ভঙ্গুর দাম্পত্য লাগছে জোড়া
ছবি-সমকাল
আব্দুল হামিদ
প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৪ | ০০:৫১ | আপডেট: ১৯ এপ্রিল ২০২৪ | ১৬:৩৩
স্বামীর সঙ্গে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে থাকেন রশ্নিতা রাওহা (আসল নাম নয়)। তিন বছর আগে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় তাঁর। চাকরি করেন একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে। স্বামীও একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে উচ্চ পদে চাকরি করতেন। বিয়ের পর সুখেই কাটছিল সংসার। ছয় মাস আগে আচমকা চাকরি চলে যায় স্বামী মোহাম্মদ তানভীরের। আর তাতেই সবকিছুর ছন্দপতন। চোখেমুখে গভীর উদ্বেগ আর ভয়ার্ত চেহারা নিয়ে রাজধানীর তেজগাঁও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগের পারিবারিক সহায়তা ডেস্কে বসে কথাগুলো বলছিলেন রাওহা।
শুধু রাওহা নন, তাঁর মতো এমন অনেক নারী প্রতিদিন বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে আসেন সাপোর্ট সেন্টারে। পারিবারিক ছোটখাটো কলহ মিটিয়ে দেওয়া হয় সালিশ ও আলোচনার মাধ্যমে। এ ছাড়া শারীরিক নিযার্তন, শ্লীলতাহানি, যৌতুক, পাচার থেকে শুরু করে ধর্ষণের শিকার হয়ে অনেকে হাজির হচ্ছেন সেন্টারে। তাদের দেওয়া হয় আইনি সহায়তা। এর মধ্যে গত বছর ৭৬টি পারিবারিক বিরোধের মীমাংসা করেছে পুলিশের পারিবারিক সহায়তা ডেস্ক। এখন পর্যন্ত তারা সবাই ভালো আছেন। শুধু সমাধান করেই শেষ নয়, এসব পরিবারের খোঁজখবরও রাখে উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগ।
রাওহা জানান, স্বামীর চাকরি চলে যাওয়ার পর সংসারের হাল ধরেন তিনি। একাই টানছিলেন পরিবারের বোঝা। এর মধ্যেই স্বামী ব্যবসা করার জন্য ৩০ লাখ টাকা দাবি করে বসেন। এত টাকা তাঁর পক্ষে দেওয়া সম্ভব না বললে বাবার বাড়ি থেকে নিয়ে আসার জন্য চাপ দিতে থাকে। এতে রাওহা আপত্তি জানালে স্বামীসহ শ্বশুরবাড়ির লোকজন শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন শুরু করে। রাওহা সাপোর্ট সেন্টারে গেলে দুই পরিবারের সঙ্গে কথা বলে পুলিশ। এক পর্যায়ে আগের অবস্থায় ফেরার আশ্বাস দেন স্বামী তানভীর। এভাবে শত নারীর স্বপ্নের সংসার বাঁচিয়ে চলেছে পুলিশের এ বিভাগ।
তেজগাঁও থানার পাশেই নারী ও শিশুদের সহায়তা কেন্দ্রটি। পুলিশের এই বিভাগে রয়েছে তিনটি ইউনিট। এর মধ্যে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার, কুইক রেসপন্স ইউনিট ও তদন্ত ইউনিট। কুইক রেসপন্স ইউনিটের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা সার্ভিস দেওয়া হয়। ঢাকার যে কোনো স্থানে ভুক্তভোগীরা হটলাইন নম্বরে ফোন করে সহায়তা চাইলে পৌঁছে যান তারা। ডিএমপির এ বিভাগে একজন উপকমিশনার (ডিসি), দু’জন এডিসি, তিনজন এসি ও ছয়জন পরিদর্শকসহ ১২৩ নারী সদস্য কর্মরত।
সরেজমিন দেখা যায়, তিন তলা ভবনের নিচতলায় অভ্যর্থনা কক্ষ, সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠতেই সামনে শিশুদের প্লে–গ্রাউন্ড। বাঁ পাশে কুইক রেসপন্স ইউনিট, ডিউটি পোস্ট ও পারিবারিক সহায়তা কেন্দ্র। সামনে যেতেই একে একে কর্মকর্তাদের কক্ষ। ডান পাশে রয়েছে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার (নারী ও মেয়ে শিশুদের থাকার ব্যবস্থা)। পাশেই চিকিৎসক কক্ষ।

উইমেন সাপোর্টের তথ্যে দেখা যায়, এখানে ভুক্তভোগীদের তিন থেকে পাঁচ দিন রাখা হয়। এর পর ভুক্তভোগীদের পরিবার কিংবা এনজিওর জিম্মায় দেওয়া হয়। ২০১৯-২০২৩ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে সেবা নিয়েছে ২ হাজার ২২০ জন নারী ও শিশু। তাদের মধ্যে পরিবারের জিম্মায় ৭৯০ জন, নিজ জিম্মায় ১১৭ জন, মামলার তদন্ত কর্মকর্তার জিম্মায় ১ হাজার ৫৯ জনসহ এনজিওর জিম্মায় ২৫৪ জনকে হস্তান্তর করা হয়।
