কাজে আসছে না ২৫ কোটি টাকার চিকিৎসাযন্ত্র
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এনআইএলএমআরসি ভবনে ছয়তলা কক্ষে ফেলে রাখা হয়েছে যন্ত্রগুলো -সমকাল
তবিবুর রহমান
প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৫ | ০১:০৯ | আপডেট: ০৫ মে ২০২৫ | ১০:২০
বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার নির্ভুল ও দ্রুত প্রতিবেদন দিতে অটোমেশন ল্যাবের জন্য ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে গত বছর পাঁচটি চিকিৎসাযন্ত্র কিনেছিল ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টার (এনআইএলএমআরসি)। সঙ্গে এসব যন্ত্র চালনার জন্য কেনা হয়েছিল জেনারেটরও। কথা ছিল, গত বছরের জুলাইয়ে যন্ত্রগুলো সরবরাহ ও আগস্টে সেগুলো স্থাপন করা হবে। কিন্তু এখনও কোনো যন্ত্র স্থাপন করা হয়নি। পাঁচটির মধ্যে চারটি যন্ত্র সরবরাহ করা হলেও একটি যন্ত্র ও জেনারেটর পাওয়া যায়নি এখনও। অথচ যন্ত্র স্থাপনের আগেই পরিশোধ করে দেওয়া হয়েছে সেগুলোর ৮০ শতাংশ বিল।
যে পাঁচটি চিকিৎসাযন্ত্র কেনা হয়েছিল সেগুলো হলো– বায়োকেমিস্ট্রি অ্যানালাইজার, হরমোন অ্যানালাইজার, হেমাটোলজি অ্যানালাইজার, ইএসআর অ্যানালাইজার ও কোয়াগুলেশন অ্যানালাইজার। এর মধ্যে কোয়াগুলেশন অ্যানালাইজার এখনও পাওয়া যায়নি। এসব যন্ত্র পরিচালনার জন্য কেনা হয়েছিল ২০০ কেভিএ অটো জেনারেটর। সেটি এখনও দিতে পারেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এনআইএলএমআরসির একাধিক কর্মকর্তা জানান, যে চারটি যন্ত্র পাওয়া গেছে, সেগুলোও স্থাপনে দক্ষ জনবল না থাকায় গত বছরের অক্টোবর থেকে পড়ে আছে সেগুলো।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ের আশপাশে ৯টি বড় সরকারি হাসপাতাল রয়েছে। এসব হাসপাতালে রোগ নির্ণয় যন্ত্রগুলো অনেক পুরোনো। ফলে রোগীদের চাহিদা অনুযায়ী দ্রুত পরীক্ষা প্রতিবেদন দেওয়া যায় না। অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষার সিরিয়াল পেতে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়। ফলে বেশির ভাগ রোগীই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের দ্বারস্থ হন। এতে বেড়ে যায় চিকিৎসা খরচ। এই সংকট নিরসনে গত বছর এনআইএলএমআরসি ল্যাবকে অটোমেশন করার উদ্যোগ নেয় সরকার। ২০২৩ সালের অক্টোবরে আহ্বান করা হয় দরপত্র। তিন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দেয়।
সব যন্ত্র সরবরাহের কাজ পায় ওএমসি হেলথকেয়ার লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে জেনারেটরসহ যন্ত্রগুলো সরবরাহ এবং আগস্টের মধ্যে সেগুলো স্থাপনের কাজ সম্পন্ন করার কথা ছিল। তবে এখনও জেনারেটর ও কোয়াগুলেশন অ্যানালাইজার দিতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। প্রশিক্ষিত জনবল সংকটে সরবরাহ করা অন্য যন্ত্রগুলোও স্থাপন করা যাচ্ছে না। যন্ত্রগুলো স্থাপনে গত বছরের অক্টোবরে ভারতের একটি বিশেষজ্ঞ দল আনা হলেও কোনো কাজ হয়নি। এর পর থেকে পড়ে আছে সব যন্ত্র।
এনআইএলএমআরসি ভবনে গিয়ে দেখা যায়, ছয়তলার একটি কক্ষে যন্ত্রগুলো রাখা হয়েছে। জানা গেল, এসব যন্ত্রের সব একসঙ্গে স্থাপন করাতে হবে। তবে ছয়তলায় সে পরিমাণ জায়গা নেই। জায়গা বাড়ানোর জন্য পাশের কক্ষের দেয়াল ভাঙার কাজ চলছে। তবে বর্তমানে ম্যানুয়ালি পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলমান রয়েছে। ভবনের দ্বিতীয় তলাতে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়। সেখানে কথা হয় মো. আকাশ নামে এক রোগীর সঙ্গে। তিনি বলেন, তিন দিন হলো পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি। চিকিৎসক সিটিস্ক্যানসহ বেশ কিছু পরীক্ষা দিয়েছেন। এসব পরীক্ষা পঙ্গু হাসপাতালে দেরি হবে বলে এখানে এসেছি। তবে কর্তৃপক্ষ বলছে, আজ হবে না, সময় শেষ। গতকালও একই কথা বলেছে। এভাবে চললে গরিব মানুষ সেবা নেবে কোথা থেকে?
