ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর স্মৃতিচারণ

স্মৃতিতে রয়ে যাবে স্নিগ্ধ মনজুর

স্মৃতিতে রয়ে যাবে স্নিগ্ধ মনজুর
×

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম জন্ম

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৫ | ০৮:১৬ | আপডেট: ১১ অক্টোবর ২০২৫ | ১১:৪৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক, কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তাঁর বয়স হয়েছিল বছর ৭৪ বছর। প্রিয় ছাত্রকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন তাঁর শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
 

আমার কৃতী ছাত্রদের অন্যতম সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। মনজুর সরাসরি আমার ছাত্র ছিলেন, প্রখর মেধাবী ছাত্র। পরবর্তী সময়ে আমার সহকর্মী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের আমরা কয়েক দশক সহকর্মী ছিলাম।

দুক্ষেত্রেই মনজুরকে আমি দেখেছি একই রকম– পরিচ্ছন্ন, স্নিগ্ধ। যে কোনো কাজ দিলেই তাতে তিনি মনোযোগী, কর্তব্যপরায়ণ। কোনো কাজে তার অমনোযোগ ছিল না। বিরক্তি ছিল না।
ছাত্রদের ভালোবাসতেন মনজুর, ছাত্ররাও তাকে। তার মতো  প্রবল জনপ্রিয় শিক্ষক কমই মেলে। সৈয়দ মনজুরের ক্ষমতা ছিল, যে কোনো বিষয় তিনি সজহভাবে প্রকাশ করতে পারতেন, অহেতুক জটিলতা তিনি এড়িয়ে চলেছেন। নিজে তিনি বিষয় সহজে বুঝতে পারতেন, পাশাপাশি সবার বোধগম্য করে উপস্থাপন করতে সক্ষম হতেন। শ্রেণিকক্ষে তার এই অসাধারণ পারঙ্গমতাই তার জনপ্রিয়তার মূল কারণ। যুক্তিনিষ্ঠ ছিলেন তিনি, অহেতুক আক্রমণ বা অযৌক্তিক কথায় তার কখনোই আগ্রহ ছিল না।

শিক্ষকতার পাশাপাশি মনজুর সাহিত্যিক হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত ছিলেন। তার ছোটগল্প অসামান্য, উপন্যাস দীপ্তিময়, তার প্রবন্ধ চিন্তা ও ব্যাখ্যায় সমৃদ্ধ। বিশ্বসাহিত্যের আমগ্ন পাঠক মনজুর অনুবাদ ও বিশ্লেষণে সমান দক্ষ। আশির দশকে সংবাদ পত্রিকায় তার ধারাবাহিক ‘অলস দিনের হাওয়া’ বিখ্যাত হয়; মনজুরের সেই লেখার সুখ্যাতির কারণ তার অনুসন্ধিৎসা, বিশ্বসাহিত্যের অতলে ডুব 

দিয়ে তার হিরে রত্ন পাঠকের সামনে উপস্থাপনের ক্ষমতা। চিত্রকলার নিরবচ্ছিন্ন ব্যাখ্যাকার ছিলেন তিনি। বাংলা ভাষায় চিত্রকলা নিয়ে গভীর বিশ্লেষণমূলক প্রবন্ধের সেরা লিখিয়ে হিসেবে তাকেই চিহ্নিত করতে হবে। একাধারে শিক্ষকতা, সাহিত্য রচনা ও শিল্পকলায় মনোনিবেশ– এত বহুমুখী ক্ষেত্রে সমন্বয় সমসাময়িককালে বেশি দেখা মেলে না। সৈয়দ মনজুর এর ব্যতিক্রমী উদাহরণ। 

সাহিত্যিক হিসেবে বাংলা একাডেমি, একুশে পদকসহ সব বড় পুরস্কার তিনি অর্জন করেছেন। তবে সবচেয়ে বড় অর্জন তার লেখক ও পাঠকদের ভালোবাসা। পাঠক তার লেখার জন্য সৈয়দ মনজুরকে ভালোবেসেছে; অপরাপর লেখকরা সৈয়দ মনজুরুল ইসলামকে ভালোবেসেছেন তার নিমগ্ন পাঠের জন্য, নিখুঁত বিশ্লেষণের জন্য। অনুজ লেখকদের লেখায় সৈয়দ মনজুরের উৎসাহ যেমন ছিল, অনুজদের অনুপ্রেরণা জানাতে তিনি কখনও কুণ্ঠাবোধ করেননি। 

শিক্ষকতার বাইরে নানা সময়ে তার সামনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক হওয়ার আহ্বান বা অনুরোধ এসেছে। মনজুর তা গ্রহণ করেননি। শিক্ষকতার বাইরে কোনো পেশায় তার আগ্রহ ছিল না। এটি আমাদের সমাজে অনুকরণীয় উদাহরণ; নিজের কাজে শতভাগ মনোযোগ দেওয়ার অনন্য উদাহরণ মনজুর। সাহিত্যে অনুরাগ ছিল বলে সম্পাদনাতেও মন দিয়েছিলেন তিনি। কালি ও কলমসহ বেশ কয়েকটি পত্রিকা তিনি সম্পাদনা করেছেন। সব ক্ষেত্রেই তিনি পরিমিতি ও রুচিবোধের পরিচয় দিয়েছেন।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ব্যক্তিগত জীবনে স্মিতহাস্যময় ও প্রাণবন্ত আড্ডামুখর মানুষ। তাকে দেখেছি সব সময় স্বচ্ছন্দ গতিতে হেঁটে চলেছেন। দেখলেই মনে হয়েছে, একের পর এক কাজ করে চলেন তিনি। এত পরিচ্ছন্ন তার হাঁটার ভঙ্গি, কাজ করার প্রতি দুর্নিবার আগ্রহ। তবে তিনি নিজের ব্যক্তিগত সংকট ও বিপর্যয়ের কথা তেমন বলতেন না কখনও। তার স্ত্রীও আমার ছাত্রী; তিনি দীর্ঘকাল ক্যান্সারে আক্রান্ত। মনজুর কখনও সেসব নিয়ে কথা বলে ভারাক্রান্ত হতেন না; বা কাউকে কাতর করতে চাইতেন না। তার শরীর এত খারাপ ছিল, কখনোই আমি জানতে পারিনি। 

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম আসলে এমন একজন মানুষ, যিনি নিজের মতো পরিমিত ও স্নিগ্ধ একটি মেধাবী জীবন যাপন করেছেন। এমন কোনো কাজে তিনি যুক্ত হননি, যা তার শিক্ষকতা পেশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি মার্জিত, বিবেকী, সংযত ও যুক্তিনিষ্ঠ। শিক্ষাবিদ হিসেবে তার পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেমন জরুরি সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তার রচনাবলি। তার প্রাণবন্ত কথোপকথন, হুদয়স্পর্শী মার্জিত আচরণ তার সঙ্গে যারা পরিচিত ছিলেন, তাদের সবার অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে আছে। 

সৈয়দ মনজুর জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত কর্মচঞ্চল ও সৃজনশীল ছিলেন। তার মৃত্যুকে আমি অকাল প্রয়াণ বলব। আমাদের সবার স্মৃতিতে রয়ে যাবে  স্নিগ্ধ ও মেধাবী ব্যক্তিত্ব সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের বহুমুখী প্রতিভার অবিনশ্বর স্মারক। তার প্রতি আমাদের সশ্রদ্ধ শ্রদ্ধা, অকৃত্রিম ভালোবাসা।
 

আরও পড়ুন

×