ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬

ওদের খবর কেউ রাখে না

ওদের খবর কেউ রাখে না
×

গাড়ির লাগেজবক্সে ঘুম আর বাইরের খোলা জায়গায় রান্নাবান্না- এভাবেই কাটছে এখন সায়েদাবাদে আটকেপড়া পরিবহন শ্রমিকদের দিন - মাহবুব হোসেন নবীন

রাজীব আহাম্মদ

প্রকাশ: ১২ মে ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০

মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন পরিবহন শ্রমিকরা। করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে গণপরিবহন বন্ধ থাকায় বাসসহ অন্যান্য যাত্রীবাহী যানের চালক শ্রমিকরা ৪৮ দিন ধরে বেকার। মোট শ্রমিকের একটি ছোট অংশ টার্মিনালে বাসের মধ্যে রাতদিন ২৪ ঘণ্টা থেকে পাহারা দিয়ে দৈনিক ৩০০ থেকে ২০০ টাকা খোরাকি পাচ্ছেন। বাকিদের কানাকড়িও আয় নেই। তাদের দিন কাটছে অনাহারে।
শ্রমিকদের এমন দুর্দিনে পরিবহন নেতারা গত দেড় মাসে তাদের খোঁজখবর নেওয়া দূরের কথা, টার্মিনালেও একবার উঁকি দেননি। প্রায় শতভাগ শ্রমিকের অভিযোগ, গাড়ির মালিকের কাছ থেকে খোরাকি বাবদ কিছু পেলেও একটি টাকাও সহায়তা পাননি নেতাদের কাছ থেকে। তবে পরিবহন নেতাদের দাবি, ঢালাও অভিযোগ ঠিক নয়। তারা যথাসাধ্য করছেন।
কিন্তু সরেজমিন চিত্রের সঙ্গে নেতাদের বক্তব্য মিলছে না। গত সোমবার পর্যায়ক্রমে সায়েদাবাদ ও মহাখালী বাস টার্মিনালে যাওয়ার পর কয়েকজন পরিবহন শ্রমিক ঘিরে ধরেন সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে।
তাদের দাবি, শ্রমিকরা সরকার, মালিক, নেতা কারও থেকে সহায়তা পাচ্ছেন না- এ কথা তুলে ধরতে হবে গণমাধ্যমে।
গত মাসে সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী জানিয়েছিলেন, সায়েদাবাদ টার্মিনালে শ্রমিকদের ১০ কেজি করে চালসহ খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু রোববার ঘিরে ধরা শ্রমিকরা বললেন, এমন কোনো সহায়তার নাম-গন্ধও তারা পাননি। নেতারা ত্রাণ দিয়ে থাকলেও দিয়েছেন চুপিসারে কিংবা মুখচেনা লোকদের ইউনিয়নের অফিস থেকে।
মোবাইলে ওয়েদারডটকম রোববার দুপুর আড়াইটায় সায়েদাবাদের তাপমাত্রা দেখাচ্ছিল ৩৬ ডিগ্রি। আর 'রিয়েল ফিল' ছিল ৪২ ডিগ্রি। মাসখানেক ধরে খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকা বাসের ভেতরের তাপমাত্রা কোনোভাবেই ৫০ ডিগ্রির কম নয়। গরম সইতে না পেরে পরিবহন শ্রমিক জসিম উদ্দিন ফরাজী বাসের নিচে মালামালের বক্সে গামছা বিছিয়ে শুয়েছিলেন। করোনা সংকট শুরুর পর সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে গত দেড় মাস এভাবে দিন কাটাচ্ছেন ৫৫ বছর বয়সী এই পরিবহন শ্রমিক। দিনরাত ২৪ ঘণ্টা বাস পাহারা দিয়ে পান দৈনিক ২০০ টাকা।
