ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

করোনাকালে বিচার বিভাগ : ১

আস্থার সংকটে ভার্চুয়াল আদালত

আস্থার সংকটে ভার্চুয়াল আদালত
×

আবু সালেহ রনি

প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ২৪ জুলাই ২০২০ | ১৫:০৮

উন্নত বিশ্বের আদলে করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশেও ডিজিটাল তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে শুরু হয়েছে ভার্চুয়াল আদালতের কার্যক্রম। গত ২৫ মার্চ থেকে নিয়মিত আদালতে বিচারকাজ বন্ধ হওয়ার পর আইন সংশোধন করে ১১ মে দেশে প্রথমবারের মতো ভার্চুয়াল আদালতের কার্যক্রম শুরু করা হয়। দেশের যে কোনো প্রান্ত থেকেই এখন বিচারক, আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীরা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মামলার শুনানিতে অংশ নিচ্ছেন। শুনানির পর আদেশও দিচ্ছেন বিচারকরা। করোনা সংক্রমণ ঝুঁকি এড়িয়ে বিচারকাজ অব্যাহত রাখতে এটি দেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে অনন্য দৃষ্টান্ত।

গত আড়াই মাসে দেশের উচ্চ ও অধস্তন ভার্চুয়াল আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন ৬৯৮টি শিশুসহ ৬০ হাজার ৪০৭ আসামি। এ সময় এক লাখ ২০ হাজার ৯৪০টি জামিন আবেদনের শুনানি গ্রহণ করা হয়েছে। তবে ভার্চুয়াল আদালত শুরু হওয়ার পর বিচারক, আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের যে 'উচ্ছ্বাস ও আগ্রহ' ছিল তাতে ক্রমেই ভাটা পড়েছে। কারণ ভার্চুয়াল আদালতকে শুধু জামিন ও জরুরি বিষয়াদি শুনানির এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে; মামলার বিচার বা রায় দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। তা ছাড়া ভার্চুয়াল আদালত পরিচালনায় বিচারকদের প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল উপকরণের ঘাটতি বা এগুলোর ক্রয়ে বরাদ্দ না থাকা এবং আইনজীবীদের প্রশিক্ষণ এবং উপকরণের ঘাটতিও অন্যতম। প্রস্তুতি ছাড়াই ভার্চুয়াল আদালত চালু করায় সাইবার নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

এদিকে এক মাস ধরে সুপ্রিম কোর্টসহ দেশের বিভিন্ন জেলা আইনজীবী সমিতি প্রাঙ্গণে নিয়মিত আদালত খোলার দাবিতে সমাবেশ কর্মসূচি পালন করছেন আইনজীবীরা। ১৬ জুলাই প্রধান বিচারপতির বাসভবন অভিমুখে পদযাত্রা কর্মসূচিও পালন করেছেন তারা।

এ প্রসঙ্গে আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলছেন, 'ভার্চুয়াল আদালত যেভাবে চলছে, তা না চলারই শামিল।' তিনি বলেন, 'এর মাধ্যমে শুধু জামিনের শুনানি হচ্ছে। কোনো মামলার রায় বা বিচার হচ্ছে না। এই অচলাবস্থা দূর করার জন্য ভার্চুয়াল আদালতের এখতিয়ার বাড়িয়ে আরও সক্রিয় করা প্রয়োজন। নয়তো স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিয়মিত আদালত খুলে দিতে হবে। কারণ করোনা পরিস্থিতি কতদিন থাকবে, তা কারও পক্ষেই বলা সম্ভব নয়।'

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, 'ভার্চুয়াল আদালত নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। কিন্তু এর যে বিচারিক ক্ষমতা, তাতে বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীদের হতাশাই কেবল বেড়েছে। এখন নামেই কেবল আদালত চলছে।' তিনি বলেন, 'দেশে সচিবালয়, অফিস, গণপরিবহন, হাটবাজার সবই চলছে। কেবল আদালতই চলছে না। কারণ প্রশাসন চায় না বিচারব্যবস্থা শক্তিশালী হোক। করোনা পরিস্থিতিতে প্রশাসনই বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করছে। এগুলো অশুভ লক্ষণ।'

