শুল্ক নিয়ে দরকষাকষি
পণ্যের আইনি সুরক্ষায় মেধাস্বত্বে জোর যুক্তরাষ্ট্রের
শুল্ক নিয়ে ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা
কূটনৈতিক প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৫ | ১৯:৫৩ | আপডেট: ২৪ জুলাই ২০২৫ | ১৯:৫৪
বাংলাদেশে মার্কিন পণ্য নকল করা নিয়ে উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্র। বিশেষ করে পোশাক নকল করায় বাংলাদেশ শীর্ষ পাঁচ দেশের মধ্যে রয়েছে এবং এতে মার্কিন শ্রমিকসহ বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দাবি করা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে শুল্ক নিয়ে দরকষাকষিতে মেধাস্বত্ব অধিকারকে (আইপিআর) শক্তিশালী ও কার্যকর করার বিষয়ে জোর দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
সম্প্রতি বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক আলোচনা ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত হয়। এতে দুই দেশের মধ্যে বর্তমান ও ভবিষ্যত বাণিজ্যের গতি-প্রকৃতি কেমন হবে, সেসব বিষয় উপস্থাপন ও যুক্তি-তর্ক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বেশ কিছু বিষয়ে দুই দেশ মোটামুটিভাবে একমত হয়েছে। তবে কিছু বিষয় এখনও অমীমাংসিত রয়ে গেছে। শুল্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ন্যায্যতা প্রত্যাশা করে। আবারও দুই দেশ আলোচনায় বসবে। এ দরকষাকষিতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মেধাস্বত্ব অধিকারকে শর্ত হিসেবে যোগ করা হয়েছে। ঢাকা ও ওয়াশিংটন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
মার্কিন বাণিজ্য দপ্তরের (ইউএসটিআর) ২০২৪ ও ২০২৫ এর বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী নকল পোশাক তৈরির শীর্ষ পাঁচটি উৎসের মধ্যে একটি বাংলাদেশ। এটিকে উদ্বেগের বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন সংশ্লিষ্টরা। ট্রেডমার্ক আবেদন প্রক্রিয়াকরণে বা মেধাস্বত্ব নিবন্ধন পেতে বাংলাদেশে বেশ সময় লাগে। এটি বাজারে মেধাস্বত্ব অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা। গত ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা ফোরাম চুক্তি টিকফার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাংলাদেশে উচ্চ মাত্রার জালিয়াতি এবং মেধাস্বত্ব আইন হালনাগাদ করাসহ বিভিন্ন বিষয়ে জোর দেওয়া হয়।
বিশ্বব্যাপী নকল পণ্য প্রস্তুতকারক দেশ নিয়ে অগ্রাধিকার নজরদারির তালিকা এবং নজরদারির তালিকা তৈরি করে ইউএসটিআর। তবে এ দুটি তালিকায় নেই বাংলাদেশের নাম। অগ্রাধিকার নজরদারির তালিকায় তৈরি পোশাক শিল্পে বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী ভারত ও চীনের নাম রয়েছে। এছাড়া নজরদারির তালিকায় ভিয়েতনামের নামের পাশাপাশি রয়েছে পাকিস্তানের নাম।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বলছে, বাংলাদেশে সহজেই নকল পণ্য পাওয়া যায়। সরকার মেধাস্বত্ব অধিকার সুরক্ষায় অগ্রাধিকার দেয় না এবং পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করে না। মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো পোশাক, ভোগ্যপণ্য, চলচ্চিত্র, ওষুধ এবং সফ্টওয়্যারে মেধাস্বত্ব অধিকার লঙ্ঘনের কথা জানিয়েছে। আইপিআর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ এবং আমেরিকান চেম্বার অব কমার্সের মতো সংস্থাগুলোর প্রচেষ্টার মাধ্যমে মোধাস্বত্ব অধিকার সম্পর্কে জনসচেতনতা ধীরে ধীরে বাড়ছে।
বাংলাদেশ ধীরে ধীরে তার মেধাস্বত্ব আইনকে বাণিজ্য-সম্পর্কিত মেধাস্বত্ব অধিকারের চুক্তি (ট্রিপস) অনুযায়ী তৈরি করছে। বাংলাদেশ বিশ্ব মেধাস্বত্ব অধিকার সংস্থার (ডাব্লুআইপিও) সদস্য এবং মেধাস্বত্ব সম্পর্কিত প্যারিস কনভেনশনে যোগ দিয়েছে। ২০২৩ সালে কপিরাইট আইন, ২০২৩ সালে শিল্প নকশা আইন, ২০২২ সালে পেটেন্ট আইন, ২০০৯ সালে ট্রেডমার্ক আইন এবং ২০১৩ সালে পণ্যের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) আইন হালনাগাদ করেছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশে নকল পণ্য প্রস্তুতকারকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতাপ্রাপ্ত সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে রয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, কাস্টমস, মোবাইল কোর্ট, র্যা পিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যা ব), পুলিশ এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার। কিন্তু এ সংস্থাগুলোর আইপিআর অভিযোগে যথাযথ মনোযোগ দেওয়ার জন্য প্রশিক্ষণ এবং সম্পদের অভাব রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পুলিশকে নকল পণ্য প্রস্তুতকারকদের বিরুদ্ধে তথ্য দিলে কখনও কখনও তদন্ত করে, তবে নিজ থেকে এ নিয়ে তদন্ত করার আগ্রহ কম।
সরকারের উচ্চ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে সমকালকে বলেন, বাংলাদেশে নকল পণ্য তৈরি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ পুরোনো। একাধিকবার বিষয়টি আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় দেশটি তুলে ধরেছে। বাংলাদেশে নকল পণ্য তৈরির ফলে কিভাবে তাদের শ্রমিকরা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে, তাও জানিয়েছে ওয়াশিংটন।
বাংলাদেশে যত কম্পিউটার চলে, তাতে যে অপারেটিং সিস্টেম বা সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়, তার ৯৯ শতাংশ পাইরেটেড বা নকল। এ অপারেটিং সিস্টেম বা সফটওয়্যারগুলো যদি আসল ব্যবহার করতে হতো, তাহলে বাংলাদেশে কম্পিউটারের দাম অনেক বেশি পড়তো। আসল পণ্য মার্কিন অর্থনীতিতে অবদান রাখতো। তবে শুল্ক দরকষাকষিতে শর্ত নিয়ে তিনি বলেন, আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক ১৩টি কনভেনশন ও চুক্তিতে বাংলাদেশকে সই করতে বলেছে। এর অনেকগুলোতে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে সদস্য।
যুক্তরাষ্ট্র বলছে, এ ১৩টি কনভেনশন ও চুক্তিতে সই করার পাশাপাশি এ সংক্রান্ত আইন বাংলাদেশে প্রণয়ন করতে হবে। সেই সঙ্গে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতেও শর্ত জুরে দিয়েছে ওয়াশিংটন। এর পাশাপাশি বাংলাদেশে মার্কিন পণ্যের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিতে এবং নকল পণ্য তৈরি রোধে আরও ১১টি শর্ত দিয়েছে ওয়াশিংটন।
- বিষয় :
- পণ্য
- যুক্তরাষ্ট্র
- নকল পণ্য
