপমেন্ট, হাসপাতালের প্রস্তুতিসহ অনেক বিষয়ে বিশ্বব্যাপী প্রশ্ন ও সংশয় আছে। বাংলাদেশও এ চ্যালেঞ্জের বাইরে নয়। সরকার সম্মিলিত উদ্যোগের ওপর জোর দিচ্ছে। সন্দেহভাজনদের হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখার বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে দেশের মানুষ হোম কোয়ারেন্টাইনে কতটা অভ্যস্ত হবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বাংলাদেশের ঘনবসতিকে একটি বড় দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেছেন, দেশে ঘনবসতির পাশাপাশি আরেকটি বড় দুর্বলতা হচ্ছে, দেশের বাইরে আমাদের প্রায় এক কোটি মানুষ অবস্থান করছে। বিশ্বের ১০২টি দেশে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিটি দেশেই আমাদের দেশের মানুষ বসবাস করছে। তারা করোনা সংক্রমিত হয়ে দেশে এলে এই রোগের সংক্রমণ বাড়বে। তখন নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।
আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, যে কোনো সংক্রামক রোগ প্রতিরোধের জন্য ইনফেকশন প্রিভেনশন কমিটি রয়েছে। এই কমিটির কার্যক্রম সক্রিয় করা প্রয়োজন। কারণ হাসপাতালগুলোর ইনফেকশন কন্ট্রোল ব্যবস্থার মান তেমন সন্তোষজনক নয়। কোনো ব্যক্তি জ্বর ও সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে গেলেন; কিন্তু তিনি জানলেন না তিনি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত। এ ধরনের অবস্থা নিয়ে বড় হাসপাতালগুলোতে গেলে তা পুরো কমিউনিটির মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে। সুতরাং এ বিষয়ে সরকারের সংশ্নিষ্টদের ভাবতে হবে।
প্রস্তুতিতে ঘাটতির তথ্য তুলে ধরে আইসিডিডিআর,বির উপদেষ্টা রোগতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমান সমকালকে বলেন, চীনের বাইরে করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিদের একজনও বিমানবন্দরে শনাক্ত হয়নি। অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর তাদের করোনা শনাক্ত হয়েছে। তাই হাসপাতালগুলোকে সতর্ক করা প্রয়োজন ছিল; কিন্তু সেটি তেমনভাবে করা হয়নি।
সংক্রমণের মাত্রা বেড়ে গেলে তাদের কোথায় রেখে চিকিৎসা দেওয়া হবে, সেটি অনেক বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে ডা. মাহমুদুর রহমান বলেন, দেশে ছোট-বড় সব হাসপাতালে রোগীর অনেক ভিড়। করোনা আক্রান্ত রোগীরা অন্য রোগীদের সঙ্গে মিশে গেলে রোগটি ছড়িয়ে পড়বে। হয়তো ব্যবস্থা আছে কিন্তু সেটি কীভাবে করা হবে, তা নিয়ে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সুতরাং সংশ্নিষ্টদের এসব বিষয় নিয়ে ভাবতে হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, জ্বর ও সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত হলেই যে, করোনাভাইরাস- এমনটি ভাবা সঠিক নয়। তবে এ ধরনের উপসর্গ নিয়ে যারা চিকিৎসা নিতে আসবেন, তাদের বহির্বিভাগের একটু দূরে কোথাও চিকিৎসা দেওয়ার বিষয়ে হাসপাতালগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য স্থানীয়ভাবে মাইকিং, কেবল টিভি নেটওয়ার্ক, মসজিদ ও মন্দিরসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ব্যবহার করা হবে। জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা এর সঙ্গে যুক্ত আছেন। সুতরাং এটি সম্মিলিত উদ্যোগেরই অংশ।
