ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বদরুদ্দীন উমরের প্রয়ান

এক আপসহীন নক্ষত্রের বিদায়

এক আপসহীন নক্ষত্রের বিদায়
×

বদরুদ্দীন উমরের শোকাহত পরিবারকে রোববার সমবেদনা জানাতে যান অনেকে। ছবি: সমকাল

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৭:০২

বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে তাঁর জীবন ছিল একাকার। ছয় দশকের রাজনৈতিক সক্রিয়তা, ১২০টিরও বেশি গ্রন্থ, দীর্ঘ সম্পাদকীয় জীবন তাঁকে করে তোলে বাংলাদেশের রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তির ইতিহাসে এক অবিচ্যুত নক্ষত্র। অকপট কলমে, কণ্ঠে ও কর্মে প্রতিফলিত হয়েছে নিপীড়িত মানুষের মুক্তির অনন্ত আকাঙ্ক্ষা। বাংলার আকাশ থেকে আপসহীন সেই নক্ষত্র বদরুদ্দীন উমরের বিদায় ঘটল।  গতকাল রোববার সকালে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে বিশিষ্ট এই চিন্তক শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৩ বছর ৮ মাস। 

বদরুদ্দীন উমর স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলে রেখে গেছেন। ছোট মেয়ে সারা আকতার ছিলেন তাঁর প্রধান সঙ্গী ও সেবাযত্নকারী।

জীবন সায়াহ্নে এসেও বদরুদ্দীন উমরের রাজনৈতিকতা ছিল অটুট। গত বছর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চূড়ান্ত পর্যায়ে ৪ আগস্ট এক সাক্ষাৎকারে তিনি সমকালকে বলেছিলেন, ‘জনগণের মনে সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ১৫ বছরের ক্ষোভ জমে আছে। জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি, ব্যাপক চুরি-দুর্নীতি, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট, চারদিকে জেলজুলুম, নির্যাতন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতাহীনতা, সব সময় ভীত-সন্ত্রস্ততা। এই আন্দোলন জনগণের সেই সুপ্ত ক্ষোভ প্রকাশের সুযোগ করে দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ছাত্র আন্দোলন ১৯৫২ সালের মতোই বিরাট গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয়েছে।’ আর চলতি বছর ১৮ জুলাই এক আলোচনা সভায় বদরুদ্দীন উমর বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে দক্ষিণপন্থিদের উত্থান হয়েছে।

আজ সোমবার সকাল ১০টায় সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য বদরুদ্দীন উমরের মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাখা হবে। বাদ জোহর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে জানাজা শেষে জুরাইন কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হবে।

জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সম্পাদক ফয়জুল হাকিম এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, জুরাইন কবরস্থানে বদরুদ্দীন উমরের মা-বাবা ও ফুফুর কবর রয়েছে। তাঁর ইচ্ছানুযায়ী সেখানে দাফন করা হবে। 

হাসপাতালের দায়িত্বরত এক চিকিৎসক জানান, বদরুদ্দীন উমর দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় আক্রান্ত ছিলেন। রোববার সকালে তিনি শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা নিয়ে সকাল ১০টার দিকে হাসপাতালে আসেন। জরুরি বিভাগের তাঁর চিকিৎসা দেওয়া হয়। কিছু সময়ের মধ্যে তাঁর মৃত্যু হয়।

১৯৩১ সালের ২০ ডিসেম্বর বর্ধমান জেলায় জন্মগ্রহণ করেন তাত্ত্বিক, ইতিহাসবিদ ও রাষ্ট্রচিন্তক বদরুদ্দীন উমর। তাঁর বাবা আবুল হাশিম ছিলেন বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং উপমহাদেশের প্রভাবশালী রাজনীতিক। 

চিন্তা ও রাজনীতির ভিন্ন স্রোত

১৯৬৪ সালে ভিয়েতনামে মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সংগঠিত করা, মার্কিন দূতাবাসের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করা তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির পূর্বাভাস। বদরুদ্দীন উমর প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনে পড়াশোনা করেন এবং পরে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। দেশে ফিরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন।

