ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

হারিয়ে যাচ্ছে মূল উদ্দেশ্য, সংস্কারের দাবি জোরালো

সবুজ প্রতিশ্রুতির আড়ালে করপোরেটের ছায়া

ঋণ নয়, ন্যায়বিচার চায় বাংলাদেশ

সবুজ প্রতিশ্রুতির আড়ালে করপোরেটের ছায়া
×

জাহিদুর রহমান

প্রকাশ: ১৩ নভেম্বর ২০২৫ | ০৮:০৫ | আপডেট: ১৩ নভেম্বর ২০২৫ | ০৯:৪৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

ব্রাজিলের আমাজন জঙ্গলঘেঁষা শহর বেলেমে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ৩০ তৃতীয় দিন পার করেছে। বিশ্বের প্রায় সব দেশের প্রতিনিধি, বিজ্ঞানী, কূটনীতিক ও জলবায়ু আন্দোলনের কর্মীরা যখন এক ছাদের নিচে, তখনই জোরালোভাবে কিছু প্রশ্ন সামনে আসছে– জলবায়ু সম্মেলনগুলো কি করপোরেটের আধিক্য ও পরস্পরবিরোধী হয়ে পড়ছে? বাস্তব অগ্রগতি আর সম্ভব হচ্ছে না?

সমালোচকরা বলছেন, জলবায়ু সম্মেলন এখন অনেকটা ‘বাণিজ্য মেলা’য় রূপ নিয়েছে। সেখানে সম্মেলনের নামে বিভিন্ন দেশ থেকে অনেকে ঘুরতে আসছেন। আবার করপোরেট কোম্পানির প্রভাবে মূল উদ্দেশ্যই ফিকে হয়ে যাচ্ছে। গত দুই কপ আয়োজন করেছে তেলনির্ভর স্বৈরশাসিত দেশ, যেখানে সভাপতিও ছিলেন জ্বালানি কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তা। করপোরেট স্পন্সরশিপ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কপের স্পন্সর হচ্ছে দূষণকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে হাজার হাজার প্রতিনিধি বিমানে চড়ে ‘কার্বন কমানোর’ আলোচনা করতে আসেন। 

আজারবাইজানে অনুষ্ঠিত কপ২৯-এ উপস্থিত ছিলেন এক হাজার ৭৭০ জন জীবাশ্ম জ্বালানি-লবিস্ট, যাদের অনেকে সরকারি প্রতিনিধি দলের অংশ ছিলেন। তাদের প্রভাবেই কয়লা, তেল ও গ্যাসনির্ভরতা হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো বারবার ভেস্তে যাচ্ছে। ফলে জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বৈশ্বিক উদ্যোগ ব্যাহত হচ্ছে।
এবারের কপ৩০-এর মূল আলোচ্য বিষয় নিউ কালেক্টিভ কোয়ান্টিফায়েড গোলের আওতায় বার্ষিক কমপক্ষে ৩০০ বিলিয়ন ডলার জলবায়ু অর্থায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ। কিন্তু আগের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী উন্নত দেশগুলো যে ১০০ বিলিয়ন ডলার অনুদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেটি এখনও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলো এবারের সম্মেলন নিয়ে সন্দিহান।

আমাজনের কাছাকাছি বলে বেলেমকে বেছে নেওয়া হয়েছে। প্রতীকীভাবে এটি পৃথিবীর ‘ফুসফুস’-এর দরজা। কিন্তু এ শহরই এখন জলবায়ু বৈষম্যের বাস্তব চিত্র। ১৩ লাখ মানুষের বেলেম ব্রাজিলের অন্যতম দরিদ্র রাজধানী। সম্মেলন প্রস্তুতি ঘিরে শহরে বেড়েছে উচ্ছেদ, গাছ কাটা ও বর্জ্যনালার দিক পরিবর্তনের ঘটনা। পরিবেশ বাঁচানোর স্লোগান দিলেও আমাজনের এক লাখ গাছ কেটে সম্মেলনের যাত্রা শুরু করে ব্রাজিল। জানা গেছে, বিদেশি প্রতিনিধিদের আনাগোনা সহজ করতেই চার লেনের হাইওয়ে তৈরির সময় গাছগুলো কাটতে হয়েছে। এ নিয়ে স্থানীয় সমাজকর্মীরাও ক্ষুব্ধ। গত মঙ্গলবার সম্মেলনস্থলে আদিবাসী বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। জাতিসংঘের কনফারেন্সে সহিংসতা বিরল হলেও এবার সেই নিয়ম ভেঙেছে।

বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধি দল এ বছরও সক্রিয়ভাবে সম্মেলনে অংশ নিয়েছে। বেলেমে অবস্থানরত স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার বলেন, কপ৩০ মূলত প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবায়নের সম্মেলন হতে যাচ্ছে। দেশগুলোকে এবার স্পষ্ট সময়সীমা, নীতি ও অর্থায়নের পরিকল্পনা উপস্থাপন করতে হবে।

তিনি জানান, তৃতীয় দিনের আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে প্যারিস চুক্তির অধীনে গ্লোবাল স্টকটেকের অগ্রগতি পর্যালোচনা, নির্গমন হ্রাসের নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ, অভিযোজন সহায়তা বৃদ্ধি এবং লস অ্যান্ড ড্যামেজ তহবিলের কাঠামো চূড়ান্ত করা। তিনি বলেন, বাংলাদেশ প্যাভিলিয়ন এখনও উদ্বোধনের অপেক্ষায়। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (জলবায়ু পরিবর্তন শাখা) মোহাম্মদ নাভিদ সাইফুল্লাহ অতি শিগগিরই উদ্বোধন করবেন বলে জানা গেছে। সেখানে বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা, ভবিষ্যৎ ঝুঁকি, সরকারি পরিকল্পনা ও বৈশ্বিক মঞ্চে বাংলাদেশের দাবিগুলো তুলে ধরা হবে।

চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী এম জাকির হোসেন খান বলেন, বাংলাদেশ কপ৩০-এ এসেছে বিশ্বের অন্যতম ভারী জলবায়ু ঋণের বোঝা নিয়ে। এটা অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার কারণে নয়, বরং বৈশ্বিক জলবায়ু অর্থায়ন ব্যবস্থাই আমাদের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে টিকে থাকার জন্য ঋণের ফাঁদে ফেলছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ কপ৩০-এর মঞ্চ থেকে বলবে– ঋণ নয়, ন্যায়বিচার চাই। শতভাগ অনুদানভিত্তিক অভিযোজন অর্থায়নই সময়ের দাবি। এটা দয়া নয়, নৈতিক দাবি।

জাকির হোসেন খান আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের সাম্প্রতিক মতামতের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, জলবায়ু অর্থায়নকে ন্যায্যতা, সহনশীলতা ও টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। এ চক্রের অবসান না ঘটালে কপ প্রক্রিয়া অর্থহীন হয়ে পড়বে।
কপ৩২ অনুষ্ঠিত হবে ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবায়। তবে কপ৩০-এর ফলাফলই নির্ধারণ করবে– বিশ্ব এখন বাস্তব পরিবর্তনের পথে হাঁটছে, নাকি জলবায়ু ন্যায়ের লড়াই এখনও কেবল কনফারেন্স রুমের বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ থাকবে। বেলেমের বাতাসে এখন প্রশ্ন একটাই– সবুজ প্রতিশ্রুতির পর্দা সরিয়ে কি সত্যিকারের ন্যায়বিচারের আলো ফোটাতে পারবে বিশ্ব?

 

আরও পড়ুন

×