করোনা জয়ের গল্প
'খুনির চেয়েও ভয়ংকর'
×
সাহাদাত হোসেন পরশ
প্রকাশ: ০৩ মে ২০২০ | ১২:০০
'আপনি হয়তো দুর্ধর্ষ কোনো খুনির কাছ থেকে দৌড়ে পালিয়ে বাঁচতে পারবেন। অস্ত্র দিয়ে তাকে গুলি করে পরাভূত করতে পারবেন। কিন্তু নিজে নিয়ম মেনে না চললে করোনা নামের অদৃশ্য এই শত্রুকে মোকাবিলা করা যাবে না। তখন এই শত্রু খুনির চেয়ে ভয়ংকর হতে পারে। তাই পুলিশ ভাইসহ সকলের প্রতি অনুরোধ- নিজে সুরক্ষিত থাকুন। করোনা থেকে বাঁচতে যেসব নিয়ম পালনের কথা বলা হয়েছে তা অবশ্যই মেনে চলুন।' করোনাজয়ী পুলিশ সদস্য উপ-পরিদর্শক সাইদুল ইসলাম খান গতকাল রোববার সমকালের কাছে তার এমন অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন।
পুলিশ বাহিনীতে প্রতিদিনই করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সংক্রমিত হয়েছেন ১১৩ পুলিশ সদস্য। সব মিলিয়ে গতকাল রোববার পর্যন্ত পুলিশে সংক্রমিত হন ৮৫৪ জন। তাদের মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ৫৭ জন। আক্রান্তদের মধ্যে ৪৪৯ জন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি)। এ ছাড়া কোয়ারেন্টাইনে আছেন এক হাজার ২৫০ জন। আইসোলেশনে ৩১৫ জন। এখন পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৫ পুলিশ সদস্য।
করোনাজয়ী সাইদুল জানান, তিনি শেরপুরের ঝিনাইগাতি থানায় কর্মরত আছেন। ওই থানায় প্রথমে অফিসার ইনচার্জের করোনা শনাক্ত হয়। তারা তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে থানায় ও বাইরে দিনরাত মিলিয়ে ডিউটি করেন। তবে বাইরে ডিউটি না করেও করোনায় আক্রান্ত হন তিনি। থানার ১৩ সদস্যের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছিল। ওই পরীক্ষায় সাইদুলসহ দু'জনের করোনা সংক্রমিত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়। এরপর ওই দু'জনকে ভর্তি করা হয় ঝিনাইগাতী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সেখানে ১৪ দিন চিকিৎসা নেওয়ার পর গতকাল তারা করোনাজয়ী হিসেবে ছাড়পত্র পেয়েছেন।
সাইদুল জানান, তার গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের ত্রিশালে। এক ছেলে, এক মেয়ে ও স্ত্রীসহ যৌথ পরিবারে বসবাস করেন তিনি। তবে করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর প্রথম দু'দিন এ নিয়ে পরিবারের কারও সঙ্গে কথা বলেননি। এলাকায় বিষয়টি জানাজানি হলে পরিবারের লোকজনই তাকে ফোন করেন। পরিবারের কেউ যেন ভেঙে না পড়েন সে জন্য দৃঢ়তার সঙ্গে তাদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি।
সাইদুল জানান, হাসপাতালে তাকে আইসোলেশন ওয়ার্ডে রাখা হয়। প্রথম কয়েকদিন খুব একা একা লাগত। এরপর বই ও নামাজ পড়ে তার সময় কাটে। শরীরে করোনার তেমন কোনো উপসর্গও ছিল না। চিকিৎসকরা দূর থেকে এসে সেবা দিতেন। আর প্রায়ই ফোন করতেন। নিজেই থার্মোমিটার দিয়ে কিছু সময় পরপর জ্বর মাপতেন।
