ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

সংসদীয় আসনের সীমানা পুনঃনির্ধারণ নিয়ে আইনি লড়াইয়ে ইসি

২০ আসনের পরিবর্তন নিয়ে ২৭ রিট

সংসদীয় আসনের সীমানা পুনঃনির্ধারণ নিয়ে আইনি লড়াইয়ে ইসি
×

নির্বচান ভবন। ফাইল ছবি

অমরেশ রায়

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৫ | ১৯:৫৫

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতির মধ্যেই সংসদীয় আসনের সীমানা পুনঃনির্ধারণ নিয়ে আইনি লড়াইয়ে নামতে হচ্ছে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি)। এরই মধ্যে ইসি ঘোষিত চূড়ান্ত সীমানা তালিকার ২০টি আসনের পরিবর্তন নিয়ে ২৭টি রিট দায়ের করা হয়েছে উচ্চ আদালতে। আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের তপসিল ঘোষণা হবে ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে। এই তপসিল ঘোষণার আগেই এসব রিটের ফয়সালা না হলে জাতীয় নির্বাচন নিয়ে জটিলতায় পড়তে হবে সাংবিধানিক এই সংস্থাটিকে।

ইসি সূত্র বলছে, এরই মধ্যে আদালতের নোটিশ পেয়ে তার জবাবও দিয়েছে ইসি। এজন্য প্যানেল ল’ইয়ারও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এখন আদালতের পরবর্তী শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে তারা।

জানতে চাইলে ইসি’র জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ শনিবার রাতে সমকালকে বলেছেন, ‘এখনও আদালতের শুনানির নোটিশ পাইনি। শুনানিতেই প্যানেল ল’ইয়ারদের মাধ্যমে আমরা আমাদের জবাব দেব।’

ডিসেম্বরে তপসিল ঘোষণার আগে বিষয়টির ফয়সালা না হলে কী হতে পারে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আদালতের রায় নিয়ে কোনো মন্তব্য করার এখতিয়ার আমার নেই।’

নানা প্রক্রিয়া শেষে গত ৪ সেপ্টেম্বর ৩০০ আসনের চূড়ান্ত সীমানা প্রকাশ করে ইসি। এতে জনসংখ্যার ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে গাজীপুর জেলায় পাঁচটি আসন থেকে একটি বাড়িয়ে ছয়টি এবং বাগেরহাটের চারটি আসন থেকে একটি কমিয়ে তিনটি করা হয়। এছাড়া ১৬টি জেলার ৪৬টি আসনে রদবদল আনা হয়। 

এরপরই বিক্ষুব্ধরা সীমানা পুনঃনির্ধারণে ইসির সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে রিট করেন। এখন পর্যন্ত এ নিয়ে ২০টি আসনের সীমানা চ্যালেঞ্জ করে অন্তত ২৭টি রিট করা হয়েছে। এর মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ ও ৩ আসনে একটি, ফরিদপুর-২ ও ৪ আসনে চারটি, কুমিল্লা-১ ও ২ আসনে চারটি, বাগেরহাট-১ আসনে দুটি, বাগেরহাট-৪ আসনে একটি, পাবনা-১ ও ২ আসনে চারটি, বরগুনা-১ ও ২ আসনে দুটি, ঢাকা-৪ ও ৫ আসনে একটি করে দুটি, কুমিল্লা-৬ আসনে একটি, সাতক্ষীরা-২ ও ৩ আসনে তিনটি, ঢাকা-১৪ ও ১৯ আসনে একটি, চট্টগ্রাম-৫ আসনে একটি এবং শরীয়তপুর-২ ও ৩ আসনে একটি করে রিট দায়ের করা হয়েছে।

সংক্ষুব্ধদের অভিযোগ, সীমানা পুনঃনির্ধারণের ক্ষেত্রে ইসি থেকে প্রশাসনিক ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার পাশাপাশি জনসংখ্যা ও ভোটার সংখ্যার ভারসাম্য রক্ষার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু চূড়ান্ত তালিকা অনুযায়ী তারা নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরাই ভেঙেছেন। ফরিদপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ কয়েকটি আসনের অখণ্ডতা ভাঙা হয়েছে। এসব জেলায় একই উপজেলাকে একাধিক আসনে বিভক্ত করা হয়। যেমন- ফরিদপুর-৪ আসনের ভাঙ্গা উপজেলার দু’টি ইউনিয়ন কেটে পার্শ্ববর্তী আসনে যুক্ত করা হয়েছে। আবার বেশ কিছু আসনে ভোটার ও জনসংখ্যার বড় ব্যবধান রয়ে গেছে। এক আসনের সঙ্গে আরেকটির জনসংখ্যায় সর্বোচ্চ ১৫৩ শতাংশ ও ভোটার সংখ্যার ৭৭ শতাংশ পর্যন্ত বিশাল ব্যবধান রয়েছে। ফলে নতুন সীমানায় ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা এবং ইসির নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

