সমকাল-ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল অনলাইন গোলটেবিল
চাই সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ
বৃহস্পতিবার 'রাজনৈতিক দলে ৩৩% নারী অন্তর্ভুক্তির সময়সীমা :চ্যালেঞ্জ এবং করণীয়' শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা- অনলাইন থেকে
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ০২ জুলাই ২০২০ | ১৫:৩৯
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) বিধান থেকে রাজনৈতিক দলে ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্ব পূরণের সময়সীমা তুলে দেওয়ার নির্বাচন কমিশনের (ইসি) উদ্যোগ গ্রহণযোগ্য নয়। এই সময়সীমা কোনো অবস্থায়ই তুলে দেওয়া যাবে না। বরং এই সময়সীমাকে আরও ৫-১০ বছরের জন্য বর্ধিত করা জরুরি। সেটিও পুরোপুরি বাস্তবায়নের জন্য রোডম্যাপ থাকা জরুরি। আইন মানতে রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার সমকাল ও ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত 'রাজনৈতিক দলে ৩৩ শতাংশ নারী অন্তর্ভুক্তির সময়সীমা :চ্যালেঞ্জ এবং করণীয়' শীর্ষক এক অনলাইন গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। ইউএসএআইডি ও ইউকেএইডের যৌথ অর্থায়নে এবং ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের স্ট্রেনদেনিং পলিটিক্যাল ল্যান্ডস্কেপ (এসপিএল) প্রকল্পের 'নারীর জয়ে সবার জয়' ক্যাম্পেইনের আওতায় এই অনলাইন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
প্রারম্ভিক বক্তব্যে অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ও সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি বলেন, আপনারা জানেন সিরিজ অনলাইন গোলটেবিল বৈঠকের অংশ হিসেবে এই আলোচনার আয়োজন করা হয়েছে। এর আগেও আমরা এ নিয়ে আলোচনা করেছি। আমরা চাই নারীর রাজনৈতিক এবং সামাজিক ক্ষমতায়ন। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী ২০২০ সালের মধ্যে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সর্বস্তরে ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে আমাদের দলগুলো ব্যর্থ হয়েছে। আমরা চাই এই সময়সীমা বৃদ্ধি করে একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা করা হোক, যাতে নারীর রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিশ্চিত হয়। রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ এবং গণমাধ্যম সবাইকেই এ নিয়ে কাজ করতে হবে। আইন থেকে সরে আসা নয়, নির্বাচন কমিশনকে বাধ্য করতে হবে নতুন রোডম্যাপ ঘোষণায়।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মিজানুর রহমান মিনু বলেন, সব রাজনৈতিক দলের সব পর্যায়েই নারী নেতৃত্ব নিয়ে আসতে হবে। এক্ষেত্রে বিএনপি অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন ও মহাসচিব স্বাক্ষরিত চিঠির মাধ্যমে দলের সব পর্যায়ের কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্ব নিশ্চিতে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তার এলাকা রাজশাহীতে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত দলের সব পর্যায়ের কমিটিতে কেবল ৩৩ শতাংশ নয়, ৩৮ শতাংশ পর্যন্ত নারী নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ক্ষমতায় থাকতে মেয়েদের ডিগ্রি পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন বলেই আজকে অনেক নারী অনেক উচ্চপর্যায়ে আসতে পেরেছেন।
বর্তমান নির্বাচন কমিশনের কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, এই নির্বাচন কমিশন সরকারের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। মেরুদণ্ডহীন এই কমিশনকে কোনো কথা বলে লাভ নেই। নারী নেতৃত্বের প্রতি আহ্বান জানিয়ে সাবেক এই মেয়র বলেন, অধিকার আদায় করতে হলে বীরের মতোই করতে হবে। নারীরা এগিয়ে এলে নির্বাচন কমিশন পিছু হঠতে বাধ্য হবে।
জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু বলেন, নারীর ক্ষমতায়ন এবং সর্বক্ষেত্রে মা-বোনদের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনোভাবেই সমাজের মুক্তি সম্ভব নয়। কারণ সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠীই হচ্ছে নারী। মায়ের কাছ থেকেই আমরা প্রথম শিক্ষা পাই। তাই মাকে সম্মান করতে হবে, বোনকে সম্মান করতে হবে, স্ত্রীকে সম্মান করতে হবে।
সাবেক এই মন্ত্রী ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্ব পূরণে রাজনৈতিক দলগুলোকে আরও ৫ বছর সময় দেওয়ার প্রস্তাব করে বলেন, রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ কেবল ৩৩ শতাংশ নয়, পর্যায়ক্রমে ৫০ শতাংশে এগিয়ে নিতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকেও সেই অঙ্গীকার নিয়ে কাজ করতে হবে। কেননা রাজনৈতিক দলগুলো মানুষের কল্যাণের জন্যই কাজ করে এবং সেই মানুষের অর্ধেক হচ্ছে নারী। তাই রাজনৈতিক দলগুলো যাতে এটি বাস্তবায়ন করে, সেজন্য নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকেই বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে।
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার এমপি বলেন, নির্বাচন কমিশনের প্রতি সোজাসাপ্টা প্রস্তাব দিতে চাই, নারী নেতৃত্ব নিশ্চিত করার শর্ত পূরণের সময়সীমা বাড়াতে হবে। কোন কোন কাজ করলে সেটি বাস্তবায়ন হবে, সেটাও ঠিক করে দিতে হবে। তার জন্য একটা রোডম্যাপ তৈরি করা দরকার। তিনি বলেন, শুধু নারী নেতৃত্ব সৃষ্টি ও ক্ষমতায়ন করলেই হবে না, নারীর কাজের জন্য পরিবেশও সৃষ্টি করতে হবে। এজন্য রাজনৈতিক দল ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে যেমন উদ্যোগ নিতে হবে, তেমনি পরিবারের পুরুষ সদস্যদেরও সহযোগিতা করতে হবে।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্ব নিশ্চিতের শর্ত পূরণের সময়সীমা উঠিয়ে দিতে নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগ তাদের একটি স্বেচ্ছাচারী আচরণ। আরপিওর এমন গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী আনতে তারা রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত নেওয়ার প্রয়োজনও মনে করেনি। এর মধ্য দিয়ে তারা সংবিধানও লঙ্ঘন করেছে। কেননা সংবিধানেই নারীর অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলোকেই চাপ দিয়ে নির্বাচন কমিশনের এই খেলাটা বন্ধ করা দরকার। নির্বাচন কমিশনকেও স্বেচ্ছাচারী আচরণ থেকে সরে আসতে হবে। তিনি বলেন, এই সময়সীমা নূ্যনতম আরও ৫ বছর বৃদ্ধি করা দরকার। শ্রেণি শোষণ থেকে বেরিয়ে এসে নারীদের জন্য স্বাপ্নিক জাগরণ গড়ে তুলতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কাবেরী গায়েন বলেন, নারী নেতৃত্ব পূরণের সময়সীমা বাতিল করাটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। ২০০৯ সালে ৩৩ শতাংশের আইনটি যখন করা হয়েছিল, সেই সময় থেকে গত ১১ বছরে নারীর ক্ষমতায়ন অনেকটাই এগিয়েছে। আমরা এখন এটাকে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ করার দাবি জানাচ্ছি। আর তখনই এটা তুলে দেওয়ার চিন্তা-ভাবনা দুঃখজনক। এটি যাতে না হয় সেজন্য রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি নারী সংগঠন ও নারী নেতা এবং গণমাধ্যম থেকেও দাবি তুলতে হবে। সচেতনতার পাশাপাশি এক সধরনের চাপ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে নির্বাচন কমিশন ও নীতিনির্ধারকরা এমন উদ্যোগ থেকে সরে আসেন।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুল্লাহ আল ক্বাফি রতন বলেন, নব্বইয়ের দশকে রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ যা ছিল আজ তা থেকেও অনেকটা পিছিয়েছে। অথচ পুরুষতান্ত্রিক সমাজে রাজনীতিসহ সামগ্রিকভাবেই নারীদের অংশগ্রহণ জরুরি। এটা বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলোকেই এগিয়ে আসতে হবে।
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, নির্বাচন কমিশনকে তাদের স্টেকহোল্ডার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বসতে হবে। গত ১০ বছরে নারী নেতৃত্ব সৃষ্টিতে কতটুকু অর্জন হয়েছে, সেই অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে হবে। আগামী ১০ বছরের জন্য নতুন করে রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে যাতে সত্যিকার অর্থেই নারী নেতৃত্ব সৃষ্টি হয়। কিন্তু কোনো অবস্থায়ই সময়সীমা তুলে দেওয়া যাবে না। এটা কোনো অনুগ্রহ নয়।
