যে আকাঙ্ক্ষায় রিয়াজ শহীদ হয়েছে, তা পূরণ হয়নি
রিয়াজ হোসেন
তবিবুর রহমান
প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৫ | ০০:৪১ | আপডেট: ০৬ আগস্ট ২০২৫ | ০৯:৫৮
যে আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশা নিয়ে রিয়াজ হোসেন শহীদ হয়েছে, তা পূরণ হয়নি। মানুষের শান্তি চেয়ে দেশের জন্য লড়াই করেছে; কিন্তু শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এখনও হানাহানি বন্ধ হয়নি, দূর হয়নি বৈষম্য। মানুষের মধ্যে আতঙ্ক। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। সরকারের উচিত, দেশের শান্তি নিশ্চিত করা, মানুষ কীভাবে শান্তিতে বসবাস করতে পারে তার ব্যবস্থা করা।
গতকাল মঙ্গলবার সকালে ঢাকা জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠান শেষে সমকালের সঙ্গে আলাপকালে শহীদ রিয়াজের মা শেফালী বেগম এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘দেশ মুক্ত হওয়ার পর মানুষ দলে দলে বিভক্ত হয়েছে। জুলাইয়ে যে ঐক্য নিয়ে স্বৈরাচার থেকে মুক্তি এসেছে, তাতে ফাটল ধরেছে। আমাদের প্রত্যাশা, আবার ঐক্য ফিরে আসুক। মানুষের মধ্যে মানুষের জন্য ভালোবাসা জেগে উঠুক।’ তিনি বলেন, ‘সরকারের কাছে আমাদের একটি প্রত্যাশা, যে স্বৈরাচার হাসিনার কারণে এত মানুষকে জীবন দিতে হয়েছে, তাঁর দোসরদের বিচার করতে হবে। আমাদের আর কিছু চাওয়ার নেই। এ সরকারের কাছে প্রত্যাশা, গণহত্যায় জড়িত সবার বিচার নিশ্চিত করতে হবে। বিচারের আগে নির্বাচন নয়। আমরা কোনো নির্বাচন চাই না।’
ছেলে হারানোর দিনের কথা স্মরণ করে শেফালী বেগম বলেন, ১৯ জুলাই বিকেলে কেরানীগঞ্জের বাসা থেকে বের হয় রিয়াজ। কোটা সংস্কার আন্দোলনে যোগ দিতে অন্যান্য শিক্ষার্থীর সঙ্গে সে বছিলা ব্রিজ পেরিয়ে মোহাম্মদপুরে অবস্থান নেয়। মোহাম্মদপুর এলাকায় মাথায় গুলি লেগে নিহত হয় রিয়াজ। তার লাশ পড়ে ছিল সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গে। অনেক জায়গায় খোঁজার পর ২০ জুলাই বিকেলে রিয়াজের লাশের সন্ধান পাই।
তিনি জানান, জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান চলাকালে সক্রিয় কর্মী হিসেবে রিয়াজ সামনের সারিতে থাকত। মিছিলের সামনে থেকেই সে শহীদ হয়েছে। ওই দিনের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘রিয়াজকে আটকানো যাচ্ছিল না। সে কোনো বারণ শুনবে না। এ অবস্থায় শেষের দিন (১৯ জুলাই) আমি মোবাইল ফোন হাতে তুলে দিয়ে রিয়াজকে বলেছিলাম, সাবধানে থাইকো। সে বলছিল, আমি যদি মারাও যাই, তুমি তো শহীদের মা হবা। তারপর সে চলে গিয়েছিল।’ শেফালী বেগম বলেন, ‘ছেলে ইস্পাহানি ডিগ্রি কলেজের অনার্স প্রথম বর্ষে পড়ত। আমাকে বলত, সবাই যদি ঘরে থাকে, তাহলে শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবি কখনও পূরণ হবে না।’
কেরানীগঞ্জ মডেল থানার তারানগর ইউনিয়নের ছোট ভাওয়াল গ্রামের আসাব উদ্দিনের তিন ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে সবার ছোট ছিল রিয়াজ। রিয়াজের মা বলেন, ‘বাবা ও দুই ভাই কৃষিকাজ করে কোনো রকম সংসার চালায়। সবার ছোট রিয়াজকে নিয়ে আমাদের অনেক স্বপ্ন ছিল। ওর ইচ্ছা ছিল পড়াশোনা শেষ করে সরকারি চাকরি করবে। ও বলত, এ আন্দোলন না করলে মেধাবীদের অনেকেই নাকি চাকরি পাবে না। আমার কলিজার টুকরা সন্তানকে যারা মেরেছে, আল্লাহ তাদের উপযুক্ত বিচার করবেন।’
বাবার সঙ্গে কৃষিকাজের পাশাপাশি লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছিলেন রিয়াজ। বাড়তি উপার্জনের আশায় কিছুদিন ধরে একটি কুরিয়ার সার্ভিসে ডেলিভারিম্যানের চাকরি নেন। ইচ্ছে ছিল সরকারি চাকরি করার। বাবা আসাব উদ্দিন বলেন, ‘আমার বাবা আওয়ামী লীগ করতেন, আমিও আওয়ামী লীগ
করি। আমার ছেলে কোনো দল করত না। আমার ছেলেকে কেন এভাবে মরতে হলো? আমি ছেলে হত্যার বিচার চাই।’
- বিষয় :
- শহীদ পরিবার