সংবাদপত্র বিক্রির কাজ ছেড়ে বেশি আয়ের আশায় প্রায় ১৫ বছর আগে পরিবহন খাতে এসেছিলেন কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের জসিম ফরাজি। ঢাকা-চট্টগ্রামের সিডিএম পরিবহনে চালকের সহকারী হিসেবে কাজ করেন। দিনে আটশ' থেকে হাজার টাকা পেতেন। সেই আয় এখন নেমেছে ২০০ টাকায়।
জসিম ফরাজি বললেন, কোনো শ্রমিকই এমন দুর্দিনের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। এ কারণে সবাই গণহারে বিপদে পড়েছেন। প্রত্যেক বাসে চালকসহ তিন থেকে চারজন শ্রমিক থাকেন। করোনার কারণে গাড়ি বন্ধ হওয়ার পর মালিক একজন করে রেখে বাকিদের বিদায় দিয়েছেন। সৌভাগ্যবান একজন পাচ্ছেন ২০০ টাকা- যা দিয়ে টার্মিনালে থেকে নিজের খাওয়া-দাওয়ার বন্দোবস্ত করতে হয়। আবার গ্রামে থাকা পরিবারকেও পালতে হয়- যা মোটেও সম্ভব নয়।
সিডিএম পরিবহনের সুপারভাইজার টার্মিনালের ভেতরে নিয়ে দেখালেন কীভাবে তাদের জীবন চলছে। হোটেলে খেলে ২০০ টাকায় ইফতার আর সেহরিই হবে না, বাড়িতে স্ত্রী-সন্তানকে কী পাঠাবেন? তাই তারা নিজেরা রান্নাবান্না করে খাচ্ছেন। কিন্তু টার্মিনালে তো চুলা, রান্নাঘর নেই। রাঁধবেন কোথায়? সে জন্য আশপাশের গাছ থেকে ডাল ভেঙে এনে মাটিতে ইট পেতে রান্না চলছে। সোমবার বিকেল ৪টার দিকে ইফতার বানানোর আয়োজন চলছিল। আলুভর্তা, ডাল ও ভাত- এই দিয়ে ইফতার করেন শ্রমিকরা। যেটুকু থেকে যায় তা দিয়ে চলে সেহরি।
নাবিলা পরিবহনের চালক আবদুল মতিনের বয়স হলেও এখনও তিনি সুদর্শন। গায়ের সাদা পাঞ্জাবি, লুঙ্গিতে দারিদ্র্যের ছাপ নেই। আগে দিনে হাজার দেড় টাকা আয় করলেও করোনায় ২০০ টাকা খোরাকিতে বাস পাহারা দেন। অথচ এ কাজ হেলপার, সুইপারভাইজাররাই করে থাকেন। এই প্রথম একজন চালককে পাওয়া গেল, যিনি পাহারা দেওয়ার কাজ করছেন। আবদুল মতিন বললেন, অভাবই তাকে বাধ্য করেছে এ কাজে।
পরিচয়পত্র বের করে আবদুল মতিন দেখালেন, তিনি ঢাকা মহানগর সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নে সদস্য। ইউনিয়ন প্রতিদিন প্রতিটি গাড়ি থেকে শ্রমিক কল্যাণের জন্য ৩০ টাকা করে চাঁদা তুললেও বিপদে এ তহবিলের কোনো খবর নেই। সোমবার দুপুরে গিয়ে ইউনিয়ন কার্যালয় বন্ধ পাওয়া যায়।
সায়েদবাদের শ্রমিকরা বললেন, বছরের পর বছর চাঁদা দিলেও করোনাকালে শ্রমিক কল্যাণ তহবিল থেকে তারা একটি টাকাও সাহায্য পাননি। ইউনিয়ন অফিসে গেলে নেতারা ব্যক্তিগতভাবে দুই-চারশ' টাকা দেন। কিন্তু কেউ টার্মিনালে এসে একবারও শ্রমিকদের খবর নেননি বা নেন না।
তবে ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সেলিম সারোয়ারে দাবি করেছেন, তারা যথাসাধ্য করছেন। তিনি বলেছেন, শ্রমিকদের তালিকা করে সহায়তা করা হচ্ছে। দুই দফা খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। শ্রমিক কল্যাণে তোলা চাঁদা শ্রমিকদের জন্যই ব্যয় করা হয়েছে।
