৯৬ শতাংশ নার্স কাজ করছেন কম বেতনে
কোলাজ
তবিবুর রহমান
প্রকাশ: ১২ মে ২০২৫ | ০১:২০ | আপডেট: ১২ মে ২০২৫ | ০৮:১৯
দেশে সরাসরি রোগীর সেবাদানকারী ৯২ শতাংশ নার্স কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। আবার বেশি কাজ করেও পেশাটির ৯৬ শতাংশ কর্মী কম বেতন পাচ্ছেন। নার্সদের সুরক্ষা ও অধিকার নিয়ে কাজ করা সোসাইটি ফর নার্সেস সেফটি অ্যান্ড রাইটসের (এসএনএসআর) জরিপে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাতিষ্ঠানিক বৈরিতা, উপযুক্ত পরিবেশের অভাব, রোগীর স্বজনের দুর্ব্যবহারসহ পেশাগত জীবনের নানা চাপের প্রভাব নার্সদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর পড়ছে।
এমন পরিস্থিতিতে অন্যান্য দেশের মতো আজ সোমবার বাংলাদেশে পালিত হচ্ছে ‘আন্তর্জাতিক নার্স দিবস’। দিবসের প্রতিপাদ্য– ‘আমাদের নার্স আমাদের ভবিষ্যৎ, অর্থনৈতিক শক্তি নার্সিং সেবার ভিত্তি’। দিবসটিতে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও নার্সদের সংগঠন নানা কর্মসূচি পালন করবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী, বাংলাদেশে চিকিৎসাসেবায় ৩ লাখ ১০ হাজার ৫০০ নার্স ও মিডওয়াইফারি প্রয়োজন। বর্তমানে ১ লাখ ৩ হাজার ১৫১ নার্স রয়েছে, যা চাহিদার তুলনায় ৩৩ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
অন্যদিকে প্রতিবছর বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি নার্সিং ইনস্টিটিউটে ৩৬ হাজার ২৪০ শিক্ষার্থী ভর্তি হন। গড়ে বছরে ১২ হাজার এ পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। ঘাটতির কারণে বাড়তি চাপ নিয়ে সেবা দিচ্ছেন নার্সরা। নার্স সংকট নিরসনে স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন বেশ কিছু সুপারিশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে নার্সিং ও মিডওয়াইফারি শিক্ষার মান এবং পেশাগত অনুশীলন উন্নয়নের জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যতা আনতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অব নার্সেসের মতো সংগঠনের গ্লোবাল কম্পিটেন্সি ফ্রেমওয়ার্ক গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিলের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রদানকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে নিয়মিত মূল্যায়ন এবং অ্যাক্রেডিটেশন প্রক্রিয়া চালুর মাধ্যমে নার্সিং ও মিডওয়াইফারি শিক্ষা-প্রশিক্ষণের মান উন্নয়নে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। নার্সিং ও মিডওয়াইফারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে উচ্চমান বজায় রাখতে নিয়মিত অডিট এবং মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করা জরুরি।
বাংলাদেশ নার্সেস অ্যাসোসিয়েশনের (বিএনএ) সভাপতি গোলাম মোরশেদ বলেন, নার্স সংকট দূর করতে রাষ্ট্রের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নেই। পড়াশোনা শেষ করে যেসব নার্স বের হচ্ছেন, তাদের কাজে লাগাতে পারছে না সরকার। ২০২১ সালের পর থেকে নার্স নিয়োগ হয়নি। বিদেশে প্রচুর চাহিদা থাকলেও সঠিক নীতিমালা ও আইনি জটিলতায় পাঠানো যাচ্ছে না। তিনি বলেন, দক্ষ নার্স তৈরি করতে হলে নীতিমালাবহির্ভূত প্রতিষ্ঠান বন্ধ করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানে শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়ন করতে হবে। বেতন কাঠামো পুনর্বিবেচনা, উপযুক্ত স্বীকৃতি ও সম্মান নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর দেশে মোট ৩৬ হাজার ২৪০ জন নার্সিংয়ে ভর্তি হচ্ছেন। তাদের মধ্যে গড়ে ১২ হাজার নার্স ও মিডওয়াইফ পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিলের (বিএনএমসি) সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে নিবন্ধিত নার্স ১ লাখ ৩ হাজার ১৫১ জন।
সোসাইটি ফর নার্সেস সেফটি অ্যান্ড রাইটসের (এসএনএসআর) মহাসচিব সাব্বির মাহমুদ তিহান বলেন, নার্স সংকটে রোগীরা পর্যাপ্ত সেবা পাচ্ছেন না। রোগীদের বিদেশমুখী হওয়ার অন্যতম কারণও এটি। উন্নত বিশ্বের তুলনায় এ দেশে নার্সদের বেতন ৭০-৮০ শতাংশ কম। নার্সরা মানসিক ও শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। এ জন্য দায়ী সরকারি অব্যবস্থাপনা। তিনি বলেন, অতিরিক্ত রোগীর সেবা দিতে গিয়ে নার্সরাই আক্রান্ত হচ্ছেন শারীরিক ও মানসিক রোগে। তাছাড়া অপ্রতুল বেতন ও সামাজিক মর্যাদা নিয়ে নার্সদের মধ্যে চরম অসন্তোষ রয়েছে।
নিয়োগে পেছন সারিতে
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বর্তমানে প্রায় ২৯ কোটি নার্স এবং ২ দশমিক ২ কোটি মিডওয়াইফ বিশ্বে স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছেন। তবে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, বার্ধক্য ও স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধির কারণে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৪ দশমিক ৫ কোটি নার্স ও ৩১ লাখ মিডওয়াইফের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
আরেকটি পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, এ ঘাটতির সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে নিম্ন ও নিম্নমধ্য আয়ের দেশগুলোতে। চাহিদা পূরণের জন্য অনেক দেশ ইতোমধ্যে বিদেশি নার্স নিয়োগের দিকে ঝুঁকছে। যেমন ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে নিবন্ধিত নার্সের সংখ্যা ছিল ৩১ লাখ ৭৫ হাজার ৩৯০। ২০২২ সালে যুক্তরাজ্যে ৭ লাখ ৪৮ হাজার, জার্মানিতে ১০ লাখ ৪ হাজার, জাপানে ১৭ লাখ ৩৪ হাজার এবং ২০২৩ সালে সৌদি আরবে ২ লাখ ৩৫ হাজার ৪৬১ জন নিবন্ধিত নার্স কাজ করেছেন। কিন্তু গত চার বছর বাংলাদেশ কোনো নার্স নিয়োগ দেয়নি।
সুপারিশ পেয়ে কাজ শুরু
বিএনএমসির রেজিস্ট্রার হালিমা আক্তার বলেন, নার্স সংকট দীর্ঘদিনের। এটি নিরসনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও কাউন্সিল কাজ করছে। তবে যে হারে নার্স তৈরি হচ্ছে, তার চেয়ে চাহিদা বেশি। এখন বিদেশেও নার্সের চাহিদা বেড়েছে। এ সংকট নিরসনে স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী কাজ শুরু হয়েছে। আগামী দু-এক বছরে সংকট নিরসন করা সম্ভব হবে না।
- বিষয় :
- নার্সিং কোর্স