নেই সক্ষমতার ব্যবহার : দেশের উচ্চ আদালতে ১০৩ জন বিচারপতি ও অধস্তন আদালতে প্রায় দুই হাজার বিচারক এবং আদালতগুলোতে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিসহ প্রায় ২৫ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। ভার্চুয়াল মাধ্যমে সব মিলিয়ে উচ্চ আদালতে ১৭ জন বিচারপতি কর্মরত। এ ছাড়া অধস্তন আদালতে যারা কর্মরত, তারাও শুধু জামিন ও জরুরি বিষয়াদি শুনানি করছেন, যা বিচার বিভাগের মোট সক্ষমতার ১৫ শতাংশের বেশি নয়। সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ এ প্রসঙ্গে বলেন, 'সাক্ষ্য আইনসহ বিচার সংক্রান্ত কিছু আইন ও বিধি সংশোধন করে ভার্চুয়াল আদালতের উপযোগী করা উচিত।' তার মতে, 'প্রচলিত আদালতের সব ক্ষমতাই অধস্তন আদালতকে দেওয়া যেতে পারে। সমস্যাগুলো চিহ্নিত হলে সমাধানও বের হয়ে আসবে।'

উপকরণের ঘাটতি : ভার্চুয়াল মাধ্যমে মামলা পরিচালনায় অনেক আদালতেই প্রয়োজনীয় ওয়েবক্যাম, রাউটার, নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেটসহ অন্যান্য উপকরণের ঘাটতি প্রকট। বিচারক, আইনজীবীসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারে অভিজ্ঞতারও ঘাটতি রয়েছে।

সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে : সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা রয়েছে মাইক্রোসফট টিমস/জুম/গুগল মিট অ্যাপ ব্যবহার করে ভার্চুয়াল মাধ্যমে আদালতে শুনানি পরিচালনা করতে হবে। কিন্তু অ্যাপ ব্যবহারের প্রশিক্ষণ না থাকায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিচারকরা মোবাইল ফোন/ ফেসবুক মেসেঞ্জার/ ভাইভার/ হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহার করে মামলার শুনানি গ্রহণ করেছেন। ফলে সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অবশ্য সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকি মোকাবিলায় দাতা সংস্থা ইউএনডিপি ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রজেক্ট ইতোমধ্যে মাইকোর্ট নামে একটি অ্যাপ চালু করেছে। তবে সেটি এখনও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ও প্রথমবারের মতো গত ৯ জুলাই কুষ্টিয়ায় বিচারক, আইনজীবীসহ সংশ্নিষ্টদের ডিজিটাল প্রশিক্ষণের কাজ শুরু করেছে। সারাদেশেই প্রশিক্ষণ পরিচালনা হবে বলে জানানো হয়ছে।

ডিজিটাল জালিয়াতি : অধস্তন আদালতে ব্যবহূত ওকালতনামা একই সিরিয়াল নম্বরে উচ্চ আদালতেও ব্যবহার হচ্ছে। এ ধরনের কয়েকটি জালিয়তি ইতোমধ্যে ধরা পড়েছে। আবার একই আসামি তার পক্ষে আদেশ না হওয়া পর্যন্ত একাধিক আইনজীবীর মাধ্যমে তথ্য গোপন করেও জামিন আবেদন করছেন। অথচ নিষ্পত্তি হওয়া আবেদন সম-এখতিয়ার সম্পন্ন আদালতে ফের দাখিলের সুযোগ নেই। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে কয়েক দফা সতর্কতাও জারি করেছেন ভার্চুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চ। রাজস্ব আয়ের অন্যতম মাধ্যম কোর্ট ফি নিয়েও ডিজিটাল জালিয়াতি হচ্ছে।

