সুর ও নৃত্যের ছন্দে বাফার ছয় যুগ পূর্তি উদযাপন
ছবি: সমকাল/দ্রোহী তারা
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬ | ২৩:৩৩
ইট-পাথরের ব্যস্ত নগরী ঢাকা যখন গোধূলির আলোয় রাঙা হচ্ছিল, ঠিক তখনই সেগুনবাগিচার নাট্যশালা প্রাঙ্গণে জমেছিল এক অন্য রকম সুরের মেলা। ১৯৫৫ সালের সেই চেনা সুরের ধারা, যা উনবিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশের দশক থেকে ললিতকলা শিক্ষা ও চর্চায় নিরলস আলো ছড়িয়ে আসছে, তা যেন শুক্রবার আরও একবার নতুন যৌবনে মেতে উঠেছিল। উপলক্ষটা ছিল বাঙালি সংস্কৃতির বাতিঘর ‘বুলবুল একাডেমি অব ফাইন আর্টস’ (বাফা) তথা ‘বুলবুল ললিতকলা একাডেমি’র ৬ যুগ (৭২ বছর) পূর্তির এক বর্ণাঢ্য উৎসব।
শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৩টায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে বসেছিল এই আসর। উৎসবের আমেজ শুধু মঞ্চেই সীমাবদ্ধ ছিল না; মিলনায়তনে প্রবেশের পথেই অতিথিদের স্বাগত জানায় একাডেমির চারুকলা ও চিত্রাঙ্কন বিভাগের প্রধান শাহীন আক্তার এবং সিনিয়র শিক্ষক নয়ন কুমার অধিকারীর নিখুঁত তত্ত্বাবধানে তৈরি শিক্ষার্থীদের আঁকা এক চমৎকার চিত্রপ্রদর্শনী। প্রতিটি ক্যানভাসে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এবং বাফা প্রাঙ্গণকে রঙের রেখায় ফুটিয়ে তুলেছে শিক্ষার্থীরা। পুরো আয়োজনটি উৎসর্গ করা হয় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রতি।
বাফার সভাপতি মো. ছাদুল্লাহর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়ে সংস্কৃতির বিকাশ ও বাফার অবদানের কথা স্মরণ করেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক রেজাউদ্দিন স্টালিন। অনুষ্ঠানের শুরুতেই স্বাগত বক্তব্যে বাফা সম্পাদক ফজলুর রহমান এই দীর্ঘ ৭২ বছরের লড়াই ও অর্জনের ইতিহাস তুলে ধরেন। শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করেন উৎসব উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক নূরুর রহমান পলাশ, সদস্য সচিব সফিকুর রহমান সবুজসহ একাডেমির সহসভাপতিবৃন্দ ও শিক্ষক সমিতির নেতারা।
আলোচনার আনুষ্ঠানিকতা শেষে শুরু হয় মূল আকর্ষণ—বাফার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মেলবন্ধনে তৈরি এক জাদুকরী সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা। প্রথম পর্বে পরিবেশিত হয় ধ্রুপদী কিছু উপস্থাপনা। সফিকুর রহমান সবুজ ও প্রদীপ সরকারের পরিচালনায় ‘দাও ধৈর্য দাও ধৈর্য’ গানের সমবেত সুর শ্রোতাদের আবিষ্ট করে। এর পরই অনিক বোসের পরিচালনায় ‘সুজন ছন্দে আনন্দে’ নাচের মুদ্রা দর্শক সারিতে করতালির জোয়ার আনে। একে একে পরিবেশিত হয় দীনদার হোসেন মোড়লের পরিচালনায় ‘ও মদিনা’ এবং খন্দকার খায়রুজ্জামান কাইয়ুমের পরিচালনায় ‘অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো’র মতো চমৎকার সব দলীয় গান। সেই সঙ্গে সোহেল রহমানের দলীয় নাচ এবং সাজু আহমেদের পরিচালনায় কত্থক নৃত্যের ব্যাকরণগত সৌন্দর্য যেন মঞ্চে এক স্বর্গীয় আবহ তৈরি করে।