আক্রান্ত তিনজনের অবস্থা স্থিতিশীল, নতুন করে কেউ আক্রান্ত হয়নি -আইইডিসিআর :নতুন করে আর কারও শরীরে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পাওয়া যায়নি বলে নিশ্চিত করেছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। গতকাল মঙ্গলবার করোনাভাইরাস নিয়ে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদি সেব্রিনা ফ্লোরা সাংবাদিকদের বলেন, মঙ্গলবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত চব্বিশ ঘণ্টায় নতুন করে সন্দেহভাজন সাতজনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। তাদের কারও শরীরে করোনা পাওয়া যায়নি। ওই সাতজনের মধ্যে বিদেশফেরত যাত্রীও রয়েছেন। দু'জনের মধ্যে মৃদু উপসর্গ ছিল। কিন্তু তাদের ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে না। পরপর দুটি নমুনা পরীক্ষায় নেগেটিভ হলে তাহলেই কেবল তাদের হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হবে।
পরিচালক আরও বলেন, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর একটি হাসপাতালে ভর্তি থাকা তিনজনের অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে। ইতালিফেরত ব্যক্তিদের সংস্পর্শে আসা চারজনকে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া বিদেশফেরত এবং তাদের সংস্পর্শে থাকা আরও কিছু ব্যক্তিকে বাড়িতে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। তবে কতসংখ্যক মানুষকে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো তথ্য তিনি জানাননি।
৬০ দেশ থেকে আসা ব্যক্তিদের হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে :বিশ্বের ৬০টি দেশ থেকে বাংলাদেশে আসা বক্তিদের হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার নির্দেশনা জারি করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। ওই দেশগুলো হলো- চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, নিউজিল্যান্ড, কম্বোডিয়া, ইতালি, জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেন, সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, সুইডেন, নরওয়ে, অস্ট্রিয়া, গ্রিস, আইসল্যান্ড, ডেনমার্ক, সান ম্যারিনো, চেকিয়া, ইসরায়েল, পর্তুগাল, ফিনল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, রোমানিয়া, স্লোভেনিয়া, ক্রোয়েশিয়া, হাঙ্গেরি, বেলারুশ, স্লোভাকিয়া, বসনিয়া ও হারজেগোভিনা, বুলগেরিয়া, থাইল্যান্ড, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালদ্বীপ, ইরান, বাহরাইন, ইরাক, মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, লেবানন, ফিলিস্তিন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র্র, কানাডা, ব্রাজিল, ইকুয়েডর, চিলি, কোস্টারিকা, পেরু, আলজেরিয়া, ক্যামেরুন এবং ডায়মন্ড প্রিন্সেস জাহাজ। এসব দেশ থেকে দেশি-বিদেশি যেসব নাগরিক বাংলাদেশে আসবেন, তাদের নিজ উদ্যোগে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে। এসব ব্যক্তির কারও মধ্যে করোনার উপসর্গ দেখা দিলে আইইডিসিআরের হটলাইনে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ দেশে করোনার স্থানীয় সংক্রমণ ঘটেছে। এ অবস্থায় যে দেশে যে আছেন, সেখানে অবস্থান করাই সবচেয়ে ভালো। কারণ বিমানে আরোহণ, ট্রানজিট ও অবতরণের সময় বিমানবন্দর টার্মিনাল এবং বিমানের ভেতরে যে কোনো যাত্রীর মাধ্যমে করোনা সংক্রমিত হতে পারে। এতে করে ওই যাত্রী যে দেশে অবতরণ করবেন, সে দেশেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ অবস্থায় প্রয়োজন নয়, এমন আন্তর্জাতিক ভ্রমণ এড়িয়ে চলুন।
কমিটিগুলো হচ্ছে- জাতীয় উপদেষ্টা কমিটি, ন্যাশনাল মাল্টিসেক্টরাল টাস্কফোর্স কমিটি, যোগাযোগ কমিটি, জাতীয় কারিগরি কমিটি, জাতীয় সমন্বয় কমিটি, জেলা মাল্টিসেক্টরাল সমন্বয় কমিটি, উপজেলা মাল্টিসেক্টরাল সমন্বয় কমিটি, ন্যাশনাল র্যাপিড রেসপন্স কমিটি, জেলা র্যাপিড রেসপন্স কমিটি, উপজেলা র্যাপিড রেসপন্স কমিটি এবং হাসপাতাল কভিড-১৯ ব্যবস্থাপনা কমিটি। এর মধ্যে জেলা পর্যায়ে ১১ সদস্যের, উপজেলা পর্যায়ে ১০ সদস্যের এবং জাতীয় পর্যায়ে ৩১ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। অন্য কমিটিগুলো গঠনের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।