সাইদুল বলেন, ২৯ বছর পুলিশে চাকরি করছি। করোনা হয়ে হাসপাতালে ভর্তির পর ইউনিট প্রধান হিসেবে জেলার পুলিশ সুপারের কাছ থেকে যে ধরনের সহযোগিতা পেয়েছি তা বিরল। প্রতিদিন একাধিকবার ফোন করে নিজে থেকে খোঁজ নিতেন স্যার। হাসপাতালে প্রত্যেকদিন কয়েক ধরনের ফল পাঠাতেন। নিজে হাসপাতালে এসে দেখে গেছেন। সহকর্মী হিসেবে এমন ভালোবাসা পাওয়ায় মানসিক শক্তি আরও বেড়েছে। জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে আমার পরিবারেরও নিয়মিত খোঁজ নেওয়া হতো।
সমকালের কাছে করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পরবর্তী সময়ের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন করোনাজয়ী আরেক পুলিশ সদস্য এসআই তোফায়েল। তিনিও শেরপুরের ঝিনাইগাতি থানায় কর্মরত এবং গতকাল মুক্তির ছাড়পত্র হাতে পেয়েছেন। তোফায়েল জানান, নিজের শরীরে করোনা শনাক্ত হওয়ার আগে একজন করোনা রোগীকে হাসপাতাল পৌঁছে দিয়েছিলেন তিনি। ওই রোগী হাসপাতালে যেতে রাজি না হওয়ায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পুলিশের সহায়তা চায়। পরে ওই রোগীকে অনেক বুঝিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করেন তিনি। তোফায়েলের ধারণা, ওই রোগীর কাছ থেকেই করোনা হয়েছে তার।
তোফায়েল জানান, দুই মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে তার ছোট্ট সংসার। বড় মেয়ে শারিন ইসলাম প্রিয়ন্তি। ছোট মেয়ে প্রিয়তা। প্রিয়ন্তি পড়ে পঞ্চম শ্রেণিতে। আর প্রিয়তা নার্সারিতে। অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তির পর প্রিয়তা তার বাবাকে মেসেঞ্জারে প্রায়ই তাকে নিয়ে লেখা গান শোনাত। ছোট মেয়ে বায়না ধরত, কবে চকলেট নিয়ে তিনি বাসায় ফিরবেন।
কথায় কথায় তোফায়েল জানান, হাসপাতালে আইসোলেশন ওয়ার্ডে রাতে একটু ভয় ভয় লাগত তার। কারণ আশপাশে কেউ নেই। তখন মনকে বোঝাতেন, পুলিশের সদস্য হিসেবে কোনো বড় অপারেশনে গেলে হয়তো এর চেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে পড়তে হতো। তবে হাসপাতালে থাকার সময় ডাক্তারদের পরামর্শ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন তিনি। নিয়মিত গরম পানি খেয়েছেন, গরম পানি দিয়ে গোসল সেরেছেন, আদা-রসুন খেয়েছেন। ডাক্তারের পরামর্শে সব ধরনের স্বাস্থ্যকর খাবার খেয়েছেন। সময় কাটাতে বাসায় প্রায়ই ভিডিও কল করেছেন।
হাসপাতালে ভর্তির দু'দিন পর এক ভোররাতের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন তোফায়েল। তিনি জানান, ভোররাতে হঠাৎ তার মনে হয় হাত-পা অবশ হয়ে আসছে। শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, অল্প সময়ের মধ্যে মারা যাবেন তিনি। এমন পরিস্থিতিতে ভোররাতেই জেলা পুলিশ সুপারের মোবাইল নম্বরে ফোন করে তার খারাপ লাগার কথা জানান। এরপর ফোনের ওপাশ থেকে জেলা পুলিশ সুপার তাকে মানসিকভাবে শক্ত থাকতে বেশ কিছু পরামর্শ দেন। দ্রুত ডাক্তার পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।