দুর্বল নেটওয়ার্ক ও বিড়ম্বনা : ভার্চুয়াল আদালতে বিচার হওয়ায় দেশের প্রায় ৬০ হাজার আইনজীবীর অন্তত ৮৫ শতাংশ কর্মহীন হয়ে আছেন। তারা ডিজিটাল তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে অনভ্যস্ত। যারা প্রযুক্তি ব্যবহারে অভ্যস্ত তাদেরও নানা সময় ভোগাচ্ছে লোডশেডিং এবং নেটওয়ার্কজনিত সমস্যা। গত ৩১ মে হাইকোর্টে স্থায়ী নিয়োগ পাওয়া ১৮ বিচারপতিকে দিনে ভার্চুয়াল মাধ্যমে এবং রাত সাড়ে ৯টায় স্বশরীরে শপথবাক্য পাঠ করানো হয়। তখন সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন থেকে জানানো হয়, দুর্বল নেটওয়ার্কের কারণে দুপুরে অনেক বিচারপতিই প্রধান বিচারপতির পাঠ করা শপথবাক্য শুনতে পাননি। অনেক আইনজীবীর আবার ডিজিটাল প্লাটফর্ম ব্যবহারে প্রশিক্ষণ এবং উপকরণেরও ঘাটতি রয়েছে।

ঢাকা বারের আইনজীবী শফিকুর রহমান বলেন, ভার্চুয়াল আদালতে মামলা পরিচালনা হলেও অধিকাংশ আদালত থেকে নথিপত্র ই-মেইলে পাঠানোর পাশাপাশি হার্ডকপি চাওয়া হয়। ফলে সেটি সহকারীর মাধ্যমে পৌঁছাতে হয়। আদালতের স্টেনো-টাইপিস্টকেও সশরীরেই কাজ করতে হচ্ছে। তাই করোনা সংক্রমণ ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।

পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বিচারক বলেন, অধস্তন আদালতে কখনোই তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনা এবং সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি। হঠাৎ ভার্চুয়াল আদালত চালু হওয়ায় পেশাগত দায়িত্ব বোধ থেকে তারা সচেষ্ট থাকলেও সবাই অসুবিধায় পড়েছেন। তথ্যপ্রযুক্তি সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ না থাকায় আদালতের সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও ভূমিকা রাখতে পারছেন না। মামলার নথি প্রিন্ট, কজলিস্ট তৈরি, শুনানির লিস্ট পাঠানোসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিচারককেই আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হচ্ছে।

কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ : আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ভার্চুয়াল আদালতের মাধ্যমে কিছুটা হলেও মামলাজট কমানো এবং বিচারপ্রার্থীদের বিচার পাইয়ে দিতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উচ্চ আদালতও ভার্চুয়াল বেঞ্চের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। তবে বিচার চালাতে হলে সাক্ষ্য আইনে কিছু পরিবর্তন আনতে হবে। সেই আইন সংশোধনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের মুখপাত্র ব্যারিস্টার সাইফুর রহমান বলেন, 'যেসব সমস্যা সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনের নজরে আসছে, তা নিয়মিত প্রধান বিচারপতিকে জানানো হয়। প্রধান বিচারপতি কিছু বিষয়ে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত দেন। আবারও কখনও বা জ্যেষ্ঠ বিচারপতিদের সঙ্গে আলোচনা করেও সিদ্ধান্ত দেন। এটি চলমান প্রক্রিয়া।'

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এএম আমিন উদ্দিন বলেন, 'করোনা পরিস্থিতির পর আদালতের ছুটি কমানোর পাশাপাশি দৈনন্দিন কর্মঘণ্টা বাড়িয়ে বিচার বিভাগকে গতিশীল করার পরিকল্পনা এখন থেকেই করা উচিত।'

উন্নত বিশ্বে গৃহীত পদক্ষেপ : করোনা পরিস্থিতিতে শুধু বাংলাদেশে নয়, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ভারত ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোতেও ভার্চুয়াল বিচারকাজ শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টে করোনাকালে 'ভার্চুয়াল হিয়ারিং' শুরু হলেও দেশটির বহু অঙ্গরাজ্যে আরও আগেই এর অনুশীলন শুরু হয়েছে। এ প্রসঙ্গে ভারতের প্রধান বিচারপতি শরদ অরবিন্দ বোবদেও সাংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন, 'ভবিষ্যতে পুরোনো ও নতুনের (ভার্চুয়াল) সমন্বয়ে আদালত চলবে।'

আরও পড়ুন

×