এনআইএলএমআরসি ল্যাবের এক কর্মকর্তা বলেন, দৈনিক এখানে ৭০০ থেকে ১০০০ রোগীর নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। এসব পরীক্ষা করাতে সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টার মধ্যে নিবন্ধন করতে হয় অনলাইনে। যারা এ সময়ের মধ্যে নিবন্ধন করতে না পারেন, তাদের পরের দিন আসতে বলা হয়। বর্তমানে এনআইএলএমআরসিতে যেসব যন্ত্রপাতি রয়েছে তা দিয়ে ঘণ্টায় ২০০ থেকে ২৫০টি পরীক্ষার প্রতিবেদন দেওয়া যায়। ল্যাব অটোমেশন হলে ঘণ্টায় ১২০০ প্রতিবেদন দেওয়া যেত। দিনের পরীক্ষার প্রতিবেদন দেওয়া যেত সেদিনই।
ওএমসি হেলথকেয়ার লিমিটেডের প্রধান বিক্রয় কর্মকর্তা গোলাম সারোয়ার যন্ত্রগুলো সরবরাহে দায়িত্ব পালন করেন। যন্ত্র সরবরাহে দেরির কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, জরুরি বৈঠকে আছি, পরে কথা হবে। পরে একাধিকবার ফোন দিলেও সাড়া মেলেনি।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ক্লিনিক্যাল বায়োকেমিস্টের (বিএসিবি) যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক ফাতেমা খান মজলিশ সমকালকে বলেন, ‘বিশ্বমানের প্রতিবেদন মেলে অটোমেশন ল্যাবে। রোগী নিবন্ধন করলেই তার রোগসংক্রান্ত বার্তা (ডায়াগনসিস রিপোর্ট) কেন্দ্রীয় সার্ভারের মাধ্যমে সংরক্ষণ করা হয় সেখানে। এমনকি পরীক্ষা-নিরীক্ষার সব তথ্য পৌঁছে যাবে রোগীর মেইলে। যে কোনো জায়গা থেকে এটি ডাউনলোড করা যাবে। চিকিৎসক ও রোগীরা সহজেই প্রতিবেদন দেখতে পাবেন। অনেক আগে থেকেই বেসরকারি হাসপাতালে এই ল্যাব চালু রয়েছে। সরকারি হাসপাতালে এই সেবা নিশ্চিত করতে পারলে রোগ নির্ণয়ে ভুলের সংখ্যা অনেক অংশে কমে যেত।
এনআইএলএমআরসি সূত্র জানায়, প্রতিষ্ঠানের সাবেক পরিচালক ডা. শাহেদ আলী জিন্নাহর সময় এসব যন্ত্র ক্রয়ে দরপত্র আহ্বান করা হয়। দরপত্রের নথি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, যন্ত্র স্থাপনের আগেই ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে ৮০ শতাংশ বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এই কাজে সহযোগিতা করেছেন খোদ শাহেদ আলী জিন্নাহ। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. শাহেদ আলী জিন্নাহ বলেন, ‘ল্যাব অটোমেশনের পরিকল্পনা আমার ছিল। তবে এই কেনাকাটার সঙ্গে আমি জড়িত নই। এটি কভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যানডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস শীর্ষক প্রকল্প থেকে কেনা হয়েছে। সেই সময় এ প্রকল্পের পরিচালক ছিলেন অধ্যাপক শাহ গোলাম নবী তুহিন। তাঁর মাধ্যমে বিল পরিশোধ করা হয়েছে।’
প্রতিষ্ঠানের পরিচালকের সই ছাড়া বিল পরিশোধ কীভাবে হয়– জানতে চাইলে ডা. শাহেদ আলী কোনো মন্তব্য করতে চাননি। গত ডিসেম্বরে তাঁর চাকরির মেয়াদ শেষ হয়েছে। জানা গেল, গত আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনে অধ্যাপক শাহ গোলাম নবীকে ওএসডি করা হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে জানতে ফোন করলে তাঁর নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। পরে জানা যায়, শাহ গোলাম নবী বর্তমানে দেশে নেই।
এনআইএলএমআরসির বর্তমান পরিচালক অধ্যাপক ডা. এম সাহাবুদ্দিন সমকালকে বলেন, যন্ত্র স্থাপনের আগে বিল পরিশোধ কেন করা হয়েছে বলতে পারব না। তবে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে যন্ত্রগুলো স্থাপনে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই যন্ত্র স্থাপনে ভারত থেকে একটি বিশেষজ্ঞ দল আসার কথা। তারা আসতে দেরি করছে। কত দিনের মধ্যে ল্যাব চালু করা যাবে, এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি তিনি।
- বিষয় :
- চিকিৎসাযন্ত্র