তোফায়েলের পরামর্শ- করোনা থেকে দ্রুত সেরে উঠতে চাইলে কাউন্সেলিং খুব গুরুত্বপূর্ণ। সহকর্মী, পরিবার ও আশপাশের লোকজনের ইতিবাচক কথা এই সময়ে টনিকের মতো কাজ করে। তোফায়েল এও জানালেন, করোনামুক্তির ছাড়পত্র পাওয়ার পর জেলা পুলিশ ও চিকিৎসকরা তাকে স্বাগত জানিয়েছেন। আগামী ১৪ দিন কিছু নিয়ম মানার পর আবার পরিপূর্ণভাবে স্বাভাবিক জীবন শুরু করতে পারবেন তিনি।
পুলিশ বাহিনীতে প্রতিদিনই করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সংক্রমিত হয়েছেন ১১৩ পুলিশ সদস্য। সব মিলিয়ে গতকাল রোববার পর্যন্ত পুলিশে সংক্রমিত হন ৮৫৪ জন। তাদের মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ৫৭ জন। আক্রান্তদের মধ্যে ৪৪৯ জন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি)। এ ছাড়া কোয়ারেন্টাইনে আছেন এক হাজার ২৫০ জন। আইসোলেশনে ৩১৫ জন। এখন পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৫ পুলিশ সদস্য।
করোনাজয়ী সাইদুল জানান, তিনি শেরপুরের ঝিনাইগাতি থানায় কর্মরত আছেন। ওই থানায় প্রথমে অফিসার ইনচার্জের করোনা শনাক্ত হয়। তারা তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে থানায় ও বাইরে দিনরাত মিলিয়ে ডিউটি করেন। তবে বাইরে ডিউটি না করেও করোনায় আক্রান্ত হন তিনি। থানার ১৩ সদস্যের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছিল। ওই পরীক্ষায় সাইদুলসহ দু'জনের করোনা সংক্রমিত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়। এরপর ওই দু'জনকে ভর্তি করা হয় ঝিনাইগাতী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সেখানে ১৪ দিন চিকিৎসা নেওয়ার পর গতকাল তারা করোনাজয়ী হিসেবে ছাড়পত্র পেয়েছেন।
সাইদুল জানান, তার গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের ত্রিশালে। এক ছেলে, এক মেয়ে ও স্ত্রীসহ যৌথ পরিবারে বসবাস করেন তিনি। তবে করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর প্রথম দু'দিন এ নিয়ে পরিবারের কারও সঙ্গে কথা বলেননি। এলাকায় বিষয়টি জানাজানি হলে পরিবারের লোকজনই তাকে ফোন করেন। পরিবারের কেউ যেন ভেঙে না পড়েন সে জন্য দৃঢ়তার সঙ্গে তাদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি।
সাইদুল জানান, হাসপাতালে তাকে আইসোলেশন ওয়ার্ডে রাখা হয়। প্রথম কয়েকদিন খুব একা একা লাগত। এরপর বই ও নামাজ পড়ে তার সময় কাটে। শরীরে করোনার তেমন কোনো উপসর্গও ছিল না। চিকিৎসকরা দূর থেকে এসে সেবা দিতেন। আর প্রায়ই ফোন করতেন। নিজেই থার্মোমিটার দিয়ে কিছু সময় পরপর জ্বর মাপতেন।
সাইদুল বলেন, ২৯ বছর পুলিশে চাকরি করছি। করোনা হয়ে হাসপাতালে ভর্তির পর ইউনিট প্রধান হিসেবে জেলার পুলিশ সুপারের কাছ থেকে যে ধরনের সহযোগিতা পেয়েছি তা বিরল। প্রতিদিন একাধিকবার ফোন করে নিজে থেকে খোঁজ নিতেন স্যার। হাসপাতালে প্রত্যেকদিন কয়েক ধরনের ফল পাঠাতেন। নিজে হাসপাতালে এসে দেখে গেছেন। সহকর্মী হিসেবে এমন ভালোবাসা পাওয়ায় মানসিক শক্তি আরও বেড়েছে। জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে আমার পরিবারেরও নিয়মিত খোঁজ নেওয়া হতো।
