কৃষির ব্যস্ত মৌসুমেই মাঠ পর্যায়ে গণবদলি
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)
জাহিদুর রহমান
প্রকাশ: ০৯ নভেম্বর ২০২৫ | ০৭:৪২ | আপডেট: ০৯ নভেম্বর ২০২৫ | ১১:৩৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশে এখন কৃষির ব্যস্ত মৌসুম। মাঠে চলছে আমন ধান কাটা। কৃষকের সময় কাটছে শীতকালীন সবজি ও রবিশস্যের বীজতলায়। শুরু হয়েছে আলুর বীজ বোনা। নভেম্বর থেকে মার্চ– এই পাঁচ মাসেই সবচেয়ে বেশি সার ও বীজের প্রয়োজন পড়ে। এই সময়ে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বদলি না করার জন্য বলেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। কিন্তু বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনে (বিএডিসি) মাঠ পর্যায়ে গণহারে বদলি হচ্ছে। বীজ, সার ও সেচ সুবিধা কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বে থাকা এই সংস্থার চেয়ারম্যান রুহুল আমিন খানের বিরুদ্ধে উঠেছে বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ। আগামী ৩১ ডিসেম্বর অবসরে যাওয়ার কথা রয়েছে তাঁর।
বিএডিসির একাধিক কর্মকর্তা সমকালকে বলেছেন, অবসরে যাওয়ার আগে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এসব বদলি করেছেন চেয়ারম্যান রুহুল আমিন খান। এই অনিয়মে তিনি একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটকে ব্যবহার করছেন, যারা নানাভাবে আর্থিক লেনদেনে জড়িত।
বিএডিসি সূত্রে জানা গেছে, গত এক মাসে অর্ধশত কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। বিশেষ করে সার ব্যবস্থাপনা শাখায় বদলি করা হয়েছে সবচেয়ে বেশি। অথচ এখনই সার সরবরাহ ও মাঠ পর্যায়ে কার্যক্রমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, এমন অস্থিরতায় সার সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে।
একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিএডিসির ইতিহাসে এমন বিশৃঙ্খল বদলি কখনও হয়নি। মাঠে এখন কর্মপরিকল্পনা নয়, চলছে বদলির দৌড়ঝাঁপ। একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, বদলি বাণিজ্যের এই সিন্ডিকেটে আছেন চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন কর্মকর্তা ও দালাল চক্র। তাদের মাধ্যমে বদলি-বাণিজ্যের টাকার দফারফা হয়। কেউ কেউ সরাসরি চেয়ারম্যানের বাসায় গিয়ে টাকা দিয়েছেন।
এই ঘুষ বাণিজ্যের ফলে মাঠ পর্যায়ে দক্ষ ও সৎ কর্মকর্তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। এক কর্মকর্তা বলেন, ঘুষ ছাড়া এখন কোনো বদলির সুযোগ নেই। কেউ প্রতিবাদ করলে তাঁকে ‘আওয়ামী লীগ সমর্থক’ বলে দূরের জেলায় পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
গত এক মাসে যেসব বদলি করা হয়েছে, তার একটি আদেশও বিএডিসির ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়নি। তবে বদলির ১২টি আদেশ সমকালের হাতে এসেছে। সেখানে দেখা গেছে, অনেককে এক মাসের মধ্যে দুই থেকে তিনবারও বদলি করা হয়েছে। আবার এখন সারের মৌসুম চললেও সারসংক্রান্ত কাজে নিয়োজিত মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদেরই বেশি বদলি করা হচ্ছে।
মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এমন অনিয়ম চলতে থাকলে সার ও বীজের সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হবে। এতে রবি মৌসুমের ফসল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, সার ও বীজের মৌসুমে বদলি না করার নির্দেশ ছিল স্পষ্ট। বিএডিসিতে কীভাবে এত বড় পরিসরে বদলি হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা দরকার।
এদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কৃষির দপ্তরগুলোতে সংস্কার হলেও বিএডিসিতে আগের প্রভাবশালীরা এখনও বহাল। এক কর্মকর্তা বলেন, যারা একসময় আওয়ামী লীগ সরকারের গুণগান করতেন, তারাই এখন বিএনপি-জামায়াতের নাম ভাঙিয়ে বদলি বাণিজ্য করছেন। এতে অস্থিরতা ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে মাঠ পর্যায়ে সেবা ব্যাহত হচ্ছে।
বিএডিসির সচিব মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘যে কোনো বদলি চেয়ারম্যানের নির্দেশনায় হয়। বদলি-সংক্রান্ত ক্ষমতা বিএডিসির আইনে চেয়ারম্যানকে দেওয়া আছে।’ সচিব দাবি করেন, বদলি বাণিজ্যের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। তবে প্রতিটি বদলি আদেশের একটি অনুলিপি বিএডিসির আইসিটি বিভাগকে দেওয়া হয়। তাদের ওয়েবসাইটে আপলোড করার কথা। তাদের সঙ্গে তিনি কথা বলবেন।
আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমি শুনেছি সাম্প্রতিক সময়ে যে বদলিগুলো হয়েছে, সেগুলো স্থগিত রাখতে বলেছেন কৃষি সচিব। সচিবের নির্দেশনার কারণে হয়তো এখনও ওয়েবসাইটে আপ করা হয়নি। চেয়ারম্যান কানাডায় আছেন। তিনি ফিরলে বদলির বিষয়টি সুরাহা হওয়ার কথা।’
এ বিষয়ে কথা বলতে গত সপ্তাহে বিএডিসির চেয়ারম্যান রুহুল আমিন খানকে একাধিকবার ফোন করেও পাওয়া যায়নি। তাঁর সঙ্গে দেখা করতে কার্যালয়ে গিয়েও পাওয়া যায়নি। গত শুক্রবার থেকে তিনি সরকারি সফরে কানাডায় অবস্থান করছেন। গতকাল রাতে তাঁর হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে একাধিকবার ফোন করেও যোগাযোগ করা যায়নি। মেসেজ পাঠালেও তিনি সাড়া দেননি।
এক সপ্তাহ তিনি কানাডায় অবস্থান করবেন বলে বিএডিসির একটি সূত্র জানিয়েছে।