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মূল পর্বে বাফার বিভিন্ন শাখার শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের নিবেদনে একে একে মঞ্চস্থ হয় ৪৪টি চোখধাঁধানো পরিবেশনা, যার প্রতিটি পর্বের পেছনে ছিল নিখুঁত তাল ও দীর্ঘ সাধনার ছাপ। ইতি চক্রবর্তীর পরিচালনায় ‘মন মোর মেঘের সঙ্গী’ এবং ইমতিয়াজ আহমেদের ‘প্রাণের বন্ধুরা যায় রে’ গান দুটি যেন এক চিলতে গ্রামীণ উদাসীনতা এনে দিয়েছিল নাগরিক মঞ্চে। তাহরিমা রহমান তরঙ্গ, মোহসিনা রহমান মিলা ও মোস্তারিয়া রহমান অনুর যৌথ পরিচালনায় ‘নাও ছাড়িয়া দে পাল উড়াইয়া দে ও তাতাতিনি’ ছিল এক চমৎকার নৌকাবাইচের নান্দনিক রূপক। বর্ষা কর্মকারের ‘হলুদ গাঁদার ফুল’ এবং তাপস চক্রবর্তী তপুরের ‘ওরে গৃহবাসী’ গানে ছিল উৎসবের ছোঁয়া। আষাঢ়ের এই লগ্নে প্রভাতী সাহার পরিচালনায় ‘মুক্ত মালার ছাতি মাথায় বর্ষা এলো রে’ এবং অঞ্জন দাসের ‘কলকল ছলছল নদী করে টলমল’ গান দুটি যেন মিলনায়তনেই এক পশলা মেঘের ছায়া ফেলে যায়। মো. রাকিব হাসানের ‘উজান বাইয়া যাইও মাঝি’, সামিনা খানম শৈলীর ‘সংকোচের বিহ্বলতা’, এবং শাহীনুর রেজা ও বর্ণনা মণ্ডলের ‘বাউকুমটা বাতাস যেমন’ গানগুলো ছিল মাটির গন্ধে ভরপুর। শামীমা তন্দ্রা ও তরুণ রাসেলের নির্দেশনায় দলীয় আবৃত্তি শ্রোতাদের মনে গভীর ভাবনার উদ্রেক করে।
মঞ্চে বৈচিত্র্যের কমতি ছিল না; প্রদীপ সরকারের পরিচালনায় ‘কদমতলায় মেলা বসেছে’ এবং পূজা সোমের ‘বাগিচায় বুলবুলি তুই’ পরিবেশনাগুলো যখন চলছিল, তখন দর্শকদের উচ্ছ্বাস ছিল দেখার মতো। নজর কাড়ে রুদাভা তাসনিম নিঝুমের ‘মোরা ঝঞ্ঝার মত উদ্দাম’ এবং আমিরুল ইসলাম মনির ‘রুমঝুম রুমঝুম খেজুর পাতায় নূপুর বাজায়’ নাচ দুটি। কেবল গান আর নাচই নয়, বাদ্যযন্ত্রের পরিবেশনাগুলো ছিল এই আয়োজনের অন্যতম প্রধান শক্তি। আশরাফ মাহমুদ উজ্জ্বলের পরিচালনায় দলীয় গিটার পরিবেশনা, চেঙ্গিস খানের পরিচালনায় নিখুঁত স্প্যানিশ গিটার, তৌহিদুল আলম খান সনেটের পরিচালনায় আরেকটি অনন্য গিটার বাদন এবং আবুল হোসেন সরকারের পরিচালনায় দলীয় বেহালার সুরের মূর্ছনা নাট্যশালাকে যেন এক ধ্রুপদী কনসার্ট হলে রূপান্তর করে। এ ছাড়া ইমদাদুল রহমান মিলনের পরিচালনায় ‘মিউজিক ফিউশন’ ছিল আধুনিক ও ক্লাসিক্যালের এক অপূর্ব মিশ্রণ। লাবণ্য আনসারী, বৈশাখী মজুমদার ও পার্থপ্রতীম দাসের কত্থক নৃত্যও দর্শকদের মনে গভীর দাগ কেটে যায়।
সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার একদম শেষলগ্নে মঞ্চে ওঠে সমাপনী পরিবেশনা। শাহীনের পরিচালনায় সমবেত কণ্ঠে বেজে ওঠে ‘বাংলাদেশ বাংলাদেশ আমরা বাংলাদেশী’। এই একটি গানের সুরে যেন মিশে ছিল বাফার ৭২ বছরের দেশপ্রেম আর শুদ্ধ সংস্কৃতির সাধনা।
- বিষয় :
- বাফা
