ঢাকা বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬

করোনা জয়ের গল্প

শরীরে ভাইরাস নিয়েও থামেনি লড়াই

শরীরে ভাইরাস নিয়েও থামেনি লড়াই
×

রাশেদ মেহেদী

প্রকাশ: ০৩ মে ২০২০ | ১২:০০

যখন দেশের বাইরে থেকে করোনা সংক্রমণের খবর আসছিল প্রতিদিন, তখন থেকেই এ রোগটি সম্পর্কে জানার আগ্রহ ছিল তার। ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগীর অস্তিত্ব সরকারের সংক্রামক রোগতত্ত্ব বিভাগ থেকে ঘোষণা দেওয়ার আগেই এই ভাইরাসের সংক্রমণ এবং দেশে দেশে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা সম্পর্কেও মোটমুটি জানাশোনা হয়ে গিয়েছিল তার। তিনি নিজেকে ভেতর থেকে প্রস্তুতও করছিলেন মহামারির বিরুদ্ধে মানবতার ডাকে সাড়া দিতে। এরপর দেশে যখন করোনা রোগীদের পাশে দাঁড়ানোর প্রশ্ন উঠল, তিনি এগিয়ে গেছেন সবার আগে। গত সপ্তাহে তিনি নিজেই সংক্রমিত হয়েছেন। কিন্তু এখনও যুদ্ধে পিছিয়ে যাননি। চিকিৎসার প্রয়োজনে একা বিচ্ছিন্ন থাকলেও যতটা সম্ভব চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন অনলাইনে। এই মানুষটি ডা. মোস্তফা কামাল রউফ।
তিনি জানালেন, চিকিৎসা বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে বরাবরই রোগতত্ত্ব নিয়ে তার আগ্রহ বেশি। যখন চীনে প্রথম কভিড-১৯ সংক্রমণের কথা জানা গেল, তখন তিনি এই ভাইরাস সংক্রমণ সম্পর্কে খোঁজ-খবর নেওয়া, পড়ালেখাও শুরু করলেন। শুরুতে তার ধারণা ছিল, এটির সংক্রমণ হয়ত খুব বেশি বিস্তৃত হবে না। কিন্তু তার ধারণা সত্য হলো না। এটি চীন থেকে অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়ল। বাংলাদেশেও ছড়ানোর আশঙ্কা প্রবল হতে থাকল। বিষয়টি নিয়ে তখন ভেতরে ভেতরে আলাপ-আলোচনা চলছিল। বাংলাদেশে সংক্রমণ হলে বর্তমান ব্যবস্থার মধ্যে কীভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব, কী কী ব্যবস্থা নিতে হবে, আলাপ-আলোচনার পর্যায়ে ছিল এসব। তার কর্মস্থল সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে বসে সহকর্মীদের মধ্যে আলোচনা চলছিল।
আলাপ-আলোচনার মধ্যেই বিদেশফেরত একজন আইইডিসিআর-এ এসেছিলেন গলাব্যথা ও জ্বর নিয়ে। তার অনুরোধে পরীক্ষার পর ফল পজিটিভ এলো। ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিল আইইডিসিআর। ডা. রউফ জানান, সেই ৮ মার্চেই তিনি তার দুই সন্তানকে মামার বাড়ি পাঠিয়ে দেন। কারণ তিনি যেহেতু হাসপাতালে চিকিৎসা দেন এবং করোনা রোগী এলেও চিকিৎসা দেবেন বলে মানসিক প্রস্তুতি নিয়েছেন, সে কারণেই প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই সেখানে পাঠান তাদের।
রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালেও খোলা হয় করোনা রোগীদের জন্য পৃথক আইসোলেশন ওয়ার্ড। এই ওয়ার্ডের দায়িত্ব কাকে দেওয়া হবে, তা নিয়ে কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালের কনসালট্যান্ট (মেডিসিন) ডা. রউফ সে দ্বিধা কাটিয়ে নিজেই কর্তৃপক্ষকে জানান, তিনি এই ওয়ার্ডের দায়িত্ব নিতে রাজি আছেন। তার ওপর দায়িত্ব পড়ল। পাশাপাশি সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে আর একটি ফ্লু ওয়ার্ড আছে,
যেখানে সর্দি-কাশি-জ্বরের রোগীদের চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত। সেখানে মূল দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকের পাশাপাশি ডা. রউফকেও অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হলো। এখানেই শেষ নয়, 'লালকুঠি ইউনিট' নামে করোনা রোগীদের জন্য আরও একটি করোনা ইউনিট সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের তত্ত্বাবধানে পরিচালনার জন্য অন্তর্ভুক্ত করা হলো। ডা. রউফকে সেই ইউনিটেরও দায়িত্ব দেওয়া হলো। শুরু হলো সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত করোনায় আক্রান্তদের সঙ্গে দিনযাপন! ডা. রউফের সঙ্গে দু'জন মেডিকেল অফিসার। তাদের চিকিৎসার মূলমন্ত্র একটিই- রোগীকে মানসিক শক্তিতে ভরপুর রাখা। সেই কাজ করতে গিয়ে নিজেদের আরও বেশি আত্মবিশ্বাসী হতে হয়।
