জাপানের সূর্যাস্তে ব্রাজিল শেষ ষোলোয়
সঞ্জয় সাহা পিয়াল, হিউস্টন থেকে
প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬ | ০৯:১৬ | আপডেট: ৩০ জুন ২০২৬ | ০৯:৩৬
ফুটবল যদি সত্যিই শুধু ৯০ মিনিটের ব্যাকরণ হতো, তবে হিউস্টন সামুরাইদের নীল উৎসবে ভাসত। কিন্তু ফুটবল যে আসলে এক পরম অনিশ্চয়তার থ্রিলার, যে থ্রিলারের শেষ লাইনে জয়গাথা লেখার আদিম ও অদ্বিতীয় অধিকারটি যেন শুধু ব্রাজিলেরই সংরক্ষিত! জাপানের নিখুঁত রণকৌশল যখন সেলেসাওদের হেক্সা মিশনকে ৯০ মিনিট পর্যন্ত ১-১ রেখে খাদের কিনারে প্রায় নিয়ে এসেছে, ঠিক তখনই জেগে উঠল ব্রাজিলের সেই চিরচেনা চারিত্রিক দৃঢ়তা।
চাপ কাটার জাদুমন্ত্র জানা এই দলটা প্রমাণ করে দিল, কেন শত বিপদেও তাদের হলুদ জার্সির মহিমা ম্লান হয় না। শেষ মুহূর্তে (৯৬ মিনিট) মার্তিনেল্লির ওই জাদুকরি গোল আসলে কোনো অঘটন নয়, বরং ফুটবলের চিরন্তন রাজপুত্রদের সাম্বা ছন্দে বিশ্বজয়ের মঞ্চে আরও একবার দাপটের সঙ্গে টিকে থাকার অদম্য ঘোষণা। জাপানের বিশ্বকাপের সূর্যাস্ত ঘটিয়ে ব্রাজিল যেন সেই রোদটা চেয়ে রাখল তাদের শেষ ষোলোর জন্য। সেখানে নরওয়ে অথবা আইভরি কোস্টকে পেতে পারে তারা।
আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে জাপানের এক ফুটবলার অনেকটা তাচ্ছিল্য করেই বলেছিলেন, ‘ব্রাজিল আর আগের সেই ব্রাজিল নেই। এখনকার সময়ে ফ্রান্স, আর্জেন্টিনা ফেভারিট।’ কথাটির উত্তর ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তি সেদিন মাইকের সামনে দেননি; তবে এদিন কিন্তু বুঝিয়ে দিয়েছেন– ব্রাজিল ব্রাজিলই। হয়তো তা কখনও ছায়া ঢাকা হতে পারে, তবে সেটি কেটেও যায়। ম্যাচের শুরু থেকেই জাপানের গেমপ্ল্যান ছিল পরিষ্কার। রক্ষণে পাঁচজনের দেয়াল তুলে নিখুঁত কাউন্টার অ্যাটাক। ২৯ মিনিটে যখন কাইশু সানোর বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া সেই রকেট গতির শট আলিসনকে পরাস্ত করে জালে জড়াল, গ্যালারির হলুদ সমুদ্রে তখন শ্মশানের নীরবতা। প্রথমার্ধের ক্যাসেমিরোকে দেখে মনে হচ্ছিল, তিনি নিজের ছায়া হয়ে খেলছেন। পাসিংয়ে ভুল, মুভমেন্টে শ্লথতা– ব্রাজিলিয়ান ফুটবল অনুরাগীরা তখন ঈশ্বরের নাম জপ করছেন। ১-০ গোলে পিছিয়ে থেকে যখন কার্লো আনচেলত্তির দল টানেলে ফিরছে, তখন হিউস্টনের আকাশে জাপানের উদীয়মান সূর্যের তেজ স্পষ্ট।
কিন্তু বিরতির পর যা হলো, তাকে নাটকের ভাষায় বলে ‘ক্লাইম্যাক্স’। আনচেলত্তি ড্রেসিংরুমে কী দাওয়াই দিলেন জানা নেই, তবে দ্বিতীয়ার্ধে মাঠের ব্রাজিল যেন এক ক্ষুব্ধ সিংহ। ৫৬ মিনিটে গাব্রিয়েলের এক চমৎকার ক্রস বাতাসে ভাসল, আর সেখানে বাজপাখির মতো উড়ে এসে হেড করলেন সেই সমালোচিত ক্যাসেমিরো! গোল! ১-১। প্রথমার্ধের খলনায়ক এক নিমেষে নায়ক। তখনও ঢাকা থেকে কিছু চেনা মানুষের চিন্তিত টেক্সট– নেইমারকে কখন নামাবে? ব্রাজিল জিতবে কি? অথচ মিডিয়া ট্রিবিউনের চারপাশে বসা ব্রাজিলিয়ানদের চোখে বিন্দুমাত্র চিন্তার ছাপ নেই। তারা বরং সারাক্ষণ গান গেয়ে চলেছেন।
ম্যাচের তখনও মাত্র কয়েক মিনিট বাকি, সঙ্গে নিয়ে আসা ড্রাম বাজাচ্ছেন তারা। আর জাপানিরা তো সুর ধরেছেন সেই ম্যাচের শুরু থেকেই। দুই দলের সমর্থকদের এমন অদ্ভুত শক্তি দেখে মনে হচ্ছিল, এটাই সত্যিকারের ফুটবল; শেষ বিন্দু পর্যন্ত হাল না ছাড়ার মানসিকতা। ম্যাচের শেষ দিকে যত ঘড়ির কাঁটা গড়িয়েছে, নাটকীয়তা তত চড়েছে সপ্তমে। ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের সেই অবিশ্বাস্য সলো রান, ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে নেওয়া শট যখন পোস্টে লেগে ফিরে এলো, তখন পুরো স্টেডিয়াম দাঁড়িয়ে পড়েছে! জাপানও ছাড়েনি। কাউন্টার অ্যাটাকে আইয়াসে উয়েদার শট যখন আলিসন অবিশ্বাস্য দক্ষতায় রুখে দিলেন, বোঝা গেল ম্যাচ রেগুলার টাইমে শেষ হওয়ার নয়।
টানটান উত্তেজনার শেষ লগ্নে, যখন সবাই অতিরিক্ত সময়ের মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখনই আছড়ে পড়ল সেই সাম্বা-ঝড়। ম্যাচের একদম শেষ বাঁশির ঠিক আগে জাপানি ডিফেন্সের সামান্যতম অসতর্কতার সুযোগ নিয়ে ব্রাজিল তুলে নিল সেই কাঙ্ক্ষিত জয়সূচক গোল। জাপানের রূপকথার মতো লড়াই নিমেষেই রূপ নিল ট্র্যাজেডিতে, আর মাঠজুড়ে তখন হলুদের ছড়াছড়ি। তবে সামুরাই ব্লুরা বিদায় নিল মাথা উঁচু করেই; কিন্তু এই ম্যাচ আরও একবার বুঝিয়ে দিয়ে গেল, ফুটবলের সাম্রাজ্যে শেষ কথাটি লিখতে হলে ব্রাজিলের সাম্বা ছন্দেরই প্রয়োজন হয়।
- বিষয় :
- ব্রাজিল
- বিশ্বকাপ ফুটবল
- জাপান
