কাজে আসছে বড় পরিবর্তন যুক্ত হচ্ছে তিন অধিদপ্তর
অমিতোষ পাল
প্রকাশ: ১৩ নভেম্বর ২০২৫ | ০৮:১৭ | আপডেট: ১৩ নভেম্বর ২০২৫ | ১৪:৫৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা, পরিবীক্ষণ, মূল্যায়ন ও পরিদর্শন অনুবিভাগে ব্যাপক পরিবর্তন আসছে। এ বিভাগের অধীনে তিনটি অধিদপ্তর থাকবে। দপ্তরগুলোর মাধ্যমে সারাদেশের স্থানীয় পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হবে। এতদিন কাজটি বিচ্ছিন্নভাবে করে আসছিল স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু তাদের জনবল কাঠামোয় কোনো প্রয়োজনীয় পরিকল্পনাবিদ না থাকায় পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ সঠিকভাবে করা যায়নি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের ভূমির প্রতিটি কণার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন উদ্যোগের ফলে একসময় পুরো দেশ পরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠবে বলে মনে করে সরকার।
জানা গেছে, দেশে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও যত্রতত্র অপরিকল্পিত অবকাঠামো গড়ে ওঠার ফলে কৃষিজমি ব্যাপকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। ১৯৭১ সালে দেশের মোট আয়তনের প্রায় ৬৮ শতাংশ ভূমি ছিল আবাদযোগ্য। সেটা কমে ৫৫ শতাংশে নেমে এসেছে। মাথাপিছু জমির পরিমাণ ৩২ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে এসেছে। তার ওপর আরও ১০ শতাংশ ভূমি পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরই স্থানীয় সরকার বিভাগ এ বিষয়ে করণীয় নির্ধারণের উদ্যোগ নেয়।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) আগ্রহে স্থানিক পরিকল্পনা প্রণয়ন বিষয়ে একটি প্রতিবেদন ‘বিআইপি’কেই দিতে বলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। চলতি বছরের প্রথম দিকে প্রতিবেদনটি উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার কাছে জমা পড়ে। পরে এটি চূড়ান্ত করতে আট সদস্যের একটি কমিটি করে দেওয়া হয়। কমিটি দুই দফা বৈঠক করে খসড়া চূড়ান্ত করেছে। তবে মন্ত্রণালয় চাইছে তিনটির পরিবর্তে দুটি অধিদপ্তর করার জন্য।
এ প্রসঙ্গে মন্ত্রণালয়ের গঠিত কমিটির সদস্য সচিব স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব মাহবুবা আইরিন সমকালের কাছে বিস্তারিত বলতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত ও খসড়া প্রণয়নকারী বিআইপির সাধারণ সম্পাদক শেখ মেহেদী আহসান বলেন, কাজটা অনেক দূর এগিয়েছে। কিছু জায়গায় আরেকটু পরিবর্তন আসতে পারে। এ জন্য হয়তো আরও দু-একটি বৈঠক করতে হতে পারে। তারপরই জনপ্রশাসন, অর্থ মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয় হয়ে উপদেষ্টা পরিষদ বা মন্ত্রিপরিষদে যাবে। তারপর পরবর্তী সরকারের আমলে বাস্তবায়ন হবে। এ জন্য সংসদের কোনো প্রয়োজন পড়বে না।
কেন এই উদ্যোগ
খসড়ায় বলা হয়েছে, দেশে ৩৩০টি পৌরসভা ও ৪৯৫টি উপজেলা রয়েছে। কিন্তু এলজিইডি এ পর্যন্ত মাত্র পাঁচটি পৌরসভার স্থানিক পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ শেষ করতে পেরেছে। আরও ২২টি পৌরসভা ও ১২টি উপজেলার পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ চলমান। ফলে স্থানীয় সরকারের আওতাধীন ৯৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ এলাকার পুরোটাই কার্যত স্থানিক পরিকল্পনাবিহীনভাবে গড়ে উঠেছে ও উঠছে। এতে পরিকল্পিত উন্নয়নের সম্ভাবনা বিনষ্ট হওয়া ছাড়াও জাতীয় সম্পদের অপচয় হয়েছে ও হচ্ছে। সঠিক স্থানিক পরিকল্পনার মাধ্যমে শিল্পকারখানা, হাটবাজার, আবাসিক এলাকা, খেলার মাঠ, রাস্তাঘাট প্রভৃতির মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হবে। সরকার পরিবর্তন হলেও পরিকল্পনা অনুযায়ী সেটা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়িত হবে।
নতুন যা যুক্ত হচ্ছে
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা, পরিবীক্ষণ, মূল্যায়ন ও পরিদর্শন অনুবিভাগের অধীনে তিনটি দপ্তর করার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে স্থানিক পরিকল্পনা অনুবিভাগ, স্থানীয় সরকার স্থানিক পরিকল্পনা অধিদপ্তর এবং স্থানিক পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমি।