সমকালের কাছে করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পরবর্তী সময়ের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন করোনাজয়ী আরেক পুলিশ সদস্য এসআই তোফায়েল। তিনিও শেরপুরের ঝিনাইগাতি থানায় কর্মরত এবং গতকাল মুক্তির ছাড়পত্র হাতে পেয়েছেন। তোফায়েল জানান, নিজের শরীরে করোনা শনাক্ত হওয়ার আগে একজন করোনা রোগীকে হাসপাতাল পৌঁছে দিয়েছিলেন তিনি। ওই রোগী হাসপাতালে যেতে রাজি না হওয়ায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পুলিশের সহায়তা চায়। পরে ওই রোগীকে অনেক বুঝিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করেন তিনি। তোফায়েলের ধারণা, ওই রোগীর কাছ থেকেই করোনা হয়েছে তার।
তোফায়েল জানান, দুই মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে তার ছোট্ট সংসার। বড় মেয়ে শারিন ইসলাম প্রিয়ন্তি। ছোট মেয়ে প্রিয়তা। প্রিয়ন্তি পড়ে পঞ্চম শ্রেণিতে। আর প্রিয়তা নার্সারিতে। অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তির পর প্রিয়তা তার বাবাকে মেসেঞ্জারে প্রায়ই তাকে নিয়ে লেখা গান শোনাত। ছোট মেয়ে বায়না ধরত, কবে চকলেট নিয়ে তিনি বাসায় ফিরবেন।
কথায় কথায় তোফায়েল জানান, হাসপাতালে আইসোলেশন ওয়ার্ডে রাতে একটু ভয় ভয় লাগত তার। কারণ আশপাশে কেউ নেই। তখন মনকে বোঝাতেন, পুলিশের সদস্য হিসেবে কোনো বড় অপারেশনে গেলে হয়তো এর চেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে পড়তে হতো। তবে হাসপাতালে থাকার সময় ডাক্তারদের পরামর্শ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন তিনি। নিয়মিত গরম পানি খেয়েছেন, গরম পানি দিয়ে গোসল সেরেছেন, আদা-রসুন খেয়েছেন। ডাক্তারের পরামর্শে সব ধরনের স্বাস্থ্যকর খাবার খেয়েছেন। সময় কাটাতে বাসায় প্রায়ই ভিডিও কল করেছেন।
হাসপাতালে ভর্তির দু'দিন পর এক ভোররাতের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন তোফায়েল। তিনি জানান, ভোররাতে হঠাৎ তার মনে হয় হাত-পা অবশ হয়ে আসছে। শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, অল্প সময়ের মধ্যে মারা যাবেন তিনি। এমন পরিস্থিতিতে ভোররাতেই জেলা পুলিশ সুপারের মোবাইল নম্বরে ফোন করে তার খারাপ লাগার কথা জানান। এরপর ফোনের ওপাশ থেকে জেলা পুলিশ সুপার তাকে মানসিকভাবে শক্ত থাকতে বেশ কিছু পরামর্শ দেন। দ্রুত ডাক্তার পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।
তোফায়েলের পরামর্শ- করোনা থেকে দ্রুত সেরে উঠতে চাইলে কাউন্সেলিং খুব গুরুত্বপূর্ণ। সহকর্মী, পরিবার ও আশপাশের লোকজনের ইতিবাচক কথা এই সময়ে টনিকের মতো কাজ করে। তোফায়েল এও জানালেন, করোনামুক্তির ছাড়পত্র পাওয়ার পর জেলা পুলিশ ও চিকিৎসকরা তাকে স্বাগত জানিয়েছেন। আগামী ১৪ দিন কিছু নিয়ম মানার পর আবার পরিপূর্ণভাবে স্বাভাবিক জীবন শুরু করতে পারবেন তিনি।
- বিষয় :
- করোনা