কমিটি গঠনের এ ধরনের প্রক্রিয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের অভিমত, অধিক সংখ্যক কমিটি গঠন প্রতিরোধ কার্যক্রমে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। এ বিষয়ে সরকারকে আরও চিন্তাভাবনা করতে হবে। তবে অধিকতর প্রয়োজন- এমন কমিটিগুলো সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আগেভাগে গঠন করতে হবে। অন্যথায় পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। এ ভাইরাস মোকাবিলায় তারা সম্মিলিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব সমকালকে বলেন, অধিক সংখ্যক কমিটি গঠন প্রতিরোধ কার্যক্রমে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। এ বিষয়ে সরকারকে আরও চিন্তাভাবনা করতে হবে। তবে অতিপ্রয়োজনীয় কমিটিগুলো সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আগেভাগে গঠন করতে হবে। সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ ছাড়া সবকিছুই ব্যর্থ হতে পারে।
প্রায় একই বক্তব্য দিয়েছেন বিএসএমএমইউর সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম। তিনি সমকালকে বলেন, করোনার সংক্রমণ এখন মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়ে পড়ছে। তাই সবার আগে আক্রান্ত ব্যক্তিকে শনাক্তকরণে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে ওই ব্যক্তির সংস্পর্শে যারা এসেছিলেন, তাদেরও শনাক্ত করে কোয়ারেন্টাইনে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। এটি শুধু স্বাস্থ্য বিভাগের একার পক্ষে করা সম্ভব নয়। সরকারের সংশ্নিষ্ট সব বিভাগ থেকে শুরু করে সবার অংশগ্রহণ থাকতে হবে। মোটকথা, এই ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে সচেতনতামূলক কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। এ জন্য সম্মিলিত উদ্যোগের প্রয়োজন।
করোনাভাইরাস মোকাবিলায় এ পর্যন্ত সরকারিভাবে যে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে, তাতে এই ভাইরাসের সংক্রমণ কতটুকু প্রতিরোধ করা যাবে- তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সম্প্রতি ইতালিফেরত দু'জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে এবং তাদের একজনের সংস্পর্শে থাকা অন্য একজন আক্রান্ত হয়েছেন। গত সোমবার স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব আসাদুল ইসলাম জানিয়েছেন, আক্রান্ত এক ব্যক্তির সংস্পর্শে থাকা আরও ৪০ জনকে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। হাসপাতালের কোয়ারেন্টাইনে থাকা ইতালিফেরত একজনের সংস্পর্শে থাকায় গতকাল মঙ্গলবার মাদারীপুরে ২৯ জনকে জেলা সদর হাসপাতালে এবং মানিকগঞ্জে ৫৯ জনকে হোম কোয়ারেন্টাইন করে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া আরও কয়েকটি জেলায় বিদেশফেরত আরও কয়েকজনকে কোয়ারেন্টাইনে রাখার খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ৬০ দেশ থেকে আসা ব্যক্তিদের হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার নির্দেশনা জারি করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
