নতুন টেলিভিশন নিয়ে যে হাহাকার, তা পুরোনো বন্দোবস্তের হাহাকার: তথ্য উপদেষ্টা
‘গণমাধ্যমে জুলাই ও তারপর’ শীর্ষক প্রকাশনা উৎসব ও আলোচনা সভা
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৫ | ১৯:৩৯ | আপডেট: ১০ অক্টোবর ২০২৫ | ০১:০৬
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পুরোনো প্রক্রিয়ায় নতুন দুটি টেলিভিশনের লাইসেন্স বা অনুমোদন দেওয়া নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মো. মাহফুজ আলম বলেছেন, ‘আজ টেলিভিশন অনুমোদন নিয়ে যে হাহাকার, এই হাহাকার হচ্ছে পুরাতন বন্দোবস্ত এবং যারা মনে করে যে নতুন কোনো মানুষ বা নতুন কোনো মুখ যাতে না আসে, তাদের হাহাকার। এগুলো আমরা বুঝি।’
বৃহস্পতিবার ঢাকায় প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআইবি) মিলনায়তনে ‘গণমাধ্যমে জুলাই ও তারপর’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মাহফুজ আলম এসব কথা বলেন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে পিআইবির পাঁচটি প্রকাশনা ‘তারিখে জুলাই’, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও রাজনৈতিক বুদ্ধিজীবিতা’, ‘নিরীক্ষা: অভ্যুত্থান মিডিয়া বয়ান’, ‘যে সাংবাদিকদের হারিয়েছি’ এবং ‘ঘটনাপঞ্জি ২০২৪’ প্রকাশনা উৎসব উপলক্ষে এ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।
মাহফুজ আলম বলেন, ‘আমি স্পষ্ট বলেছি এবং আমি যদি এক দিনও থাকি সরকারে, চেষ্টাটাই করব যে আমি নতুন মিডিয়া (গণমাধ্যম) দিয়ে দেব। আমরা যেহেতু ফ্যাসিবাদের মিডিয়া বন্ধ করিনি, নতুন মিডিয়া দেব।’
উপদেষ্টা আরও বলেন, নতুন মিডিয়ার মাধ্যমে নতুন মুখ আসবে, নতুন ন্যারেটিভ আসবে, নতুন বক্তব্য আসবে এবং এই বক্তব্যের বিরুদ্ধে বক্তব্যের লড়াই হবে। যেহেতু আমরা ভায়োলেন্সে (সহিংসতা) যাইনি, ফলে বক্তব্যের বিরুদ্ধে বক্তব্যের লড়াই ও চিন্তার বিরুদ্ধে চিন্তার লড়াইয়ে আমরা যাব। আমরা মনে করি, আমরা অবশ্যই জয়ী হব। এগুলো খুবই স্পষ্ট কথা। এখানে কোনো ধোঁয়াশা রাখার কিছু নেই।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর ভূমিকা নিয়ে পিআইবিকে একটি গবেষণা করার আহ্বান জানান মাহফুজ আলম। পাশাপাশি জুলাই অভ্যুত্থান এবং তার আগে আওয়ামী লীগের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের সময় দেশের গণমাধ্যমগুলোর ভূমিকার মূল্যায়ন হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মাহফুজ জানান, গত ১৫ বছরে বাংলাদেশে গণমাধ্যমের ভূমিকা মূল্যায়ন করে একটি প্রতিবেদন তৈরির অনুরোধ জানিয়ে তিনি গত জুনে জাতিসংঘকে একটি চিঠি দিয়েছিলেন। আগস্টে তাঁকে ইউনেসকোর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়। ইউনেসকোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বাংলাদেশের সাংবাদিকদের জন্য একটি কোড অব কন্ডাক্ট তৈরি করার ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছে। সেই কাজটি তারা করছে।
আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে অর্থনীতিবিদ মাহ্বুব উল্লাহ্ বলেন, মবের কথা বলা হচ্ছে, মবেরও তো একটা সমাজতত্ত্ব আছে। মাও সেতুং -এর একটা কথা আছে, বিপ্লব কোনো ডিনার পার্টি নয়। জুলাইয়ে সে রকম কিছুই হয়নি, অনেক অনেক কম হয়েছে। সামনের দিনে কেউ আবারও ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠলে আবারও গণঅভ্যুত্থান হতে পারে। সিকান্দার আবু জাফরের যে গান- ‘দিয়েছি তো রক্ত আরও দেব রক্ত’। প্রয়োজন হলে দেব এক নদী রক্ত। একইভাবে একদিকে একাত্তরে রক্ত দেওয়া হয়েছে, জুলাইয়ে রক্ত দেওয়া হয়েছে।
মাহবুব উল্লাহ্ বলেন, আজ আমাদের নতুন বয়ান সৃষ্টি করতে হবে। একাত্তরের পুনর্মূল্যায়ন দরকার, সাতচল্লিশের পুনর্মূল্যায়ন দরকার। বারবার দেশভাগের কথা বলা হয়। দেশভাগ কথাটা আমাদের জন্য কতটা সম্মানের সেটাও খতিয়ে দেখতে হবে। দুটি স্বাধীন দেশের উদ্ভব হয়েছিল। দেশভাগ বললে আবার দেশ একত্রে করার প্রসঙ্গ এসে যায়। বাংলাদেশ স্বাধীন দেশ এখন। কেউ আর একত্রে ফিরে যেতে চায় না। তিনি আরও বলেন, জুলাইয়ে আমরা কী পেলাম প্রশ্ন উঠছে। এই যে, আমরা মুক্তভাবে কথা বলতে পারছি। জানি না, কতদিন আমরা তা পারব। এর বাইরে জুলাইয়ের পর আমরা কী পেলাম। অনেক কিছু ঘটছে। আমরা হয়তো এমন হোক, চাইনি। রুশ বিপ্লবের পর এর চেয়েও অনেক বেশি অরাজকতা হয়েছিল।
সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে চিন্তাবিদ ও লেখক সলিমুল্লাহ খান বলেন, সংবিধান তো বারবার সংশোধন হয়েছে। এখন নতুন একটা সংবিধান নিতে ভয় পাচ্ছেন। মনে হচ্ছে সংবিধান নতুন করে করলে দেশ বঙ্গোপসাগরে পড়ে যাবে। চব্বিশের জুলাইয়ে গণঅভ্যুত্থান হয়েছে নাকি বিপ্লব হয়েছে। পিআইবিও বিপ্লব বলছে না তাদের বইপুস্তকে। আমরা কি একাত্তরকে বিপ্লব বলি? কেউ মুক্তিযুদ্ধ, কেউ বলে স্বাধীনতা যুদ্ধ। জালিয়ানওয়ালাবাগে ব্রিটিশরা একদিনে এক হাজারের বেশি মানুষ হত্যা করেছে। জুলাইয়ের ৩৬ দিনে এর চেয়েও বেশি মানুষ প্রাণ দিল।
সলিমুল্লাহ খান বলেন, জুলাইয়ের ঘটনাকে একসময় মৌলবাদীদের বিপ্লব বলে প্রচার করা হবে। অনেকে তালেবানের বিপ্লব বলছেন জুলাইকে। প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের রসবোধ কম নয়। তিনি বলেছেন, আমার তো দাড়ি নেই তালেবানের সরকার কীভাবে হলাম। পৃথিবীর অন্যসব বিপ্লবের পর অনেক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। আমাদের জুলাইয়ের পর তো অত হত্যা ঘটেনি। মব মব বলে যারা চিৎকার করছেন তারা আবার আমাকে হত্যাকারীকে উৎসাহিত করছি বইলেন না।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে গবেষক ও লেখক সাইমুম পারভেজ বলেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক কর্মীরা, দ্বিতীয় অবস্থানে হেনস্তা হয়েছেন সংবাদকর্মীরা। সাংবাদিকরা ফ্যাসিস্টের পক্ষে লিখেছে, বলেছে এমন সংখ্যা যেমন আছে, আবার একটা বড় অংশ আছেন যারা তাদের পেশাগত দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করেছেন এবং সেটি করতে গিয়ে নানা রকমের হামলা ও হেনস্তার শিকার হয়েছেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন পিআইবির মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ। আলোচনা সভায় সভাপ্রধান ছিলেন পিআইবি পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যান ফিরদৌস আজিম।
