ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

করোনা চিকিৎসায় পিছিয়ে

বড় অনেক হাসপাতাল কাজে আসছে না

বড় অনেক হাসপাতাল কাজে আসছে না
×

প্রতীকী ছবি

রাজবংশী রায়

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ২১ জুন ২০২০ | ১৫:০৯

করোনা আক্রান্ত হয়ে গত ১১ জুন ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন অধ্যাপক ডা. গাজী জহির হাসান। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) শিশু সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। করোনা আক্রান্ত ওই চিকিৎসক নিজ প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা পাননি। বিএসএমএমইউর সাবেক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ডা. শহীদুল্লাহ শিকদারও করোনার সেবা পাননি এখানে। এভাবে এ প্রতিষ্ঠানটির দুই শতাধিক চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা ও কর্মচারী ইতোমধ্যে করোনা আক্রান্ত হলেও তাদের কেউই নিজ প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নিতে পারেননি। অথচ দেশের সর্বোচ্চ চিকিৎসা, শিক্ষা ও গবেষণার এই প্রতিষ্ঠানটিই দুর্যোগকালীন এই সময়ে নেতৃত্ব দিতে পারত বলে সংশ্নিষ্টরা মনে করেন।

রাজধানীর শাহবাগের বাংলাদেশ বেতারের ছেড়ে দেওয়া একটি ভবনে করোনার নমুনা পরীক্ষার কাজ করেই দায়িত্ব সারছে প্রতিষ্ঠানটি। আর তাদের প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অন্য হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। বিশাল জনবল ও অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা থাকার পরও সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষের এভাবে হাত গুটিয়ে বসে থাকা নিয়ে সর্বত্রই সমালোচনার ঝড় বইছে। অনেকের প্রশ্ন, করোনা পরিস্থিতি আর কতটা নাজুক হলে প্রতিষ্ঠানটি চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু করবে?

বিএসএমএমইউর সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, বিষয়টি সত্যিই আশ্চর্যজনক। করোনা নিয়ে সারাদেশের মানুষ যখন উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে, তখন দেশের শীর্ষ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানটির এমন হাত গুটিয়ে বসে থাকা কাম্য নয়। নিজেদের দায়িত্ববোধের জায়গা থেকেই তারা করোনা আক্রান্ত রোগীদের সেবার ব্যবস্থা করতে পারত। একই সঙ্গে জাতীয় পলিসি নির্ধারণে আরও ব্যাপকভাবে ভূমিকা রাখতে পারত। এ জন্য তো কারও নির্দেশনার প্রয়োজন নেই। দেশ ও মানুষের জীবনের কথা বিবেচনা করেই তাদের এগিয়ে আসা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেটি না হওয়া দুঃখজনক। কর্তৃপক্ষ দ্রুততম সময়ে নীরবতা ভেঙে এ বিষয়ে কার্যক্রম শুরু করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

বিএসএমএমইউর মতোই জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ঢাকা শিশু হাসপাতাল, ইএনটি ইনস্টিটিউট, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সসহ বড় বড় চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলো করোনা চিকিৎসায় কাজে আসছে না। মহামারির এই দুর্যোগেও প্রতিষ্ঠানগুলো হাত গুটিয়ে বসে আছে।

শয্যার তুলনায় চিকিৎসক বেশি বঙ্গবন্ধু মেডিকেলে : চিকিৎসা, শিক্ষা ও গবেষণায় দেশের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম সুবিদিত। দেশের খ্যাতনামা চিকিৎসকদের প্রায় সবাই এই প্রতিষ্ঠানের। অন্য সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের তুলনায় চিকিৎসক, নার্সসহ জনবলের দিক থেকেও প্রতিষ্ঠানটি বেশ সমৃদ্ধ। এক হাজার ৯০০ শয্যার এই প্রতিষ্ঠানটিতে ৫৬টি বিভাগ রয়েছে। এই বিভাগগুলোতে সহকারী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক পর্যন্ত চিকিৎসক ও শিক্ষক আছেন ৪৯৩ জন, মেডিকেল অফিসার ৭৪৩ জন, বিভিন্ন বিভাগের অধীনে উচ্চ শিক্ষার রেসিডেনশিয়াল কোর্সে ভর্তি আছেন আরও এক হাজার ৭৫০ চিকিৎসক। অর্থাৎ সবমিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটিতে চিকিৎসকই আছেন দুই হাজার ৯৮৬ জন। এতে শয্যা ও চিকিৎসকের অনুপাত দাঁড়ায় ১:১.৫। অর্থাৎ প্রতিটি শয্যার বিপরীতে দেড় জন চিকিৎসক রয়েছেন।