করোনাভাইরাস আক্রান্ত তিন ব্যক্তি শনাক্ত হওয়ার পর জীবাণু প্রতিরোধে পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে দিয়েছে কালোবাজারি চক্র। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত সোমবার ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর কয়েকটি পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে দিয়ে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। এরপরও থেমে নেই কালোবাজারি চক্র। গতকাল মঙ্গলবার সারাদেশে ভ্রাম্যমাণ আদালত, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরসহ কয়েকটি সরকারি সংস্থা দেশব্যাপী অভিযানে নামে। মুনাফালোভী কয়েকজনকে জেল-জরিমানা করা হয়েছে।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, করোনাভাইরাস শনাক্তকরণ কিট, পার্সোনাল প্রটেকশন ইকুইপমেন্ট, হাসপাতালের প্রস্তুতিসহ অনেক বিষয়ে বিশ্বব্যাপী প্রশ্ন ও সংশয় আছে। বাংলাদেশও এ চ্যালেঞ্জের বাইরে নয়। সরকার সম্মিলিত উদ্যোগের ওপর জোর দিচ্ছে। সন্দেহভাজনদের হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখার বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে দেশের মানুষ হোম কোয়ারেন্টাইনে কতটা অভ্যস্ত হবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বাংলাদেশের ঘনবসতিকে একটি বড় দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেছেন, দেশে ঘনবসতির পাশাপাশি আরেকটি বড় দুর্বলতা হচ্ছে, দেশের বাইরে আমাদের প্রায় এক কোটি মানুষ অবস্থান করছে। বিশ্বের ১০২টি দেশে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিটি দেশেই আমাদের দেশের মানুষ বসবাস করছে। তারা করোনা সংক্রমিত হয়ে দেশে এলে এই রোগের সংক্রমণ বাড়বে। তখন নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।
আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, যে কোনো সংক্রামক রোগ প্রতিরোধের জন্য ইনফেকশন প্রিভেনশন কমিটি রয়েছে। এই কমিটির কার্যক্রম সক্রিয় করা প্রয়োজন। কারণ হাসপাতালগুলোর ইনফেকশন কন্ট্রোল ব্যবস্থার মান তেমন সন্তোষজনক নয়। কোনো ব্যক্তি জ্বর ও সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে গেলেন; কিন্তু তিনি জানলেন না তিনি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত। এ ধরনের অবস্থা নিয়ে বড় হাসপাতালগুলোতে গেলে তা পুরো কমিউনিটির মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে। সুতরাং এ বিষয়ে সরকারের সংশ্নিষ্টদের ভাবতে হবে।
প্রস্তুতিতে ঘাটতির তথ্য তুলে ধরে আইসিডিডিআর,বির উপদেষ্টা রোগতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমান সমকালকে বলেন, চীনের বাইরে করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিদের একজনও বিমানবন্দরে শনাক্ত হয়নি। অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর তাদের করোনা শনাক্ত হয়েছে। তাই হাসপাতালগুলোকে সতর্ক করা প্রয়োজন ছিল; কিন্তু সেটি তেমনভাবে করা হয়নি।
সংক্রমণের মাত্রা বেড়ে গেলে তাদের কোথায় রেখে চিকিৎসা দেওয়া হবে, সেটি অনেক বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে ডা. মাহমুদুর রহমান বলেন, দেশে ছোট-বড় সব হাসপাতালে রোগীর অনেক ভিড়। করোনা আক্রান্ত রোগীরা অন্য রোগীদের সঙ্গে মিশে গেলে রোগটি ছড়িয়ে পড়বে। হয়তো ব্যবস্থা আছে কিন্তু সেটি কীভাবে করা হবে, তা নিয়ে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সুতরাং সংশ্নিষ্টদের এসব বিষয় নিয়ে ভাবতে হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, জ্বর ও সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত হলেই যে, করোনাভাইরাস- এমনটি ভাবা সঠিক নয়। তবে এ ধরনের উপসর্গ নিয়ে যারা চিকিৎসা নিতে আসবেন, তাদের বহির্বিভাগের একটু দূরে কোথাও চিকিৎসা দেওয়ার বিষয়ে হাসপাতালগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য স্থানীয়ভাবে মাইকিং, কেবল টিভি নেটওয়ার্ক, মসজিদ ও মন্দিরসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ব্যবহার করা হবে। জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা এর সঙ্গে যুক্ত আছেন। সুতরাং এটি সম্মিলিত উদ্যোগেরই অংশ।