কেউ কেউ বলছেন, নূরুল হুদা কমিশন সবশেষ ২৫টি সংসদীয় আসনের সীমানায় পরিবর্তন করেছিলেন। কিন্তু এবার নজিরবিহীনভাবে ৪৬টি আসনে পরিবর্তন আনা হয়েছে। যা নির্বাচনের ক্ষেত্রে আরেক জটিলতা তৈরি করেছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গত ৩০ জুলাই ৩০০ সংসদীয় আসনের সীমানা পুনঃনির্ধারণ করে খসড়া প্রকাশ করে ইসি। এতে ভোটার সংখ্যার সমতা আনতে গিয়ে গাজীপুর জেলায় একটি আসন বাড়িয়ে ছয়টি করা হয়। আর বাগেরহাটের আসন চারটি থেকে কমিয়ে তিনটির প্রস্তাব করা হয়। ‎এ ছাড়া ছোটখাটো পরিবর্তন আনা হয় ৩৯টি আসনে। তবে ইসির এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তখনই দেশের বিভিন্নস্থানে ক্ষোভ-বিক্ষোভ শুরু হয়।

পরে খসড়া সীমানার বিষয়ে দাবি-আপত্তি জানাতে ১০ আগস্ট পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়। সে পর্যন্ত ৩৩ জেলার ৮৪টি আসন সম্পর্কিত এক হাজার ১৮৫টি আপত্তি এবং ৭০৮টি পরামর্শ বা সুপারিশ পাওয়া যায়। এরপর ২৪ থেকে ২৭ আগস্ট প্রস্তাবিত নির্বাচনী এলাকার সীমানা নিয়ে দাবি-আপত্তি ও আবেদনের ওপর শুনানি করে ইসি। চারদিনের শুনানিতে এসব দাবি-আপত্তির নিষ্পত্তি শেষে ৪ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত সীমানা প্রকাশ করে ইসি। এতে গাজীপুর জেলায় একটি আসন বাড়ানো ও বাগেরহাটের একটি আসন কমানোর প্রস্তাব বহাল রাখার পাশাপাশি ১৬টি জেলার ৪৬টি আসনে রদবদল আনা হয়।

এদিকে, পুনঃর্নির্ধারিত সীমানা নিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সংঘাতমুখর পরিস্থিতি দেখা দেয়। ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় ব্যাপক সহিংসতার ঘটনায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরাও জড়িয়ে পড়েন। বাগেরহাট জেলায় একটি আসন কমানোর প্রতিবাদে সেখানকার বাসিন্দারা সড়ক অবরোধসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়ও নানা কর্মসূচি পালন করেন সংক্ষুব্ধরা। স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের হস্তক্ষেপে ওইসব আন্দোলন বন্ধ হয়। এই অবস্থায় প্রতিকার পেতে বিক্ষুব্ধরা উচ্চআদালতে রিট আবেদন করেন।

ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, আইন অনুযায়ী সংসদীয় আসনের সীমানা পুনঃর্নির্ধারণের সম্পূর্ণ এখতিয়ার ইসির। এ নিয়ে অতীতে কম-বেশি জটিলতা হয়েছে, আদালতের শরণাপন্নও হয়েছেন বিক্ষুব্ধরা। কিন্তু এবার সীমানা নিয়ে উচ্চআদালতে এত বেশি সংখ্যক রিট হয়েছে, যেটা ইসিকে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে ফেলেছে। এটাই বড় ধরনের আইনি লড়াইয়ের মুখে ফেলেছে ইসিকে। নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার আগে ওইসব রিট নিষ্পত্তি হয় কী-না, তা নিয়ে শঙ্কায়ও থাকতে হচ্ছে ইসিকে।

ইসি ঘোষিত ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের নির্বাচনী রোডম্যাপ অনুযায়ী- গত ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ৩০০ সংসদীয় আসনের সীমানা চূড়ান্ত করে গেজেট প্রকাশ করার কথা বলা হয়েছিল। আর ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে জিআইএস ম্যাপ প্রস্তুত ও প্রকাশ করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছিল। নির্ধারিত সময়সীমা এরই মধ্যে পার হয়েছে। এর ওপর উচ্চ আদালতের রিটগুলোর কারণে এ নিয়ে জটিলতার মুখে পড়তে হচ্ছে ইসিকে। 
 
নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার সীমানা পুনঃর্নির্ধারণ নিয়ে রিটের বিষয়ে সমকালকে বলেন, ‘আমরা সবগুলো রিটের বিষয়ে পদক্ষেপ নিয়েছি। আশা করছি, রিটের কারণে আগামী নির্বাচন ও এর প্রস্তুতিতে কোনো সমস্যা হবে না।’

আরও পড়ুন

×