নার্সের সংখ্যা এক হাজার ১২৬ জন, প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা ১০৮ জন, দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা ১১৫ জন, তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী ৬৮৮ এবং চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী এক হাজার ৩৬৬ জনসহ মোট তিন হাজার ৪০৩ জন কর্মরত আছেন। চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলে প্রতিষ্ঠানটির মোট জনবলের সংখ্যা ছয় হাজার ৩৮৯ জন। এ হিসাবে শয্যা ও জনবলের অনুপাত দাঁড়ায় ১:৩.৩৬। অর্থাৎ একটি শয্যার বিপরীতে সোয়া তিনজনের বেশি জনবল আছে এই প্রতিষ্ঠানটিতে।

দেশের সরকারি-বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানেই এত জনবল নেই। বিশেষ করে প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে জনবল সংকট মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বিগত এক দশক ধরে প্রতিটি হাসপাতালে শয্যাসংখ্যা বাড়ানো হলেও সে অনুপাতে জনবল বাড়েনি। জনবল সংকটের কারণে সরকারি প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা হুমকির মুখে পড়েছে। এরপরই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে জরুরিভিত্তিতে দুই হাজার চিকিৎসক, পাঁচ হাজার ৫৪ জন নার্স নিয়োগ দেওয়া হয়।

সর্বোচ্চ জনবল ও সুযোগ-সুবিধা থাকার পরও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়টি করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার কাজে আসছে না। এমনকি করোনা সংক্রমণ শুরুর পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটির অধিকাংশ চিকিৎসক-কর্মকর্তা নিয়মিত হাসপাতালে উপস্থিত হচ্ছেন না। কর্তৃপক্ষের নির্দেশের পরও তাদের হাসপাতালে আনা যায়নি। এতে অন্যান্য রোগীর সেবাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রেও মারাত্মক সংকট তৈরি হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির অন্তত ১০ জন চিকিৎসক ও কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দেশে করোনার সংক্রমণ শুরুর পরপরই প্রতিষ্ঠানটি অন্যান্য রোগী ভর্তির ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ আরোপ করে। করোনা নেগেটিভ সনদ ছাড়া অন্য রোগীরাও চিকিৎসার সুযোগ পাচ্ছেন না এখানে। এ কারণে প্রতিষ্ঠানটির অর্ধেকের বেশি শয্যা ফাঁকা পড়ে আছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশের পর কর্তৃপক্ষ কিছুটা নড়েচড়ে বসেছে। করোনা ইউনিট চালুর বিষয়ে কয়েকদিন ধরে শুধু নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে যাচ্ছে। কিন্তু এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।

তবে বিএসএমএসইউ উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ূয়া সমকালকে বলেন, করোনার চিকিৎসার জন্য তারা প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কেবিন ব্লকের কেবিন, আইসিইউ, এইডিইউ মিলে ২৫০ শয্যা এবং জাতীয় বেতার ভবনে ১৫০ শয্যা মিলে মোট ৩৫০ শয্যায় করোনা রোগীদের চিকিৎসার জন্য তারা প্রস্তুত করছেন। তবে এটি শুরু করতে আরও ৪ থেকে ৫ দিন লাগতে পারে বলে জানান তিনি।

আরও আগে চিকিৎসা শুরু না করার বিষয়ে জানতে চাইলে উপাচার্য বলেন, শুরুতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল চালু করা হয়েছিল। এর বাইরে অন্যান্য হাসপাতালে সাধারণ রোগীরা চিকিৎসা পাবেন। মন্ত্রণালয় ওই সময় বিএসএমএমইউর বিষয়ে কিছু বলেনি। কারণ করোনার পাশাপাশি অন্যান্য রোগীর সেবারও তো প্রয়োজন আছে। এই প্রতিষ্ঠানটিকে হয়তো সেভাবেই চিন্তা করা হয়েছিল। এখন প্রয়োজনীয়তা দেখা দেওয়ায় আমরা করোনা রোগীদের চিকিৎসার প্রস্তুতি নিচ্ছি।

বক্ষব্যাধি হাসপাতাল : করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার প্রধান প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে পারত রাজধানীর মহাখালীর বিশেষায়িত এই হাসপাতালটি। সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকার পরও প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষ হাত গুটিয়ে বসে আছে। অ্যাজমা, শ্বাসকষ্ট, যক্ষ্ণাসহ টিউবারকোলসিস জাতীয় সব রোগের চিকিৎসার প্রধান প্রতিষ্ঠান এটি। হাসপাতালের কয়েকজন চিকিৎসক-কর্মকর্তা জানান, করোনার সংক্রমণ শুরুর পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহিদুর রহমান অনিয়মিত। মাঝেমধ্যে এলেও অফিসের কাজকর্ম গুছিয়ে আবার দ্রুত হাসপাতাল ত্যাগ করেন।

