ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বিচার বিভাগের জন্য স্বতন্ত্র সচিবালয়

কমবে মামলাজট, বাড়বে বিচার নিষ্পত্তির গতি

কমবে মামলাজট, বাড়বে  বিচার নিষ্পত্তির গতি
×

ওয়াকিল আহমেদ হিরন

প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৫ | ০৭:১৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

বিচার বিভাগের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতার জন্য স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। এটি প্রতিষ্ঠা হলে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাবে আইনি সেবা। কমে যাবে মামলাজট এবং বিচার নিষ্পত্তিতে বাড়বে গতি। একই সঙ্গে দুর্ভোগ কমবে বিচারপ্রার্থীদের।

সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন সূত্র জানায়, পৃথক সচিবালয় স্থাপনের কাজ অনেক দূর এগিয়েছে। এখন শুধু উপদেষ্টা পরিষদ চূড়ান্তকরণের পর ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ-২০২৫’ নামে খসড়া অনুমোদনের প্রজ্ঞাপন জারি করলেই বাস্তবায়নের কাজ শুরু হবে। তখন ভারত ও জাপানের মতো আলাদা গঠন করা হবে বিচার বিভাগের জন্য স্বতন্ত্র সচিবালয়।  

এদিকে স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠা না হওয়ায় অধস্তন আদালতের বিচার-সংশ্লিষ্টরা পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করতে পারছেন না। কারণ বিচার বিভাগ এখনও নির্বাহী বিভাগের ওপর নির্ভরশীল, যা তাদের পেশাগত স্বাধীনতাকে খর্ব করে। প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ যেমন বিচারকদের বদলি ও পদোন্নতির ক্ষমতা সরকারের হাতে থাকায় এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিচার বিভাগের স্বাধীন পথচলায় বাধা সৃষ্টি করে। 

১৯৯৯ সালের ২ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ঐতিহাসিক মাসদার হোসেন মামলায় ১২ দফা নির্দেশনাসহ রায় দেন। আট বছর পর রায় অনুসারে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক হয় বিচার বিভাগ। রায়ে বিচার বিভাগ পৃথককরণের প্রকৃত লক্ষ্য পূরণে আলাদা সচিবালয় প্রতিষ্ঠা, অধস্তন আদালতের বিচারকদের পদোন্নতি-সংক্রান্ত বিধিমালা প্রণয়নসহ ১২ নির্দেশনা ছিল। তবে পরে রাজনৈতিক সরকারের অধীনে ১২ দফা নির্দেশনার অধিকাংশ বাস্তবায়ন হয়নি। আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনেই চলতে থাকে বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ। 
এ পরিস্থিতিতে ১ নভেম্বর পালিত হবে ১৮তম বিচার বিভাগ পৃথককরণ দিবস। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি স্বাধীন দেশে শক্তিশালী বিচার বিভাগের জন্য আলাদা সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। এতে অধস্তন আদালতের বিচারকদের পদায়ন, বদলি, পদোন্নতি, শৃঙ্খলা, ছুটি ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রচলিত ‘দ্বৈতশাসন’-এর অবসান ঘটবে এবং বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে। 

গত বছর ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতন ঘটে। পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ১১ আগস্ট প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব নেন সৈয়দ রেফাত আহমেদ। এরপর গত ২১ সেপ্টেম্বর প্রথম অভিভাষণে বিচার বিভাগ সংস্কারের রোডম্যাপ তুলে ধরেন তিনি। ওই দিন প্রধান বিচারপতি বলেছিলেন, বিচারকদের প্রকৃত স্বাধীনতা ততদিন নিশ্চিত হবে না, যতদিন না এ বিভাগে দ্বৈতশাসন ব্যবস্থা বিলোপ হবে।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আপিল বিভাগের সাবেক এক বিচারপতিকে প্রধান করে বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। এই কমিশনও বিচার বিভাগ সংস্কারে ৩০টি প্রস্তাবনা ও সুপারিশ করে সরকারের কাছে পাঠায়। পরে পৃথক সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে উপস্থিত ৩১ রাজনৈতিক দল নীতিগতভাবে সমর্থন দেয়। 

গত বছর ২৮ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট থেকে এ বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ে একটি ধারণাপত্র ও প্রস্তাবনা পাঠানো হয়। সেখানে বিচার বিভাগের আলাদা সচিবালয় স্থাপনে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ-২০২৫’ নামে খসড়া তৈরি করা হয়। গত ২৩ অক্টোবর এ খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দেয় উপদেষ্টা পরিষদ। ওই বৈঠকের পর বলা হয়, অধ্যাদেশটি নিয়ে অর্থ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পরামর্শ প্রয়োজন। সেই আলোচনার পর আইনটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য ফের উপদেষ্টা পরিষদে তোলা হবে। 
এ বিষয়ে বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জয়নুল আবেদীন সমকালকে বলেন, আলাদা সচিবালয় রাজনৈতিক সরকারের সিদ্ধান্ত ছাড়া হবে না। রাষ্ট্রের জাতীয় ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হলে অবশ্যই নির্বাচিত সরকার প্রয়োজন। 
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্না বলেন, বর্তমানে দেশের যে পরিস্থিতি তাতে আমার মনে হয়, ক্ষমতা হারানো এবং প্রতিপক্ষকে দমানোর ইচ্ছায় কোনো সরকারই বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় করবে না। 

বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহ্‌দীন মালিক বলেন, খসড়া উপদেষ্টা পরিষদে অনুমোদন এটা বিচার বিভাগের জন্য ভালো সংবাদ। সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ নিয়ে হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছেন, সেটাও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য মাইলফলক। আশা করব, অন্তর্বর্তী সরকার এই রায় বাস্তবায়ন করে দিয়ে যাবে।  
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, প্রধান বিচারপতি পৃথক সচিবালয় স্থাপনে জোর উদ্যোগ নিয়েছেন। সংবিধান অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্ট চাইলে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে দুই সপ্তাহের মধ্যে বাস্তবায়ন করতে পারেন। 

বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের অন্যতম সদস্য সাবেক জেলা জজ মাসদার হোসেন বলেন, সম্প্রতি উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়টি নীতিগতভাবে অনুমোদন হলেও কিছু পরামর্শের জন্য সেটা ফেরত পাঠানো হয়েছে। তাহলে তো কিছুই হলো না।  
তবে আশার কথা শুনিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী। তিনি বলেন, বিচার বিভাগের জন্য আলাদা সচিবালয় প্রতিষ্ঠার দ্বারপ্রান্তে। এরই মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার জন্য অধ্যাদেশের খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ। তাই আলাদা সচিবালয় ঘোষণার জন্য এখন শুধু আনুষ্ঠানিকতাই বাকি। 

আরও পড়ুন

×