এইচএসসি পরীক্ষায় থাকবে পুলিশের বডি-ওর্ন ক্যামেরা
প্রতিটি কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি
ফাইল ফটো
সাব্বির নেওয়াজ
প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬ | ০৮:৪০ | আপডেট: ৩০ জুন ২০২৬ | ০৯:২৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শান্তিপূর্ণ ও নকলমুক্ত পরিবেশে সম্পন্ন করতে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। পরীক্ষা কেন্দ্রে নিরাপত্তা রক্ষা এবং বহিরাগতদের প্রবেশ ঠেকাতে দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা ব্যবহার করবেন বডি-ওর্ন ক্যামেরা। একই সঙ্গে প্রতিটি কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারির ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
পরীক্ষা কেন্দ্রের ভেতর ও আশপাশে সার্বক্ষণিক নজরদারি জোরদার করা হবে। বহিরাগতদের প্রবেশ, প্রশ্নপত্র ফাঁসের চেষ্টা কিংবা যে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর অবস্থানে থাকবে। এ ছাড়া সামাজিক মাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁসের গুজব ছড়িয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি, ভুয়া তথ্য প্রচার কিংবা অপপ্রচারের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিদ্যমান সাইবার আইনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ, শিক্ষা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করবে।
শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন সমকালকে বলেন, অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে এবার পরীক্ষা পরিচালনায় আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে। তিনি জানান, কোনো পরীক্ষা কেন্দ্রেই সিসি ক্যামেরা স্থাপনে ব্যত্যয় ঘটানো যাবে না। প্রতিটি কেন্দ্রে একটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ ও মনিটর থাকতে হবে। পাশাপাশি ধারণ করা ভিডিও সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাখতে হবে, যাতে পরে কোনো অভিযোগ উঠলে তা যাচাই করা সম্ভব হয়।
পুলিশের বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের বিষয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, দুটি উদ্দেশ্যে এটি করা হচ্ছে। প্রথমত, পরীক্ষার্থীরা যেন অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো কিছু বা ডিভাইস সঙ্গে নিয়ে পরীক্ষার হলে ঢুকতে না পারে। দ্বিতীয়ত, পরীক্ষা কেন্দ্রের আশপাশের কেউ যেন কেন্দ্রের ১৪৪ ধারা ভাঙতে না পারে।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক কামাল উদ্দিন হায়দার সমকালকে বলেন, ‘এলাকার মাস্তান, গুন্ডারা অনেক সময় পরীক্ষা কেন্দ্রে ঢুকে পড়তে চায়। যেহেতু পুলিশের বডি-ওর্ন ক্যামেরায় সব রেকর্ড থাকে, তাই আমরা চাইলে ঢাকা থেকে তা দেখতে পারব।’
পুলিশ পরীক্ষার্থীদের দেহ তল্লাশি করবে কিনা জানতে চাইলে ঢাকা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক জেসমিন তাসলিমা বানু বলেন, ‘ঠিক দেহ তল্লাশি নয়, চেকিং করে ঢোকানো হবে। তবে কোনো পরীক্ষার্থীকে হয়রানি করা হবে না।’
এ ছাড়া পরীক্ষায় ডিজিটাল অনিয়ম ও জালিয়াতি ঠেকাতে আইনেও সংশোধন আনতে যাচ্ছে সরকার। শুধু এসএসসি-এইচএসসির মতো একাডেমিক পরীক্ষা নয়, বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষাসহ সব ধরনের সরকারি নিয়োগ পরীক্ষাকে ‘পাবলিক পরীক্ষা’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে পরীক্ষা কেন্দ্রে মোবাইল ফোন, স্মার্টওয়াচ, ব্লুটুথ, হেডফোন বা অন্য যে কোনো ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করে জালিয়াতিকে ‘ডিজিটাল ম্যানিপুলেশন’ অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ‘দ্য পাবলিক এক্সামিনেশনস (অফেন্সেস) (সংশোধন) অ্যাক্ট, ২০২৬’-এর খসড়া চূড়ান্ত করেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভার বৈঠকে খসড়াটি উপস্থাপন করা হবে। খসড়া অনুযায়ী, পরীক্ষা কেন্দ্রে ডিজিটাল পদ্ধতিতে যে কোনো ধরনের প্রতারণা, উত্তরপত্রে ঘষামাজা বা নম্বর পরিবর্তনের চেষ্টা, ফলাফল বিকৃত করা কিংবা পরীক্ষাসংক্রান্ত তথ্য হ্যাকিংয়ের মতো অপরাধে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
গত ২ এপ্রিল মন্ত্রিসভার বৈঠকে আইনটির খসড়া নীতিগত অনুমোদন পায়। তখন সংঘবদ্ধভাবে প্রশ্নফাঁস, পরীক্ষা জালিয়াতি বা গুজব ছড়ানোর মতো অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড অথবা এক কোটি টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডের প্রস্তাব ছিল। এ ছাড়া অপরাধচক্র গঠন এবং অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্তের বিধানও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। তবে চূড়ান্ত খসড়ায় শাস্তির মাত্রা কমিয়ে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড করা হয়েছে এবং এক কোটি টাকা জরিমানার প্রস্তাব বাদ দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে দেশে কার্যকর রয়েছে পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইন, ১৯৮০। এ আইনের আওতায় এসএসসি, এইচএসসিসহ শিক্ষা বোর্ড পরিচালিত পাবলিক পরীক্ষাগুলো অন্তর্ভুক্ত। ফলে সরকারি নিয়োগ পরীক্ষা কিংবা স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস বা জালিয়াতির ঘটনায় এ আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই। সংশোধনের মাধ্যমে সেই সীমাবদ্ধতা দূর করা হচ্ছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গত চার দশকে পরীক্ষা পদ্ধতিতে প্রযুক্তিগত ব্যাপক পরিবর্তন এলেও আইনটি সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। প্রশ্নফাঁস, গোপন ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার, সামাজিক মাধ্যমে গুজব ছড়ানো এবং ফলাফল হ্যাকিংয়ের মতো অপরাধ বাড়লেও এসব বিষয়ে বিদ্যমান আইনে সুস্পষ্ট বিধান নেই। তাই নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আইনটি আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ বছরের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষা আগামী বৃহস্পতিবার দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে একযোগে শুরু হবে। এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় বসতে যাচ্ছে মোট ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ পরীক্ষার্থী।
- বিষয় :
- এইচএসসি
- পরীক্ষা
- শিক্ষা মন্ত্রণালয়
