জন্মশতবর্ষ
খরস্রোতা নদীর নাম ঋত্বিক ঘটক
ঋত্বিক কুমার ঘটক
বিধান রিবেরু
প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৫ | ০৭:৫৩ | আপডেট: ০৪ নভেম্বর ২০২৫ | ০৮:৫৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
খরস্রোতা নদী প্রবাহিত হতে হতে নুড়িপাথরকে মসৃণ করে তোলে, দেয় মনোহর আকার। ঋত্বিক কুমার ঘটকও তেমনি অভিজ্ঞতাকে মুক্তোর মতো জমিয়ে জমিয়ে আমাদের উপহার দিয়েছেন একগুচ্ছ চলচ্চিত্র। এসব চলচ্চিত্র বাণিজ্যের ইঁদুরদৌড়ে শামিল হয় না। এগুলো মানুষের সামনে হাজির করে নির্মম ও নির্মোহ সত্য।
ঋত্বিক ঘটক স্থান ও কালের পরিবর্তনকে চলচ্চিত্রে ধারণ করেছেন। সেই চলচ্চিত্রে জারিত হয়েছে নিজের অভিজ্ঞতাসার (ফেনোমেনোলজি)। এর ভেতর আনন্দ, বেদনা, ইতিহাস, রাজনীতি, দর্শন, পুরাণ– কী নেই? ঋত্বিক জীবনকে দেখেছেন নিজের রক্তপ্রবাহ দিয়ে। তিনি বলেছেন, ‘কোনো চলচ্চিত্রকার জনগণকে পাল্টাতে পারে না। জনগণ এতটা মহৎ যে, তারা নিজেরাই নিজেদের পাল্টে নিচ্ছে। আমি সেসব পাল্টানোর চিত্রটা ধারণ করছি কেবল।’
এই চলচ্চিত্রকারের জন্ম ঢাকার জিন্দাবাজারে ১৯২৫ সালের ৪ নভেম্বর। আজ থেকে ঠিক ১০০ বছর আগে। দাদা শ্যামাচরণ ঘটক ছিলেন পণ্ডিত ও বিদগ্ধ ব্যক্তি। বাবা রায় বাহাদুর সুরেশচন্দ্র ঘটক ছিলেন সাহিত্যানুরাগী ও ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। ঋত্বিকের অগ্রজ মনীষ ঘটক ছিলেন বাংলা সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য কবি ও লেখক। তিনি কুড়ির দশকে গঠিত কল্লোল সাহিত্যগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য সদস্য ছিলেন। দ্বিতীয় অগ্রজ সুধীশ ঘটক এ উপমহাদেশের টেলিভিশন প্রযুক্তিতে অভিজ্ঞ মানুষ। তিনি যুক্তরাজ্যে প্রামাণ্যচিত্রের সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে কাজ করেন ছয় বছর। ১৯৩৫ সালে তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং পরের বছর নিউ থিয়েটার্সে যোগ দেন। মূলত এই মেজো ভাইয়ের দৌলতে ঋত্বিকের চলচ্চিত্র জগতে আসা। প্রমথেশ বড়ুয়া ও বিমল রায়ের মতো খ্যাতিমান নির্মাতার সঙ্গে ঋত্বিকের পরিচয় হয় এই মেজো দাদার হাত ধরে।
ছোটবেলা থেকে সাহিত্য ও সংগীতের সঙ্গে পরিচয় ঘটে। রবীন্দ্রনাথকে তিনি যেভাবে আত্মস্থ করেছেন, একইভাবে আকৃষ্ট হয়েছেন কার্ল মার্ক্সের প্রতি। ১৯৪৬ সালে তিনি মার্ক্সবাদী রাজনীতিতে যুক্ত হন। সে সময় ছোটগল্পও লেখেন। দেশ ভাগের পর কলকাতায় গণনাট্য আন্দোলনে যুক্ত হন।
দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝখানে জন্ম নেওয়া ঋত্বিক ঘটক গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলন থেকে শুরু করে মাস্টারদা সূর্য সেন ও নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন দেখেছেন। দেশ ভাগের পর সাধারণ মানুষের ভাগ্যবদল, শরণার্থী জীবনের দারিদ্র্য আর মৃত্যু দেখেছেন। যখন দেখলেন, গল্প বা নাটক লিখে যথাযথভাবে মনোযন্ত্রণা প্রকাশ করা যাচ্ছে না, তখন তিনি গেলেন চলচ্চিত্রের কাছে। নিজের ভেতর বহমান আগুন-নদী– সে হোক পদ্মা, গঙ্গা, সুবর্ণরেখা কিংবা তিতাস; সেসবকে ধারণ করে তিনি রচনা করতে থাকলেন অশ্রুসজল সব চলচ্চিত্র। এ কারণে তিনি নিজের আত্মাকে বেচতে পারেননি পুঁজিবাদের কাছে। বাণিজ্যিক ছবি ছিল তাঁর কাছে চোখের বিষ।
আটটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, চারটি স্বল্পদৈর্ঘ্য, চারটি প্রামাণ্যচিত্র ও একটি বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাণ করতে পেরেছিলেন। সামগ্রিক কাজ বিবেচনায় ঋত্বিক একদিকে মার্ক্সবাদী, অন্যদিকে ইয়ংপন্থি। ‘নাগরিক’ (১৯৫৩) ছবিতে মধ্যবিত্ত পরিবারের নিম্ন-মধ্যবিত্ত হয়ে যাওয়ার ভেতর দিয়ে শ্রেণিবৈষম্যের কথা বলেছেন। ‘অযান্ত্রিক’ (১৯৫৮) ছবিতে দেখানোর চেষ্টা করলেন যন্ত্রের সঙ্গে মানুষের হৃদ্য। পরের চলচ্চিত্র ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ (১৯৫৯) ঋত্বিক ঘটক বানালেন অনেকটা আত্মজীবনীমূলক, যদিও গল্পটি লিখেছেন শিবরাম চক্রবর্তী।
এই ছবিগুলোর পর থেকে ঋত্বিক ঘটক যেন আরও নিশ্চিত হলেন, তিনি কোন ভাষায় কোন কথাটি বলতে চাচ্ছেন। একে একে নির্মাণ করলেন দেশভাগত্রয়ী: ‘মেঘে ঢাকা তারা’ (১৯৬০), ‘কোমল গান্ধার’ (১৯৬১) ও ‘সুবর্ণরেখা’ (১৯৬২)। প্রথমটিতে কলকাতার কলোনি, পুরুষতন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ, মধ্যবিত্তের চরিত্র পাল্টে যাওয়া। ‘কোমল গান্ধার’-এ স্মৃতিকাতরতা, মধ্যবিত্তের সংস্কৃতিচর্চা এবং তার ভেতর ভাঙা ও গড়ার দোদুল্যমানতা। ‘সুবর্ণরেখা’য় শরণার্থী জীবন, দারিদ্র্যের কশাঘাত, ভোগবাদের অসহনীয় লজ্জা। এই তিন ছবিতেই রাজনীতিবোধসম্পন্ন ও শ্রেণিসচেতন ঋত্বিকের দেখা পাওয়া যায়; আরও পাওয়া যায় তাঁর দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গিকেও। একই ধারণার দেখা আমরা পাই ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ (১৯৭৩) ও ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’ (১৯৭৪) ছবিতে।
১৯৭৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি মারা যান ঋত্বিক ঘটক। বয়স কেবল ৫০ পেরিয়েছিল তাঁর। ছিলেন সত্যজিৎ রায় ও মৃণাল সেনের সমসাময়িক। দুজনের থেকে বয়সে ছোট। তবে সময় যত গড়িয়েছে, ততই ঋত্বিক নামের নক্ষত্রের আলো স্পষ্ট হয়েছে। জন্মশতবর্ষে মহান এই শিল্পীর প্রতি রইল অগাধ শ্রদ্ধা।
- বিষয় :
- জন্মশতবর্ষ