পরিচালকের করোনা সংক্রমণের এমন ভীতির কারণে প্রতিষ্ঠানের অন্য চিকিৎসক-কর্মকর্তাদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ৬৫০ শয্যার এই প্রতিষ্ঠানে এখন ১০০ জনেরও কম রোগী ভর্তি আছেন। শ্বাসকষ্ট, জ্বর, কাশি থাকা কোনো রোগীকেই ভর্তি করা হয় না। করোনা নেগেটিভ সনদ দেখানোর পরও উচ্চ পর্যায়ের তদবির ছাড়া কেউ ভর্তি হতে পারছেন না। নামেমাত্র ৮ শয্যার আইসোলেশন সেন্টার চালু করলেও সেখানে কোনো রোগী রাখা হয় না।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন পর প্রতিষ্ঠানটিতে একটি সিটিস্ক্যান মেশিন ক্রয় করা হলেও অজ্ঞাত কারণে তা আজও চালু করা হয়নি।

একইভাবে স্লিপ ল্যাব, আইব্যাসসহ অন্যান্য যন্ত্রপাতিও বাক্সবন্দি হয়ে পড়ে আছে বছরের পর বছর ধরে। হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে থাকা অক্সিজেন সিলিন্ডারগুলোও বিকল হয়ে পড়েছে। ৫০ শয্যা ও তার ওপরে থাকা শয্যাবিশিষ্ট সব সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে করোনা ইউনিট চালু করার বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যে নির্দেশনা দিয়েছে তাও মানছে না সরকারের এই প্রতিষ্ঠানটি।

এ বিষয়ে পরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহিদুর রহমানকে কয়েকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরিচয় দিয়ে কথা বলতে চেয়ে তার মুঠোফোনে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।

ঢাকা শিশু হাসপাতাল : শিশু রোগীদের চিকিৎসায় দেশের প্রধান বিশেষায়িত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান ঢাকা শিশু হাসপাতালেও আক্রান্তদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে না। হাসপাতাল সূত্র জানায়, করোনা সংক্রমণের পর প্রতিষ্ঠানটিতে ২২ শয্যার একটি আইসোলেশন ইউনিট চালু করা হয়। সেখানে সন্দেহভাজন রোগীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু করোনা পজিটিভ শনাক্ত হওয়ার পরপরই শিশুদের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কারণ প্রতিষ্ঠানটিতে করোনা ডেডিকেটেড কোনো ইউনিট নেই। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ করোনা ডেডিকেটেড ইউনিট চালু জন্য বরাদ্দ চেয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করলেও কোনো জবাব পাননি। এ অবস্থায় প্রতিষ্ঠানটিতে করোনা ডেডিকেটেড ইউনিট চালু করা নিয়ে অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়েছে। অথচ প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে বড়দের মতো শিশুরাও আক্রান্ত ও মৃত্যুবরণ করছে।

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যানুযায়ী গতকাল রোববার পর্যন্ত মোট আক্রান্তের প্রায় ৮ শতাংশ করোনা পজিটিভ শনাক্ত হয়েছে শিশুরা। তাদের মধ্যে মৃত্যুবরণ করেছেন ২ দশমিক ৩১ শতাংশ। কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিশুদের মধ্যে আক্রান্তের হার ২ দশমিক ৫ থেকে ৩ শতাংশ পর্যন্ত। মৃত্যুহারও এক শতাংশের নিচে। আক্রান্ত এই শিশুদের চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ১৪ শয্যার একটি করোনা ডেডিকেটেড ইউনিট চালু করা হয়েছে। তবে সেখানেও নেই আইসিইউ, ভেন্টিলেটর ও ডায়ালিসিসের ব্যবস্থা।

এর বাইরে করোনা আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার জন্য দেশের কোনো হাসপাতালেই পৃথক কোনো ব্যবস্থা নেই। করোনা সংক্রমণের পর আক্রান্ত শিশু রোগীদের জন্য পদক্ষেপ না থাকায় অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক ও উদ্বেগ বাড়ছে।

