ইতালির দিনলিপি
`সাইরেনের শব্দ শুনলেই আঁতকে উঠি`
ইতালির বেরগামো শহর। যেখানে এখনও সড়কে জ্বলে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল। শুধু নেই মানুষ আর গাড়ির চলাচল- সংগৃহীত
আতাউর রহমান
প্রকাশ: ০৪ এপ্রিল ২০২০ | ১৪:০৩ | আপডেট: ০৪ এপ্রিল ২০২০ | ১৪:১৪
'দুই শিশুসন্তান আর স্ত্রীসহ পরিবারের লোকজন নিয়ে সব সময় একটা আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হয়। অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন শুনলে আতঙ্কটা আরও বেড়ে যায়। মনে হয়, নতুন কেউ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে, হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে। বাসার অদূরে মূল সড়ক ধরে শাঁ শাঁ করে লাশবাহী আর্মি ট্রাক যায়। ভয়ে বহুদিন বাসার জানালাও খোলা হয় না।' এভাবেই করোনাভাইরাসের কারণে ঘরবন্দি জীবনের কথা বলছিলেন প্রবাসী বাংলাদেশি আবু বকর। ১৩ বছর ধরে ইতালির উত্তরাঞ্চলীয় লম্বার্দি এলাকার বেরগামো শহরে থাকছেন তিনি।
মরণঘাতী করোনাভাইরাসে ইতালিতে শনিবার পর্যন্ত ১৪ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, আক্রান্ত হয়েছেন দেড় লাখের বেশি। এর মধ্যে দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় শহর বেরগামোর অবস্থাটা সবচেয়ে ভয়াবহ। ওই শহরে বহু বাংলাদেশি বসবাস করছেন। তাদেরই কয়েকজনের সঙ্গে ফোনসহ বিভিন্ন অনলাইন যোগাযোগ অ্যাপস ব্যবহার করে সেখানে বসবাসকারী প্রবাসীদের অবস্থান জানার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রবাসীরা বলেছেন, শহরটিতে বাংলাদেশিদের মধ্যে এ পর্যন্ত চারজনের আক্রান্ত হওয়ার খবর তারা পেয়েছেন। তবে চারজনই সুস্থ হয়ে ফিরেছেন।
প্রবাসী আবু বকর বলছিলেন, তারা ভালো আছেন এখনও। পরিস্থিতি আগের চেয়ে অনেকটা উন্নত হলেও সব সময়ই একটা আতঙ্কের মধ্য দিয়ে সময় যাচ্ছে। বাংলাদেশের পরিস্থিতির কথা শুনে তাদের মধ্যে নতুন উদ্বেগ কাজ করছে।
একই শহরে স্বামী-সন্তান নিয়ে থাকেন সুবর্ণা কলি। তিনি বলছিলেন, সাধারণত তিনি বাসাতেই থাকেন। এর পরও মাস খানেক আগে তার জ্বর হয়েছিল। তখন বেশ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। সপ্তাহ খানেকের মধ্যে তিনি সুস্থ হলে বুঝতে পারেন, এটা তার স্বাভাবিক জ্বর ছিল। বেরগামো শহরের সব জায়গাতেই করোনাভাইরাস ছড়িয়েছে। একটু জানালা খুললেই শুধু হাসপাতালমুখী অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন ভেসে ওঠে।
আক্তারুজ্জামান রুবেল ১০ বছর ধরে বেরগামো শহরটিতে বসবাস করে আসছেন। তিনি বলছিলেন, এমন কোলাহলপূর্ণ শহরটা ভয়ঙ্কর ফাঁকা। শহরের বর্গপ্লাসো অ্যাভিনিউতে সব সময় লোকজন আড্ডা দিত। একটা কোলাহল লেগে থাকত। সেই অ্যাভিনিউতে গাছে গাছে বসন্তের ফুল ফুটেছে। কিন্তু পুরো শহরটাই ভূতুড়ে হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, সাধারণত কেউ বাসা থেকে বের হন না। তবে খাবারের দোকান, ওষুধের দোকানগুলো স্বাভাবিক রয়েছে। এত কিছুর মধ্যেও সুপারশপগুলোতে সরবরাহ একেবারেই স্বাভাবিক। তাও স্বাস্থ্যবিধি মেনে সুপারশপে ঢুকতে হয়।
শরীয়তপুরের নড়িয়ার বাসিন্দা এনামুল হক বুলবুল বাংলাদেশে থাকতে ভালো ফুটবল খেলতেন। বেরগামো শহরে তিনি খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী একটি কোম্পানিতে চাকরি করেন। এত কিছুর পরও স্বাস্থ্যবিধি মেনে ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী নিয়েই তিনি কর্মস্থলে যাচ্ছিলেন। কিন্তু হাসপাতালগুলোর দিকে করোনা আক্রান্তদের বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স আর লাশবাহী ট্রাক দেখে ভড়কে যেতে থাকেন। এরপর শেষ দুই সপ্তাহ ছুটি নিয়ে বাসাতেই অবস্থান করছেন।
বেরগামোর সর্বত্র করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়লেও শহরটিতে বাংলাদেশিসহ অন্য দেশের নাগরিকরা ঠিক সেভাবে আক্রান্ত হননি। বিষয়টি নিয়ে কিছুটা ধারণা দিলেন আরেক প্রবাসী লুৎফর রহমান। তিনি বলছিলেন, শুরুর দিকে বেরগামো শহরের স্থানীয়রা বিষয়টি একেবারেই পাত্তা দেয়নি। সরকার স্কুলগুলো ছুটি দিয়ে দিলেও স্থানীয়রা নানা পর্যটন ও বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে ছড়িয়ে যায়। তবে বাংলাদেশিসহ অন্যরা কিন্তু স্থানীয় আইন মেনে আগেই বাসায় অবস্থান করা শুরু করাতে রক্ষা হয়েছে।
স্বামী আর দুই মেয়ে নিয়ে কয়েক বছর ধরে শহরটিতে বসবাস করেন ইয়াসমিন শিখা। চলতি বছরের শুরুর দিকেই তারা সেখানে গেঞ্জিতে ছাপ দেওয়ার কারখানা স্থাপন করেছিলেন। কিন্তু এখন সবকিছুই বন্ধ হয়ে গেছে। শিখা বলছিলেন, বাসায় বন্দি থেকে সব সময় তারা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন, যাতে দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