আওয়ামী লীগের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য অ্যারোমা দত্ত বলেন, 'নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং সেটা সংসদের অধীনে। কাজেই নির্বাচন কমিশনের আইন চূড়ান্তভাবে সংসদেই আসবে। আমরা তো এগিয়েছি, পিছিয়ে যাইনি। কাজেই নারীদের ৩৩ শতাংশ অংশগ্রহণ কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, সেটা পুরুষ সহকর্মীদের সহযোগিতা নিয়ে সংসদেই আমরা ঠিক করব।'
বিএনপির স্বনির্ভর বিষয়ক সম্পাদক শিরীন সুলতানা বলেন, নারী নেতৃত্বের শর্তপূরণের বিধান বাস্তবায়নের সময়সীমা জাতীয় ক্ষেত্রে পাঁচ বছর এবং তৃণমূলের ক্ষেত্রে আরেকটু বর্ধিত করা যেতে পারে। আর এই আইন বাস্তবায়নে নির্বাচন কমিশনের মনিটরিং সেল থাকতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকেও একটি মনিটরিং সেল করে সময় সময় বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা করতে হবে।
যুব মহিলা লীগের সভাপতি নাজমা আক্তার বলেন, নারীর ক্ষমতায়ন ও অন্তর্ভুক্তিকরণের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগই সবচেয়ে এগিয়ে। নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কথা না বলে এভাবে আরপিও সংশোধন করতে পারে না। তাদের আগে রাজনৈতিক দল ও তাদের নারী সংগঠনগুলোর সঙ্গে কথা বলতে হবে।
ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের চিফ অব পার্টি ড্যানা অলডস বলেন, আরপিওতে ৩৩ ভাগ নারী নেতৃত্ব নিশ্চিত করার আইনটি বাস্তবায়নের জন্য কোনো সময়সীমা না রাখার অর্থ হচ্ছে এই বিধানটি তুলে দেওয়ারই শামিল। নির্বাচন কমিশনের এই উদ্যোগ হতাশাজনক ও অপ্রত্যাশিত। এটা সমর্থন করা যায় না। রাজনৈতিক দলগুলোসহ নারী নেতৃত্ব ও সংশ্নিষ্ট সবার উচিত হবে এটা নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরা।
ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের উপপরিচালক লিপিকা বিশ্বাস তার প্রস্তাবনা তুলে ধরে বলেন, নারী নেতৃত্বের শর্ত পূরণে দুটি রোডম্যাপ করা যেতে পারে। একটিতে রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় পর্যায়ের জন্য ২০২৫ সালের মধ্যে ৩৩ শতাংশ পূরণের সময়সীমা এবং আরেকটিতে তৃণমূলের জন্য ২০২৫ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ ও ২০৩০ সালের মধ্যে ৩৩ শতাংশ পূরণের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া যেতে পারে। আর আইন না মানলে কী হবে, সেটিও নির্দিষ্ট থাকতে হবে।
রূপান্তর-এর নির্বাহী পরিচালক রফিকুল ইসলাম বলেন, নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে পৃথকভাবে চিঠি দিয়ে এটা জানতে চাইতে পারে, কেন ১০ বছরে নারী নেতৃত্বের শর্ত পূরণ করা যায়নি। আগামীতে কোন দল কত বছরে পূরণ করতে পারবে- সেটাও জানতে চাইতে পারে। এই শোকজের জবাব আসার পরই ইসি সেটা সবাইকে জানিয়ে একটা সিদ্ধান্তে আসতে পারে।
সমকালের সহকারী সম্পাদক শেখ রোকন বলেন, ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্ব পূরণের সময়সীমা তুলে দেওয়া কিংবা রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছার ওপর ছেড়ে দেওয়া হলে নারীর ক্ষমতায়ন ও অগ্রগতি কতটুকু অর্জন হবে তা মোটে পরিস্কার নয়। কাজেই এক্ষেত্রে একটা সময়সীমা থাকতেই হবে।
ডিবিসি নিউজের সিনিয়র রিপোর্টার ইশরাত জাহান উর্মি বলেন, ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্ব বাস্তবায়নের সময়সীমা কোনো অবস্থায়ই তুলে দেওয়া যাবে না। সবাই মিলে আওয়াজ তুলতে হবে নির্বাচন কমিশন যেন এটা করতে না পারে।
অনলাইন গোলটেবিল আলোচনায় আরও উপস্থিত ছিলেন ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের ডেপুটি চিফ অব পার্টি লেসলি রিচার্ড, সিনিয়র পরিচালক আমিনুল এহসান, প্রতিনিধি সোনিয়া রহমান এবং ইউএসএআইডির পলিটিক্যাল প্রসেস অ্যাডভাইজর লুবাইন চৌধুরী মাসুম।
- বিষয় :
- সমকাল
- ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল
- অনলাইন
- গোলটেবিল