সমকাল এক্সপ্লেইনার
জাকসু নির্বাচনে সেনা চাওয়ার কারণ কী
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার। ছবি: সংগৃহীত
তারেক হোসেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৫ | ২০:১২ | আপডেট: ২১ আগস্ট ২০২৫ | ২১:৪৯
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) নির্বাচনের ভোটগ্রহণ আগামী ১১ সেপ্টেম্বর। ওইদিন ও আগে-পরের দুই দিন ক্যাম্পাসে নিরাপত্তার জন্য সেনা মোতায়েন চায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। যেটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন বিরোধী বলেছেন কয়েকজন শিক্ষক। নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থীদের কয়েকজনও বলেছেন, পরিস্থিতি অনুকূলে আছে।
এ অবস্থায় সেনা মোতায়েন চাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করেছে প্রশাসন। সেনা মোতায়েন চেয়ে সেনাপ্রধান বরাবর চিঠি পাঠানো হয় ১৩ আগস্ট। ওই চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন রেজিস্ট্রার এ বি এম আজিজুর রহমান। তিনি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বলেছেন, যতটুকু মনে পড়ে নিরাপত্তাজনিত বিষয়টি কারণ হিসেবে উল্লেখ আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক সোহেল আহমেদ এবং প্রক্টর অধ্যাপক এ কে এম রাশিদুল আলমের সঙ্গে কথা বলে কয়েকটি কারণ জানা গেছে। রাশিদুল আলম জাকসু নির্বাচন কমিশনের সদস্যসচিব।
কারণগুলোর মধ্যে প্রথমত, নির্বাচনে পুলিশের ওপর আস্থা রাখতে পারছে না প্রশাসন। দ্বিতীয়ত, ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে সহিষ্ণুতার অভাব এবং তৃতীয়ত, যেকোনো সংকট মোকাবিলার আগাম প্রস্তুতির স্বার্থে।
অধ্যাপক সোহেল আহমেদ বলছেন, গত বছরের ৫ আগস্টের পর দেশজুড়ে পুলিশ বাহিনীকে অকার্যকর হয়ে যেতে দেখেছি। সেনাবাহিনীকে যেহেতু ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তাই নির্বাচন কমিশনের অনুরোধে আমরা সেনাপ্রধান বরাবর চিঠি পাঠিয়েছি।
উপ-উপাচার্য বলছেন, জাকসু নির্বাচনে কোনো অনিশ্চয়তা বা নিরাপত্তাহীনতা রাখতে চাই না। যেকোনো সংকট মোকাবিলায় সেনা মোতায়েনের মতো সর্বোচ্চ নিরাপত্তার প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে চাই। তবে এখনো সেনাবাহিনী থেকে সাড়া পাইনি।
মোতায়েন হলে সেনাবাহিনীর ভূমিকা কেমন হবে? প্রক্টর রাশিদুল আলম বলছেন, ক্যাম্পাসে সেনাবাহিনী স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে থাকবে। তারা টহল দেবে। পাশাপাশি পুলিশ সদস্যরাও স্ট্রাইকিং ফোর্সের ভূমিকায় থাকবে।
আগে কী হয়েছিল
প্রথম জাকসু নির্বাচন হয় ১৯৭২ সালে। এ পর্যন্ত নয়বার নির্বাচন হয়েছে। সবশেষ নির্বাচন হয় ১৯৯২ সালে। তখনকার শিক্ষার্থী নাজমুল মানছুর বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক। তিনি সবশেষ চারটি জাকসু নির্বাচন দেখেছেন। তিনটিতে নিজেই অংশ নিয়েছিলেন। ’৯২ সালে সালাম-বরকত হল সংসদের সমাজসেবা সম্পাদক ছিলেন তিনি।
অধ্যাপক নাজমুল মানছুর বলছেন, জাকসু নির্বাচনের ইতিহাসে আগে কখনো সেনা মোতায়েন হয়েছে, এমন তথ্য তাঁর জানা নেই। বিগত নির্বাচনে আগে ও পরে কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ছিল, কিন্তু সেনা মোতায়েন হয়নি।
নাজমুল মানছুর আরও বলেন, সবশেষ নির্বাচনের আগে বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছিল। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তা নিয়ন্ত্রণ করে। বর্তমান পরিবেশ নির্বাচনের জন্য যথেষ্ট অনুকূলে। প্রশাসন কেন সেনা মোতায়েনের প্রয়োজন মনে করলো বুঝতে পারছি না।
ছাত্র থাকাকালে জাকসুর সবশেষ তিনটি নির্বাচনে ভোট দিয়েছিলেন বর্তমানে পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জামাল উদ্দিন রুনু। তিনি বলেন, ১৯৯১ সালের নির্বাচনের আগে ছাত্রদলের লোকাল ও অ্যান্টি লোকাল পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছিল। এতে তিনিসহ আটজন আহত হন। তখন পুলিশ মোতায়েন হলেও ক্যাম্পাসের মূল ফটকের বাইরে থাকতো। বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্তশাসিত। এটা গর্বের বিষয়। সেনা মোতায়েন হলে সেটি স্বায়ত্তশাসনের চেতনাবিরোধী হবে।
জাকসুর দুই নেতা খুন
১৯৭২ সালে জাকসুর প্রথম সহসভাপতি (ভিপি) ছিলেন গোলাম মোর্শেদ। সাধারণ সম্পাদক (জিএস) ছিলেন শাহ বোরহানউদ্দিন রোকন। গোলাম মোর্শেদ কোনো সংগঠন না করলেও জাসদ ছাত্রলীগের রাজনীতি করতেন বোরহানউদ্দিন।
সম্প্রতি একটি গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক নুরুল হক জানান, জিএস হওয়ার পর বোরহানউদ্দিন নারায়ণগঞ্জে খুন হন। ১৯৭৩ সালে ক্যাম্পাসের আল বেরুনী হলে নিজ কক্ষে খুন হন জাকসুর দ্বিতীয় সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হক।
বোরহানউদ্দিন ও মোজাম্মেল হকের কবর বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াজেদ মিয়া বিজ্ঞান গবেষণাগারের পাশে। বোরহানউদ্দিনের নামে পুরাতন কলা ভবনের সামনে একটি গ্রন্থাগার আছে। এটি পরিচালনা করে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের একাংশ।
শিক্ষার্থীরা যা বলছেন
সেনা মোতায়েন হলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ ও ভয়ের মনোভাব তৈরি হতে পারে। এমনটা মনে করছেন জাহাঙ্গীরনগর সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সভাপতি শরণ এহসান। তিনিও এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী। শরণ বলেন, আমরা সেনা মোতায়নের মতো পরিস্থিতি দেখছি না। প্রশাসন নিজস্ব বাহিনীর পাশাপাশি পুলিশের সহায়তা নিয়ে নিরাপত্তা জোরদার করতে পারে।
বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে- প্রশাসন এমনটা অনুভব করলে সেনা মোতায়েনে আপত্তি নেই ছাত্রশিবিরের নেতৃত্বে ‘সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেলের জিএস প্রার্থী মাজহারুল ইসলামের। তবে প্রশাসনের নিজস্ব সক্ষমতা থাকা উচিত বলে মনে করেন তিনি।
বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদের (বাগছাস) নেতৃত্বে ‘শিক্ষার্থী ঐক্য ফোরাম’ থেকে ভিপি পদে নির্বাচন করবেন আরিফুজ্জামান উজ্জ্বল। তিনি বলেন, বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পুনর্বিবেচনা করা উচিত।
