সাপের বিষের প্রতিষেধক দেশে উৎপাদনের উদ্যোগ
.
তবিবুর রহমান
প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৫ | ০১:০৯
সাপের ছোবলে মৃত্যুর হার কমাতে দেশীয় ব্যবস্থাপনায় অ্যান্টিভেনম (সাপের বিষের প্রতিষেধক) উৎপাদনের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সিরাজদীখানের কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে উৎপাদন কারখানা স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সব কিছু ঠিক থাকলে এ বছরের ডিসেম্বর মাসে অবকাঠামো নির্মাণ শুরু হবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন এসেনসিয়াল ড্রাগসের (ইডিসিএল) মাধ্যমে অ্যান্টিভেনম তৈরি করা হবে। ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠানটিকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। ইডিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সামাদ মৃধা জানান, আগামী সপ্তাহে একটি বিশেষজ্ঞ দল সিরাজদীখানে জায়গা পরিদর্শনে যাবে। তারপর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে প্রতিবেদন দেওয়া হবে।
মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, দেশে প্রতি বছর চার লাখের বেশি মানুষকে সাপে ছোবল দেয় এবং আক্রান্ত হন অন্তত ৯৬ হাজার ৫০০ জন। দেশে ১১ প্রজাতির বিষধর সাপ থাকলেও ভারত থেকে আনা অ্যান্টিভেনম কেবল গোখরা, শঙ্খিনী ও চন্দ্রবোড়া সাপের বিষের বিরুদ্ধে কাজ করে। অন্য সাপের ক্ষেত্রে এই অ্যান্টিভেনম ভালো কাজ করে না। ফলে অনেক সময় রোগীর মৃত্যু হয়। দেশীয় ব্যবস্থাপনায় প্রতিষেধক উৎপাদন করতে পারলে মৃত্যুর সংখ্যা কমানো সম্ভব।
স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নুরজাহান বেগম বলেন, ‘আমদানি করা একটি অ্যান্টিভেনমের দাম ১২ হাজার টাকা। মূল্য বেশি হওয়ায় উপজেলা হাসপাতালগুলোতে চার-পাঁচটির বেশি সরবরাহ করা যায় না। আমরা যদি নিজস্ব উৎপাদনে যেতে পারি, তাহলে সুরক্ষা বাড়বে এবং খরচও অনেক কমে যাবে। এই লক্ষ্যেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কাজ করছে।’ তিনি জানান, ‘প্রথমে সরকারি ভর্তুকিতে কারখানা চালু করা হবে, পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে প্রকল্পটি লাভজনকভাবে পরিচালিত হবে।’
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশনা অনুযায়ী, স্থানীয় সাপ থেকে তৈরি অ্যান্টিভেনমই সবচেয়ে কার্যকর। কারণ একেক দেশের সাপের প্রকৃতি একেক রকম। ভারতে যেসব সাপের বিষ থেকে অ্যান্টিভেনম তৈরি হয়, সেগুলোর মাত্র ২০ শতাংশ বাংলাদেশের সাপের সঙ্গে মেলে। তবু বছরের পর বছর ধরে ওই অ্যান্টিভেনমই বাংলাদেশে ব্যবহার হচ্ছে। সামুদ্রিক সাপ, পিট ভাইপার ও দুর্লভ ক্রেইট প্রজাতির সাপের বিষের ক্ষেত্রে ভারতের অ্যান্টিভেনম অকেজো।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. ফয়েজ বলেন, আমাদের দেশে ব্যবহৃত অ্যান্টিভেনমগুলো দক্ষিণ ভারতের চার ধরনের সাপ থেকে তৈরি। এগুলো অনুন্নত ও প্রায় শতবর্ষ পুরোনো প্রযুক্তিতে প্রস্তুত করা হয়। ফলে অ্যান্টিভেনম ব্যবহারের পরও ২০-২২ শতাংশ রোগী মারা যান। অন্তত সব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টার সমন্বিত চিকিৎসাসেবা চালু করা গেলে মৃত্যুর হার কমানো সম্ভব।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৪ সালে হাসপাতালে সাপের ছোবলে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর সংখ্যা ছিল ২৪ হাজার ৪৩২ জন। তাদের মধ্যে মারা যান ১১৮ জন। আক্রান্তদের অনেকেই প্রথমে ঝাড়ফুঁকের জন্য ওঝা বা বৈদ্যের শরণাপন্ন হন।
অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. সৈয়দ জাকির হোসেন জানান, সবচেয়ে বেশি সাপের ছোবলের ঘটনা বরিশালে। তবে মৃত্যুহার বেশি পদ্মাপারের বৃহত্তর ফরিদপুর ও রাজশাহী অঞ্চলে। এই এলাকাগুলোতে বিষধর সাপের উপস্থিতি বেশি।
ভেনম সংগ্রহ ও গবেষণা
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আর্থিক সহায়তায় পাঁচ বছরমেয়াদি একটি অ্যান্টিভেনম প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এতে কাজ করছেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ ও জার্মানির গ্যোটে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞরা।
চমেকের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও ভেনম রিসার্চ সেন্টারের সমন্বয়ক ডা. আব্দুল্লাহ আবু সাঈদ জানান, আমরা দেশে থাকা ১১ প্রজাতির বিষধর সাপের ভেনম ইতোমধ্যে সংগ্রহ করেছি। প্রায় দেড় কেজি ভেনম আমাদের হাতে রয়েছে।
অ্যান্টিভেনম হলো এক ধরনের ওষুধ, যা বিষাক্ত প্রাণী যেমন– সাপ, মাকড়সা বা বিচ্ছুর কামড়ের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। এটি বিষের বিরুদ্ধে কাজ করে এবং শরীরে বিষের প্রভাব কমাতে সাহায্য করে। অ্যান্টিভেনম মূলত বিভিন্ন প্রাণীর শরীর থেকে তৈরি করা হয়; যেখানে তাদের অল্প পরিমাণে বিষ ইনজেকশন করা হয় এবং তাদের শরীর থেকে অ্যান্টিবডি সংগ্রহ করা হয়। এই অ্যান্টিবডিগুলি পরে বিষের প্রভাবকে নিষ্ক্রিয় করতে ব্যবহৃত হয়।
অ্যান্টিভেনম তৈরি করার জন্য প্রথমে একটি নির্দিষ্ট প্রাণীর (যেমন ঘোড়া বা ভেড়া) শরীরে অল্প পরিমাণে বিষ ইনজেকশন করা হয়। এই ইনজেকশনের ফলে প্রাণীর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, যা পরে সেই বিষের বিরুদ্ধে কাজ করে।
- বিষয় :
- সাপের বিষ