এর মধ্যে স্থানিক পরিকল্পনা অনুবিভাগ হবে মূলত প্রশাসনিক দপ্তর। এ দপ্তর প্রশাসনিক কার্যক্রম তদারক করবে। এ জন্য তেমন বাড়তি কোনো জনবলের প্রয়োজন হবে না। স্থানিক পরিকল্পনা অধিদপ্তর করবে মূল পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ। এ দপ্তরে পরিকল্পনাবিদসহ কারিগরি ব্যক্তিরাই মুখ্য ভূমিকা পালন করবেন। এই বিশেষায়িত অধিদপ্তর স্থানীয় ও জাতীয় প্রয়োজনের নিরিখে নির্মোহভাবে স্থানিক পরিকল্পনা তৈরির জন্য দায়বদ্ধ থাকবে।
স্থানিক পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমি হবে বার্ড বা পল্লী উন্নয়ন একাডেমির আদলে গবেবষণাধর্মী দপ্তর। তবে সরকার চাইছে স্থানিক অনুবিভাগ ছাড়া বাকি দুটি দপ্তরকে একীভূত করে একটি দপ্তর করতে। কারণ দু্টি দপ্তরের কাজের মধ্যে সাদৃশ্য রয়েছে। সব দপ্তরই স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকবে।
স্থানিক অনুবিভাগের কাঠামো
স্থানিক পরিকল্পনা অনুবিভাগের প্রধান থাকবেন একজন অতিরিক্ত সচিব। তাঁর অধীনে থাকবেন ছয়জন যুগ্ম সচিব। তারা নগর, গ্রামীণ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন, প্রকল্প মূল্যায়ন, পরিদর্শন ও নীতিকৌশল প্রণয়নের পৃথক দায়িত্বে থাকবেন। এসব কাজের জন্য একেকজন যুগ্ম সচিবের অধীনে তিন থেকে আটজন উপসচিব ও সিনিয়র সহকারী সচিব দায়িত্ব পালন করবেন।
স্থানিক পরিকল্পনা অধিদপ্তর
এ দপ্তরে একজন প্রধান পরিকল্পনাবিদ থাকবেন। তাঁর অধীনে থাকবেন ছয়জন অতিরিক্ত প্রধান পরিকল্পনাবিদ। এরা সবাই হবেন পরিকল্পনাবিদ, যাদের পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা থাকবে। তাদের প্রত্যেকের অধীনে যারা কাজ করবেন তারাও হবেন পরিকল্পনা প্রণয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন। প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ হবেন গ্রেড-১ পর্যায়ের কর্মকর্তা। অতিরিক্ত প্রধান পরিকল্পনাবিদ হবেন গ্রেড-২ বা ৩ পর্যায়ের কর্মকর্তা। চতুর্থ থেকে নবম গ্রেডের কর্মচারী হবেন অন্যরা। এ অধিদপ্তরের প্রধান পরিকল্পনাবিদের দপ্তরের জনবল হবে ১১৯ জন।
১২টি সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রতিটি কার্যালয়ের জনবল হবে ১৪ জন করে। সেখানে প্রতিটি কার্যালয়ের প্রধান থাকবেন একজন অতিরিক্ত প্রধান পরিকল্পনাবিদ। ৬৪টি জেলা কার্যালয়ের প্রতিটিতে থাকবেন একজন উপপ্রধান পরিকল্পনাবিদসহ চারজন। ৪৯৫টি উপজেলার প্রতিটিতে একজন উপজেলা পরিকল্পনাবিদ (সিনিয়র সহকারী পরিকল্পনাবিদ) ও একজন সহকারী পরিকল্পনাবিদ। মোট জনবল হবে এক হাজার ৫৩৩।
স্থানিক পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমি
এ দপ্তরের প্রধান কাজ হবে পেশাগত প্রশিক্ষণ, সেমিনার, কর্মশালা ও কারিকুলাম উন্নয়ন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এ রকম প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যেমন ভারতে রয়েছে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব আরবান অ্যাফেয়ার্স (এনআইইউএ), সিঙ্গাপুরে সেন্টার ফর লাইভেবল সিটিজ (সিএলসি) এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় কোরিয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউট ফর হিউম্যান সেটেলমেন্টের মতো প্রতিষ্ঠান। এ দপ্তরের প্রধান হবেন মহাপরিচালক, যিনি হবেন একজন পরিকল্পনাবিদ। এ ছাড়া অতিরিক্ত মহাপরিচালক, পরিচালক, যুগ্ম পরিচালক, প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন পদের কর্মকর্তা-কর্মচারী। এ শাখায় মোট জনবলের প্রস্তাব করা হয়েছে ৩৬৫।
এ বিষয়ে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, সরকার বুঝতে পেরেছে দিন শেষে এটা লাগবেই। তবে যারা পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ করবেন তাদেরকে জাতীয় পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজটা করতে হবে। কারণ এখন সড়ক ও জনপথ, এলজিইডি, সিটি করপোরেশন, নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর, রাজউকসহ বিভিন্ন দপ্তর এ কাজ করছে। কিন্তু স্থানীয় সরকার পর্যায়ে কার্যত কোনো কাজ হচ্ছে না। এখন সরকারও বুঝতে পেরেছে, আজ হোক আর কাল হোক– এটা করতেই হবে।