বদরুদ্দীন উমর সমকালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘প্রথম জীবনে পিতার প্রভাবে এক ধরনের ইসলামী চিন্তার আচ্ছন্নতায় ছিলাম। যে কারণে ঢাকায় আসার পরও তমদ্দুন মজলিসের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলাম। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকে ধীরে ধীরে তা কাটতে শুরু করে। তারপর অক্সফোর্ডে যাওয়ার পর মার্কসবাদী চিন্তা-ভাবনা পূর্ণতা পায়। সেখানে থাকার সময় আমি তৎকালীন বিশ্বের সব ধরনের চিন্তাভাবনার সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করেছি।’ 

১৯৬৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর গভর্নর মোনায়েম খানের স্বৈরতান্ত্রিক আচরণের প্রতিবাদে মাত্র ৩৭ বছর বয়সে বদরুদ্দীন উমর ত্যাগ করেন এক সম্ভাবনাময় একাডেমিক জীবন। তিনটি প্রাথমিক গ্রন্থ– সাম্প্রদায়িকতা (১৯৬৬), সংস্কৃতির সংকট (১৯৬৭), সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা (১৯৬৮) প্রকাশের পর পাকিস্তানি রাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁর মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছে যায়। তখন তিনি স্থির করেন, অধ্যাপনা বাদ দিয়ে নিপীড়িত মানুষের মুক্তির লড়াই হবে জীবনের একমাত্র পেশা। বেছে নেন এক অনিশ্চিত অথচ অবিচল পথ– মার্কসবাদী রাজনীতি ও গবেষণার।

বাংলাদেশে বামপন্থি বা সমাজ বদলের রাজনীতির এক দীপ্তি তিনি। বুর্জোয়া রাজনীতির স্বরূপ, সমাজ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীর বিশ্লেষণ এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের ওপর শতাধিক গ্রন্থ প্রমাণ করে যে, বদরুদ্দীন উমর শুধু রাজনীতিক ছিলেন না; ছিলেন একজন গভীর তাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদ। স্বাধীনতার পর বাম রাজনীতির দুরবস্থা তাঁর দৃষ্টিতে আকস্মিক নয়; এর মূল কারণ দেশভাগ-পরবর্তী দমননীতি, নেতৃত্বহীনতা ও শ্রেণি-সংঘাতের ইতিহাস।

স্বাধীনতার পর সংগঠিত করেছেন বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের মঞ্চ বাংলাদেশ লেখক শিবির, নেতৃত্ব দিয়েছেন কৃষক সংগঠনের। ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে সম্পাদনা করছেন মাসিক ‘সংস্কৃতি’ পত্রিকা। একুশে পদক, আদমজী পুরস্কার, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ইতিহাস পরিষদ পুরস্কার, ফিলিপস পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন তিনি।

শোক

বদরুদ্দীন উমরের মৃত্যুতে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক সংগঠন ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা শোক প্রকাশ করেছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এক শোকবার্তায় বলেন, বদরুদ্দীন উমর ছিলেন আমাদের মুক্তবুদ্ধি ও প্রগতির সংগ্রামের এক উজ্জ্বল বাতিঘর। ভাষা আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা, গবেষণা, ঔপনিবেশিক মানসিকতার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ এবং সমাজতান্ত্রিক দর্শনের প্রতি তাঁর অবিচল নিষ্ঠা আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছে।

বদরুদ্দীন উমর স্বৈরাচারী সরকারের পরিবর্তনের জন্য গোড়া থেকেই গণঅভ্যুত্থানের কথা বলেছেন এবং জুলাই আন্দোলনকে উপমহাদেশের একটি অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানের স্বীকৃতি দিয়েছেন।

এক শোকবার্তায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, বদরুদ্দীন উমর বারবার রাজরোষে পড়া সত্ত্বেও তিনি আদর্শ বাস্তবায়নে ছিলেন আপসহীনভাবে স্থির। স্বৈরতন্ত্রকে উপেক্ষা করে তিনি তাঁর স্বাধীন মতামত প্রকাশে কখনোই কুণ্ঠিত হননি। তিনি এ দেশে ছিলেন স্বাধীন বিবেকের এক প্রতীক।

আরও পড়ুন

×