ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অতীতের সঙ্গে এক অমূল্য সেতুবন্ধন ছিন্ন হয়ে পড়ল

অতীতের সঙ্গে এক অমূল্য  সেতুবন্ধন ছিন্ন হয়ে পড়ল
×

আহমদ রফিক (জন্ম : ১২ সেপ্টেম্বর ১৯২৯ মৃত্যু : ২ অক্টোবর ২০২৫)

আফসান চৌধুরী, গবেষক ও সাংবাদিক

প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:৪৮ | আপডেট: ০৩ অক্টোবর ২০২৫ | ১০:২৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

যখন আহমদ রফিকের মৃত্যুসংবাদ পেলাম, মনে হলো, মানুষটিকে হারিয়ে অতীতের রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে এক অমূল্য সেতুবন্ধন ছিন্ন হয়ে পড়ল। সংবাদটি শুনে তাঁর ভাষাসংগ্রামী বা গবেষক বা সাহিত্যিক পরিচয়ের কথা মনেই পড়েনি। কিছু মানুষ আমাদের মাঝে থাকেন, যারা তাদের কাজের চেয়েও বড় হয়ে যান। 

এ কথা কিন্তু সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তাঁর মতো অনেকেই ছিলেন যারা রাজনীতি, সমাজ-সংস্কার, গবেষণায় জড়িত ছিলেন এবং নানা সময়ে বিতর্কে জড়িয়েছেন। কিন্তু আহমদ রফিকের বিতর্কের কোনো অবকাশ ছিল না। বিতর্কে জড়ানোটা অন্যায় কিছু না। বিতর্কটা কী নিয়ে হয়, সেটিই বিষয়। তাঁর সময়ের সংগ্রামী অনেকেই পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সুবিধা নিয়েছেন। কিন্তু তাঁর বিষয়ে কেউ কখনও আঙুল তুলতে পারেনি। একটি মোহমুক্ত, ন্যায়-নীতিসম্পন্ন জীবন তিনি যাপন করে গেছেন। তিনি দীর্ঘায়ু পেয়েছিলেন। ৯৬ বছর কম নয়। বেশির ভাগ মানুষকে আমরা দেখি, দীর্ঘ সময়ে কারও কোনো স্খলন ঘটে যায়। আহমদ রফিকের ক্ষেত্রে তা ঘটেনি। 

আমার ৭৪ বছর বয়সের জীবনে, ছোটবেলা থেকেই আহমদ রফিকের সুনাম শুনে এসেছি। আজ পর্যন্ত কোনো দুর্নাম শুনতে পাইনি। 

আমি মনে করি, বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে এটা বিরাট অর্জন। মানুষকে একটি উপহার তিনি দিয়ে গেছেন, একটি ধারণা; তাহলো– তাঁর মতো জীবনও যাপন করা সম্ভব। এই অর্জনকে আমরা বড় করে দেখছি না। কারণ এটি রাজনীতির পরিসরের বাইরে। 

তিনি সেই সময়কে ধরে রেখেছিলেন, মানুষ যখন নৈতিকতাকে সহজভাবে নিত। সে জন্য আমি তাঁকে তসলিম জানাই।

ছিলেন বারডেম হাসপাতালে 
রাজধানীর বারডেম হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে লাইফ সাপোর্টে ছিলেন ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক। গতকাল বৃহস্পতিবার রাত ১০টা ১২ মিনিটে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। 

কবি, প্রাবন্ধিক ও রবীন্দ্র গবেষক আহমদ রফিকের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। শোকবার্তায় প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আহমদ রফিকের প্রয়াণ দেশের সংস্কৃতি ও মুক্তচিন্তার জগতে এক অপূরণীয় ক্ষতি। শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও তিনি শেষ দিন পর্যন্ত জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে গেছেন। এ ছাড়া আহমদ রফিকের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। 

আহমদ রফিকের বিশেষ সহকারী রাসেল জানান, রাত ১০টার দিকে তাঁর হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়। এরপর পরামর্শ করে চিকিৎসকরা লাইফ সাপোর্ট খুলে নেন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় গত বুধবার বিকেলে তাঁকে লাইফ সাপোর্ট দেওয়া হয়েছিল। মৃত্যুর আগে তিনি নিজের দেহ ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতাল মেডিকেল কলেজে দান করে গেছেন। আহমদ রফিক ফাউন্ডেশনের ট্রাস্টি ইসমাইল সাদী জানান, শনিবার বেলা ১১টায় সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নেওয়া হবে। 

পারিবারিক ও হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, তাঁর কিডনিতে সমস্যা ছিল। সম্প্রতি কয়েকবার মাইল্ড স্ট্রোক হয়েছে। গত ১১ সেপ্টেম্বর ল্যাবএইড হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার পর তাঁকে পান্থপথের হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। গত রোববার তাঁকে বারডেম হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালে অবস্থানকালে গত সেপ্টেম্বরে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা তাঁকে দেখতে যান এবং তাঁর চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন।

আহমদ রফিক নিউ ইস্কাটনের গাউসনগরের একটি ভাড়া বাসায় একাই থাকতেন। ২০০৬ সালে তিনি স্ত্রীকে হারান। তিনি নিঃসন্তান। তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহে বিপুলসংখ্যক বই ছাড়া অন্য কোনো উল্লেখযোগ্য সম্পদ নেই। তিনি শতাধিক গ্রন্থ রচনা ও সম্পাদনা করেছেন। পেয়েছেন একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ বহু সম্মাননা। দুই বাংলার রবীন্দ্রচর্চায় তাঁর অবদান অনন্য। কলকাতার টেগর রিসার্চ ইনস্টিটিউট থেকে তাঁকে দেওয়া হয়েছে ‘রবীন্দ্রতত্ত্বাচার্য’ উপাধি।

১৯২৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। ২০১৯ সাল থেকে তাঁর দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হতে শুরু করে। অস্ত্রোপচার করা হলেও ফল আশানুরূপ হয়নি। ২০২৩ সাল থেকে তিনি প্রায় দৃষ্টিহীন। ২০২১ সালে পড়ে গিয়ে পা ভেঙে যাওয়ার পর থেকেই তাঁর শারীরিক অবস্থা ক্রমশ অবনতির দিকে যেতে থাকে। বুদ্ধিজীবী মহল থেকে বারবার আহমদ রফিকের উন্নত চিকিৎসা ও রাষ্ট্রীয় সহায়তার দাবি জানানো হয়েছিল। 

 

আরও পড়ুন

×