নারী ও শিশুদের জন্য গঠন করা ইউনিটটি ২০১১ সাল থেকে মামলা তদন্ত শুরু করে। ডিএমপির ৫০ থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে হওয়া সব মামলা তদন্ত করে ইউনিটটি। এ ছাড়া এখানে আদালত থেকেও একই আইনের মামলা তদন্তে পাঠানো হয়। ১৩ বছরে ডিএমপির বিভিন্ন থানায় ৪ হাজার ৪২৩টি এবং আদালত থেকে পাঠানো ৬৩টি মামলা তদন্তের জন্য আসে। এর মধ্যে ৩১১টি মামলা থানাসহ বিভিন্নভাবে নিষ্পত্তি হয়। আর ৪ হাজার ১১২টি মামলার মধ্যে ২ হাজার ৭০৯টি অভিযোগপত্র ও ১ হাজার ৩৩৮টি মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে ইউনিটটি। বর্তমানে ৬৫টি মামলা তদন্তাধীন রয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশ মামলা ডিএনএ ও মেডিকেল প্রতিবেদনের জন্য ঝুলে আছে। এ সময়ে ধর্ষণ মামলা হয়েছে ১ হাজার ১৬৬টি। এর মধ্যে দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়েছে ৬১টি। আর অপহরণ ৯৮৯, শ্লীলতাহানি ৩৯১ এবং যৌতুক মামলা হয়েছে ১ হাজার ৪৭৪টি।
গেল মঙ্গলবার উইমেন সাপোর্ট সেন্টারে গিয়ে দেখা যায়, পারিবারিক সহায়তা ডেস্কে বসে আছেন এক নারী। তিনি সাপোর্ট সেন্টারে এলেও মামলা করতে চান না স্বামীর বিরুদ্ধে। স্বামী ও সংসার বাঁচিয়ে সুষ্ঠু সমাধান চান। পরে তাঁর অভিযোগের বিষয়ে একটি লিখিত নেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।
এক কর্মকর্তা বলেন, কিছুদিন আগে মিরপুর এলাকার তন্বি সাহা (আসল নাম নয়) স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ দেন। অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, তাদের একটি কন্যাসন্তান আছে। এর মধ্যে তাঁর স্বামী অফিসের আরেক নারী সহকর্মীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে জড়িয়েছেন। তাঁকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করছেন। এতে তিনি মেয়েকে নিয়ে বাবার বাড়িতে চলে আসেন। এখন তাঁর স্বামী খোঁজ নেন না। এ ছাড়া সন্তানের ভরণপোষণও দিচ্ছেন না। এ পরিস্থিতিতে স্বামীসহ তাঁর পরিবারের সদস্যদের ডাকেন পুলিশ কর্মকর্তা। সেখানে মৌখিক সালিশে তাদের সম্পর্ক আগের অবস্থায় ফেরে।
উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগের উপকমিশনার ড. হুমায়রা পারভীন সমকালকে বলেন, ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলাগুলো এ বিভাগ তদন্ত করে। এসব তদন্ত নারী কর্মকর্তাদের দিয়ে করা হয়। এতে তদন্তের প্রতিটি ক্ষেত্রে অত্যন্ত সংবেদনশীল আচরণের মাধ্যমে ভুক্তভোগীকে ন্যায় বিচার পেতেও সহায়তা দেওয়া হয়। তদন্তকালীন প্রয়োজনে তাঁকে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে সাময়িকভাবে রাখা হয়।
তিনি বলেন, মানসম্মান, স্বামী-সংসার ও সন্তানদের কথা চিন্তা করে অনেক নারীই আইনের আশ্রয় নিতে চান না। এ ক্ষেত্রে তারা আলোচনা ও সালিশের মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান চান। উইমেন সাপোর্ট বিভাগ নিয়মিত মামলা তদন্তের পাশাপাশি এ সালিশ কার্যক্রম চালিয়ে থাকে। যে কোনো নির্যাতিত নারীর লিখিত অভিযোগ পরিদর্শক পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তার মাধ্যমে পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তি করা হয়। তবু অনেক সময় সমস্যা সমাধান করা যায় না, সে ক্ষেত্রে নির্যাতনের শিকার নারীকে আইনি সহায়তা পেতে পরামর্শ দেওয়া হয়।