সায়েদাবাদ বাস মালিক সমিতির সভাপতি মো. আবুল কালাম বলেন, গত দুই মাস ধরে মালিকেরও আয় নেই। মালিকরা কত সাহায্য দেবে? তার দাবি, তিনি টার্মিনালে গিয়েছিলেন। সাধারণ শ্রমিকদের খবর নিয়েছেন।
সারাদেশের পরিবহন খাতের শ্রমিকদের সর্বোচ্চ সংগঠন 'সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন'। এর সদস্য সংখ্যা প্রায় ৫০ লাখ। যাদের মধ্যে প্রায় ৩০ লাখ সরাসরি চালক ও গাড়ির শ্রমিক। এর বাইরে পরিবহন-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতে আরও ২০ লাখ শ্রমিক রয়েছেন। সড়ক পরিবহন আইনে চালক ও শ্রমিককে মাসিক বেতনে নিয়োগ দেওয়ার বিধান থাকলেও প্রায় শতভাগ ক্ষেত্রেই তা মানা হয় না।
পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী বলেন, চালক শ্রমিকরা ট্রিপ ভিত্তিতে দৈনিক মজুরি পান। এ কারণে করোনা পরিস্থিতিতে শ্রমিকরা খুবই সংকটে আছেন।
সংকট কাটাতে ফেডারেশনের পক্ষে কী কী করা হয়েছে- এ প্রশ্নের জবাবে ওসমান আলীর দাবি, শ্রমিকদের খাদ্য সহায়তা দিতে সব জেলা প্রশাসককে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে কাঙ্ক্ষিত সাড়া পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন টার্মিনালভিত্তিক কিছু সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
দেশের প্রতিটি বাণিজ্যিক গাড়ি থেকে প্রতিদিন ৭০ টাকা করে চাঁদা নেওয়া হয়। ৪০ টাকা মালিক সমিতির জন্য, বাকি ৩০ টাকা শ্রমিক কল্যাণের জন্য নেওয়া হয়। অতীতে প্রতিদিন আট হাজার গাড়ি থেকে এভাবে টাকা তোলা হলেও করোনা সংকটে কল্যাণ তহবিল থেকে তারা কিছুই পাচ্ছেন না। ওসমান আলী এ অভিযোগের বিষয়ে বলেছেন, কল্যাণ তহবিলের টাকার টাকা আগেই খরচ হয়েছে। তা শ্রমিকদের কল্যাণেই ব্যয় হয়েছে। প্রতিটি টাকারই হিসাব রয়েছে।
সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহর দাবি, যতটা সম্ভব ততটা সাহায্য করা হচ্ছে শ্রমিকদের। তিনি নিজে দুই দফায় তার মালিকানাধীন কোম্পানিতে কর্মরতদের ৩৫ লাখ টাকা অনুদান দিয়েছেন। বাকি কোম্পানিগুলোও কম বেশি দিচ্ছে বলে দাবি তার।
তবে মহাখালী, গাবতলী ও সায়েদবাদের শ্রমিকরা জানালেন, নামিদামি বড় কোম্পানিগুলোতে মাসিক বেতনে চালক, শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া হয়। যদিও গত দুই মাস গাড়ি বন্ধ থাকায় তারাও বেতন পাননি। বেতনের পরিবর্তনে কিছু টাকা দিয়ে একে 'অনুদান' বলা হচ্ছে। 'এনা' 'হানিফ' 'শ্যামলী' 'সোহাগ'-এর বড় প্রতিষ্ঠানগুলোও এ কাজ করছে।
এনায়েত উল্যাহ বলেন, গাড়ি বন্ধ হওয়ায় শ্রমিকরা যেমন কর্মহীন, মালিকরাও তেমন। মালিকরা এত শ্রমিককে সহায়তা দেবেন কোথা থেকে? শ্রমিকদের রক্ষায় সরকারকে সহায়তা করতে হবে।


আরও পড়ুন

×