আক্রান্ত তিনজনের অবস্থা স্থিতিশীল, নতুন করে কেউ আক্রান্ত হয়নি -আইইডিসিআর :নতুন করে আর কারও শরীরে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পাওয়া যায়নি বলে নিশ্চিত করেছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। গতকাল মঙ্গলবার করোনাভাইরাস নিয়ে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদি সেব্রিনা ফ্লোরা সাংবাদিকদের বলেন, মঙ্গলবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত চব্বিশ ঘণ্টায় নতুন করে সন্দেহভাজন সাতজনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। তাদের কারও শরীরে করোনা পাওয়া যায়নি। ওই সাতজনের মধ্যে বিদেশফেরত যাত্রীও রয়েছেন। দু'জনের মধ্যে মৃদু উপসর্গ ছিল। কিন্তু তাদের ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে না। পরপর দুটি নমুনা পরীক্ষায় নেগেটিভ হলে তাহলেই কেবল তাদের হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হবে।
পরিচালক আরও বলেন, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর একটি হাসপাতালে ভর্তি থাকা তিনজনের অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে। ইতালিফেরত ব্যক্তিদের সংস্পর্শে আসা চারজনকে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া বিদেশফেরত এবং তাদের সংস্পর্শে থাকা আরও কিছু ব্যক্তিকে বাড়িতে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। তবে কতসংখ্যক মানুষকে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো তথ্য তিনি জানাননি।
৬০ দেশ থেকে আসা ব্যক্তিদের হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে :বিশ্বের ৬০টি দেশ থেকে বাংলাদেশে আসা বক্তিদের হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার নির্দেশনা জারি করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। ওই দেশগুলো হলো- চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, নিউজিল্যান্ড, কম্বোডিয়া, ইতালি, জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেন, সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, সুইডেন, নরওয়ে, অস্ট্রিয়া, গ্রিস, আইসল্যান্ড, ডেনমার্ক, সান ম্যারিনো, চেকিয়া, ইসরায়েল, পর্তুগাল, ফিনল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, রোমানিয়া, স্লোভেনিয়া, ক্রোয়েশিয়া, হাঙ্গেরি, বেলারুশ, স্লোভাকিয়া, বসনিয়া ও হারজেগোভিনা, বুলগেরিয়া, থাইল্যান্ড, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালদ্বীপ, ইরান, বাহরাইন, ইরাক, মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, লেবানন, ফিলিস্তিন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র্র, কানাডা, ব্রাজিল, ইকুয়েডর, চিলি, কোস্টারিকা, পেরু, আলজেরিয়া, ক্যামেরুন এবং ডায়মন্ড প্রিন্সেস জাহাজ। এসব দেশ থেকে দেশি-বিদেশি যেসব নাগরিক বাংলাদেশে আসবেন, তাদের নিজ উদ্যোগে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে। এসব ব্যক্তির কারও মধ্যে করোনার উপসর্গ দেখা দিলে আইইডিসিআরের হটলাইনে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ দেশে করোনার স্থানীয় সংক্রমণ ঘটেছে। এ অবস্থায় যে দেশে যে আছেন, সেখানে অবস্থান করাই সবচেয়ে ভালো। কারণ বিমানে আরোহণ, ট্রানজিট ও অবতরণের সময় বিমানবন্দর টার্মিনাল এবং বিমানের ভেতরে যে কোনো যাত্রীর মাধ্যমে করোনা সংক্রমিত হতে পারে। এতে করে ওই যাত্রী যে দেশে অবতরণ করবেন, সে দেশেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ অবস্থায় প্রয়োজন নয়, এমন আন্তর্জাতিক ভ্রমণ এড়িয়ে চলুন।
- বিষয় :
- করোনা