করোনা আক্রান্তদের সেবা দিতে দিতেই ডা. রউফ নিজের ভেতরে করোনার উপসর্গ টের পান। পরীক্ষা করান। গত ১৯ এপ্রিল তার শরীর থেকে নমুনা নেওয়া হয়। এ দিন থেকেই তিনি বাসায় আইসোলেশনে। একটি কক্ষে নিজেকে আবদ্ধ করেন। তখন থেকে তার স্ত্রী অন্য ঘরে পৃথকভাবে অবস্থান করছেন। পরীক্ষার এক দিন পর জানতে পারেন-পজিটিভ। প্রথম দিকে গলাব্যথা ছিল, শুকনো কাশি ছিল। ম্যাজম্যাজ ভাব ছিল গায়ে। এক সপ্তাহ পার হওয়ার পর এখন গলাব্যথা নেই, শুকনো কাশিও নেই। শারীরিক দুর্বলতাও আর অনুভব করছেন না। বলা যায় এখন সুস্থ। তার নিজের বিবেচনায় যথেষ্ট রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার কারণেই দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠেছেন তিনি।
ডা. রউফ বলেন, 'এখন হয়তো নিজেকে আলাদা রাখা যায়, বিচ্ছিন্ন রাখা যায় না। কারণ অনলাইনে সবার সঙ্গেই যোগাযোগ হচ্ছে। অনেক রোগী যারা আমার অধীনে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন, অনলাইনে দেখাশোনা করছি তাদের। তথ্য দিচ্ছেন, পরামর্শ নিচ্ছেন। করোনামুক্ত হয়ে আবারও রোগীদের পাশে যেতে চাই।'
করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর সহকর্মী, পরিজন, প্রতিবেশীদের ভূমিকা সম্পর্কে ডা. রউফ জানান, আসলে তিনিসহ তার সঙ্গে থাকা আরও দু'জন মেডিকেল অফিসারও পরীক্ষায় পজিটিভ প্রমাণিত হন। এ সময় হাসপাতালের সহকর্মীরা তাদের চিকিৎসাসহ অন্যান্য ব্যবস্থার বিষয়ে প্রয়োজনীয় সব সহায়তা দিয়েছেন। তার স্ত্রী তাকে সাহস দিয়েছেন। বিশেষ করে তিান ভাগ্যবান যে, তার বাড়িওয়ালা খবর পাওয়ার পর নিজেই ফোন করে খোঁজ নিয়েছেন। কোনো সমস্যা হলে তাকে সঙ্গে সঙ্গে জানাতে বলেছেন। এই সময়ে বাড়িওয়ালার ভূমিকা তার করোনা মোকাবিলায় সবচেয়ে বেশি শক্তি দিয়েছে। যে শক্তি তার অন্য দু'জন সহকর্মী পাননি। তারা বাড়িওয়ালাকে বিষয়টি জানাতেই পারেননি, কারণ তারা নিয়মিত হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করছেন, বাড়িওয়ালা সেটিই ভালো চোখে দেখেননি। অতএব তারা আক্রান্ত হওয়ার কথা বাড়িওয়ালাকে জানাতে পারেননি। এ কারণে তাদের আইসোলেশনে থাকতে বাড়তি কষ্টই পোহাতে হয়।
প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী ডা. রউফ বলেন, 'করোনাভাইরাস সংক্রমণে ৮০ শতাংশ রোগীর হাসপাতালে নেওয়ারই দরকার হয় না। বাসায় রেখেই চিকিৎসা দেওয়া যায়। ২০ শতাংশের মধ্যে ১৬ শতাংশকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও তারা সাধারণ চিকিৎসায় সুস্থ হন। বাকি চার শতাংশের অবস্থা থাকে গুরুতর। এদের জন্য খুব জরুরি হয়ে পড়ে অক্সিজেন। কারণ তারা তীব্র শ্বাসকষ্টে ভোগে। অতএব অক্সিজেন, অক্সিজেন এবং অক্সিজেনই তাদের বাঁচাতে বড় ভূমিকা রাখে। এই চার শতাংশকে একশ' ভাগ ধরলে সত্তর ভাগ মারা যায়। অতএব করোনা আক্রান্ত ৯৭ শতাংশই সুস্থ হন, এটাই প্রমাণিত। এ কারণে করোনা পজিটিভ হলেই ভয় পাওয়ার দরকার নেই। বরং এখন জ্বর-ঠান্ডা বোধ হলে, শুকনো কাশি থাকলে বেশি করে গরম পানি খাওয়া দরকার। গরম পানিতে গার্গল করা এবং গরম পানির ভাপ নেওয়া দরকার। কারণ ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে এই ভাইরাস দুর্বল হতে থাকে এবং ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে মারা যায়। এ কারণে বার বার গরম পানি ও গরম পানির গার্গল এ ভাইরাসকে আক্রমণের শুরুতেই দুর্বল করতে পারে। বেশি করে ফলমূল ও প্রোটিন জাতীয় খাবার বেশি খাওয়া দরকার। কারণ শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যত বেশি হবে, তত দ্রুত আপনার শরীর ভাইরাসের আক্রমণ প্রতিহত করে ভাইরাসমুক্ত করবে আপনাকে।'

আরও পড়ুন

×