এ বিষয় জানতে চাইলে ঢাকা শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. শফি আহম্মেদ মুয়াজ সমকালকে বলেন, ২২ শয্যার আইসোলেশন ইউনিটে সীমিত পরিসরে শিশু রোগীদের চিকিৎসা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন তারা; কিন্তু এই আইসোলেশন ইউনিট চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত নয়। কারণ সন্দেহভাজন রোগীদের এই ইউনিটে ভর্তি রেখে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। করোনা শনাক্ত হওয়ার পর রোগীদের হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার কোনো ব্যবস্থাপনা নেই। রোগীদের বাড়ি পাঠাতে হচ্ছে। এসব রোগীকে হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা দিতে গেলে অন্য শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে। কিন্তু করোনা ডেডিকেটেড পৃথক ব্যবস্থা থাকলে তাদের হাসপাতালে রেখেই চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব হতো। পরিচালক বলেন, ডেডিকেটেড করোনা ইউনিট চালু করার জন্য বরাদ্দ চেয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করলেও তাতে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

একই চিত্র আরও বহু হাসপাতালের : করোনা সংক্রমণের পর অন্যদের মতো ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্স, জাতীয় নাক কান গলা (ইএনটি) ইনস্টিটিউটসহ দেশের বড় বড় বেশকিছু হাসপাতাল এখনও হাত গুটিয়ে বসে আছে। করোনা নিগেটিভ সনদ ছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলো রোগী ভর্তি করছে না। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে জরুরি অস্ত্রোপচারও বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে করে বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্তরা চিকিৎসাবঞ্চিত হচ্ছেন। আবার অ্যাম্বুলেন্সে ঘুরে ঘুরে অনেক রোগী রাস্তায়ই মৃত্যুবরণ করছেন।

নিউরো সায়েন্স হাসপাতালের যুগ্ম পরিচালক অধ্যাপক ডা. বদরুল আলম সমকালকে বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠানে একটি আইসোলেশন শয্যা চালু করা হয়েছে। সন্দেহভাজন রোগীদের সেখানে রাখা হয়। গতকালও দু'জন করোনা পজিটিভ রোগী পাওয়া গেছে। এই রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে তাদের প্রতিষ্ঠানের প্রায় অর্ধশত চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হয়েছেন। এরপরও ঝুঁকি নিয়ে জরুরি সেবাগুলো তারা অব্যাহত রেখেছেন বলে জানান।

চিকিৎসকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) মহাসচিব ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী সমকালকে বলেন, মহামারির এই সময়ে সামর্থ্য থাকার পরও অনেক প্রতিষ্ঠান হাত গুটিয়ে বসে আছে, এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিপ্তরের দায় আছে। কারণ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নির্দেশ দিলে হাসপাতাল পরিচালক কিংবা প্রতিষ্ঠান প্রধানের তা আমান্য করা সাধ্য নেই। কিন্তু সীমাহীন অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা সে নির্দেশ দেওয়ার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন। এখন অধস্তনরাও তাদের আদেশ-নির্দেশ মানতে চাচ্ছেন না। এতে চেইন অব কমান্ডও নড়বড়ে হয়ে পড়েছে।

ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী আরও বলেন, করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতি দিন দিন উদ্বেগজনক আকার ধারণ করছে। ইতোমধ্যে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী মিলে প্রায় চার হাজার আক্রান্ত হয়েছেন। ৫০ জনের ওপরে চিকিৎসক মৃত্যুবরণ করেছেন। করোনা চিকিৎসায় সম্মুখসারির যোদ্ধা চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য আজ পর্যন্ত একটি পৃথক হাসপাতাল করা যায়নি। তারা আক্রান্ত হলে কোথায় চিকিৎসা নেবেন তার কোনো ব্যবস্থা নেই। অথচ অন্যান্য অনেক পেশাজীবীর জন্য পৃথক হাসপাতালের ব্যবস্থা রয়েছে। এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। বিএমএর পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে বাহাত্তর ঘণ্টার মধ্যে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য একটি পৃথক হাসপাতাল চালু করার আহ্বান জানিয়েছি। আশা করি কর্তৃপক্ষ দ্রুততম সময়ে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সমকালকে বলেন, করোনাসহ অন্যান্য রোগে আক্রান্ত রোগীদের কীভাবে সেবা দেওয়া হবে, সে সম্পর্কে মন্ত্রণালয় থেকে একটি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এরপরও বেশকিছু সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তা মানছেন না বলে আমাদের কাছে অভিযোগ এসেছে। সেগুলো আমরা খতিয়ে দেখছি। কারও অবহেলা পাওয়া গেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। করোনা দুর্যোগ মোকাবিলায় নিজ নিজ অবস্থান থেকে সবাইকে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

আরও পড়ুন

×